নর্ডিক জাতীয় বার্বারদের সম্বন্ধে আরবরা যে মনোভাব পোষণ করত, তা টলেডোর সুবিজ্ঞ বিচারক সাইদের কথায় বুঝা যায়। তিনি বলেনঃ যেহেতু সূর্য এদের মাথার উপর সোজাসুজি কিরণপাত করে না, সেই জন্য এদের দেশের আবহাওয়া ঠাণ্ডা আর আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন। সুতরাং, এদের মেজাজও ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে–আর এদের ব্যবহার হয়ে পড়েছে অমার্জিত। এদের দেহ সুল, গায়ের রং পাতলা এবং চুল লম্বা। সূক্ষ্ম রস-জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির এদের একান্ত অভাব; নির্বুদ্ধিতা ও বোকামি আছে এদের প্রচুর। লিয়ন, ন্যাভার অথবা বার্সেলোনার শাসনকর্তার যখনই একজন সার্জন, রাজমিস্ত্রী, গানের ওস্তাদ অথবা উচ্চশ্রেণীর দরজীর দরকার হত, তখনই তারা কর্ডোভায় তোক পাঠাতেন। এ মুসলিম রাজধানীর যশোঃগাথা সুদূর জার্মানী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে এবং তথাকার একজন মঠবাসিনী কর্ডোভা সম্পর্কে মুগ্ধ কণ্ঠে বলেন : কর্ডোভা দুনিয়ার মণি।
খলীফাদের শাসনাধীন স্পেন ইউরোপের সমৃদ্ধতম দেশসমূহের অন্যতম ছিল। ঘন বসতির দিক দিয়েও এ দেশ কোন দেশেরই পেছনে ছিল না। রাজধানীতে ১৩ হাজার বস্ত্র-বয়ন শিল্পী ও একটি উন্নত চামড়ার কারখানা ছিল। চামড়া পাকা করা ও চামড়ার উপর উন্নত হরফে লেখার বিদ্যা স্পেন হতেই মরক্কোতে যায় এবং এ উভয় দেশ হতে যায় ফ্রান্সে ও ইংল্যান্ডে। পশম ও রেশমের কাপড় কর্ডোভা ছাড়া মালাগা, আলমেরিয়া ও অন্যান্য কেন্দ্রেও বোনা হত। গুটি পোকার চাষ প্রথমে চীনের একচেটিয়া ছিল। মুসলমানরাই এ-বিদ্যা চীন হতে স্পেনে নিয়ে যায়। স্পেনে গুটি পোকার চাষের বেশ উন্নতি হয়। আলমেরিয়াতে কাঁচ ও পিতলের জিনিস তৈরি হত। ভ্যালেনসিয়ার অন্তর্গত পেটারনা মৃৎশিল্পের কেন্দ্র ছিল। জায়েন ও আলগার্ভে সোনা-রূপার খনির জন্য, কর্ডোভা লোহা ও সীসার খনি এবং মালাগা রুবীর জন্য বিখ্যাত ছিল। দামেস্কের মত টলেড়ো তলোয়ারের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল। ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতুর উপর সোনা-রূপার কাজ ও ফুল তোলার বিদ্যা দামেস্ক হতে স্পেনে আসে। এ শিল্প স্পেন ও বাকী ইউরোপের কোন কোন শহরে বেশ উন্নতি লাভ করে। স্পেনীয় আরবরা পশ্চিম এশিয়ায় প্রচলিত কৃষি-পদ্ধতি আমদানী করে। তারা খাল কাটে, আঙ্গুরের আবাদ করে এবং অন্যান্য ফল-মূলের মধ্যে নতুন প্রচলন করে-ধান, খুবানী, পীচ, ডালিম, কমলালেবু, আখ, কার্পাস ও জাফরান। উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সমতল ভূমি আবহাওয়া ও উর্বরতার দিক দিয়ে উন্নত ছিল; এ-স্থান নানারকম কৃষি-শিল্পের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার ভাগ-চাষীরা প্রচুর পরিমাণে গম ও অন্যান্য শস্য এবং বিভিন্ন রকম ফল উৎপাদন করত।
কৃষির এই উন্নতি মুসলিম-স্পেনের এক পরম গৌরব এবং এই দেশের পক্ষে আরবদের একটি অমর অবদান ছিল। কারণ, আজো স্পেনের বাগানগুলিতে মুরীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। জেনারলাইফ স্পেনের একটি অতি বিখ্যাত বাগান। নামটি আরবী জান্নাতুল আরিফ’ (পরিদর্শকের বেহেশত) নামের অপভ্রংশ। এটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগের কীর্তি এবং আলহামরার বাইরে একটি ইমারত এর বিশ্রামাগার ছিল। সুবিস্তৃত ছায়া, ঝর্ণা এবং মৃদু হাওয়ার জন্য এ বাগান বিখ্যাত ছিল। এর আকার ছিল অনেকটা বৃত্তাকার। কয়েকটি ছোট নদী এর পানি-সেচের উৎস ছিল। নদীগুলি মাঝে মাঝে জল প্রপাত সৃষ্টি করে ফুল, লতা ও গাছের মধ্যে হারিয়ে যেত। আজ সেখানে কেবল কয়েকটি বিরাট আকারের সাইপ্রেস ও মাটল গাছ বিদ্যমান।
মুসলিম-স্পেনের কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য বাসিন্দাদের ব্যবহারের পর উদ্ধৃত থাকত। সেভিল নদীতীরস্থ এক মস্ত বন্দর ছিল। এখান হতে কার্পাস, জলপাই এবং তেল রফতানী হত এবং এখানে আমদানী হত মিসরের কাপড় ও গোলাম এবং ইউরোপ ও এশিয়া হতে গায়িকা-বালিকা। মালাগা ও জায়েন হতে রফতানী হত জাফরান, ডুমুর, মার্বেল এবং চিনি। আলেকজান্দ্রিয়া ও কনস্টানটিনোপল মারফত, স্পেনের উৎপন্ন দ্রব্য সুদূর ভারত ও মধ্য-এশিয়ার বাজারসমূহে গিয়ে পৌঁছত। দামেস্ক, বাগদাদ এবং মক্কার সঙ্গে এর তেজারতি অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। আধুনিক জগতের নৌ বিদ্যাঘটিত আন্তর্জাতিক শব্দসমূহের মধ্যে এডমিরাল, আরসেনাল, এভারেজ, ক্যাবল, শেলোপ ইত্যাদি আরবী-অদ্ভূত শব্দের অস্তিত্ব হতেই বোঝা যায়, এককালে সমুদ্রের উপর আরব জাতির প্রভুত্ব কত ব্যাপক ছিল।
সরকার রীতিমত ডাক-চলাচলের ব্যবস্থা পরিচালনা করত। রাষ্ট্রের মুদ্রা প্রাচ্য আদর্শে তৈরী হত। দিনার ছিল সোনার আর দেরহেম ছিল রূপার মুদ্রা। উত্তরের খৃস্টান দেশগুলিতে আরব-মুদ্রা চালু ছিল; কারণ, প্রায় চারশ’ বছর পর্যন্ত আরব ও ফরাসী মুদ্রা ছাড়া এদের নিজস্ব কোন মুদ্রা ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া রাজধানীতে একটি প্রথম শ্রেণীর কুতুবখানা ছিল। আল হাকাম একজন গ্রন্থ-প্রেমিক ছিলেন। তার প্রতিনিধিরা পাণ্ডুলিপি খরিদ বা নকল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক ও বাগদাদের বইয়ের দোকান তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াত। এইরূপে সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা নাকি অবশেষে চার লক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। সে বইয়ের ক্যাটালগ ছিল চুয়াল্লিশ বালাম। আর এইসব বালামের প্রত্যেকটির বিশ পাতা জুড়ে নাম ছিল কেবল কবিতার বইয়ের। মুসলিম খলীফাদের মধ্যে আল-হাকামই বোধহয় সবচেয়ে বড় বিদ্বান ছিলেন। তিনি নিজে লাইব্রেরীর অনেকগুলি বই ব্যবহার করতেন এবং সে সবের মার্জিনে তিনি যে নোট লিখে রাখতেন, পরবর্তী সংগ্রাহকরা তাকে অত্যন্ত মুল্যবান মনে করত। আলইসবাহানী নামক উমাইয়াদের একজন বংশধর ইরাকে বসে আগানী লিখছিলেন। এ গ্রন্থের প্রথম কপি সংগ্রহের জন্য আল হাকাম গ্রন্থকারকে এক হাজার দিনার পাঠিয়ে দেন। এ সময় আন্দালুসীয়ায় সংস্কৃতির সাধারণ মান এত উঁচু স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, সুবিখ্যাত ওলন্দাজ পণ্ডিত ডোজী মুগ্ধকণ্ঠে মন্তব্য করেন : ‘প্রায় প্রত্যেকেই লেখাপড়া জানত। অথচ এ সময় খৃস্টান-ইউরোপে প্রাথমিক লেখাপড়ার সামান্য চল ছিল এবং তাও সীমাবদ্ধ ছিল পাদ্রী-পুরোহিতদের মধ্যে।
১৫. পাশ্চাত্য-জগতে আরবের অবদান
মুসলিম-স্পেনের কলেজগুলির ফটকের গায় সাধারণতঃ একটি লিপি উল্কীর্ণ দেখা যেত। সে উল্কীর্ণ লিপিটি এই : মাত্র চারটি বস্তু পৃথিবীর ভার বহন করে : বিজ্ঞের বিদ্যা, মহতের হক-বিচার, সত্যাশ্রয়ীর এবাদাত আর সাহসীর পরাক্রম।
