আরবী কবিতা সাধারণভাবে ও এর গীতি কবিতাংশ বিশেষভাবে দেশীয় খৃস্টানদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে এবং উভয় সংস্কৃতির মিলনে সাহায্য করে। ক্যাস্টাইলের লোক-প্রিয় ভিলানসিকো’ কবিতা আরবী গীতি-কবিতা হতে গড়ে ওঠে। এ কবিতা খৃস্টানদের প্রার্থনার বিশেষ করে বড় দিনের আনন্দ-সঙ্গীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত।
অষ্টম শতাব্দীতে স্পেনীয় সাহিত্যে প্ল্যাটোনিক (নিষ্কাম) প্রেমের যে একটা বিশেষ প্রকাশ-ভঙ্গী বিকাশ লাভ করে, তা আরবী কবিতারই প্রভাবের ফল। দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রথম প্রভেনকাল’ কবিদের আবির্ভাব ঘটে একাদশ শতাব্দীতে এবং তারা পুরাদস্তুর নিপূণ কাব্যকারের মত অদ্ভুত এবং অপূর্ব কল্পনা বিনাসের বিচিত্র লীলায় তাঁদের অদম্য প্রেষকে রূপদান করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে ট্রাবেডুরদের অভ্যুদয় হয় এবং তারা তাদের দক্ষিণ অঞ্চলে সমসাময়িক গজল গায়কদের অনুকরণ করেন। চ্যানসন-ডি-রোল্যান্ড প্রাথমিক যুগের ইউরোপীয় সাহিত্যের মহত্তম কীর্তি। ১০৮০ সালের আগে রচিত এ গ্রন্থ এক নতুন সভ্যতার সূচনা করে। এই সভ্যতাই পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতা। এ গ্রন্থের উদ্ভব হয় মুসলিম-স্পেনের সঙ্গে এক সামরিক সংঘর্ষের ফলে।
আমরা দেখেছি, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। আর সব মুসলিম দেশের মত এখানেও কোরআন এবং আরবী ব্যাকরণ ও কবিতার উপর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়। শিক্ষিত মহলে নারীর যে ইজ্জত ছিল, তাতে প্রমাণিত হয় যে, নারীরা লিখতে পারে না বলে যে প্রবাদ ছিল তা আন্দালুসিয়াতে পালিত হয় নাই। উচ্চশিক্ষার বুনিয়াদ ছিল কোরআনের তফসীর, হাদীস, ফেকা, দর্শন, কাব্য, ইতিহাস, ভূগোল, অভিধান রচনা-রীতি এবং আরবী ব্যাকরণ । প্রধান শহরগুলি অনেকটিতেই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল। সেসবকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়। এ শহরগুলির মধ্যে প্রধান ছিল কর্ডোভা, সেভির, মালাগা এবং গ্রানাডা। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম-শাস্ত্র ও আইন-শাস্ত্র ছাড়া জ্যোতিষ, গণিত এবং চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ানো হত। এখানে নিশ্চয়ই হাজার হাজার ছাত্র ছিল এবং এখানকার সনদের দৌলতে রাজ্যের বড় বড় চাকরী পাওয়া যেত। গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য বিষয়ের তালিকায় ছিল ধর্ম শাস্ত্র, আইন শাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র, রসায়ন, দর্শন এবং জ্যোতিষশাস্ত্র ক্যাস্টিলিয়ার এবং অন্যান্য বিদেশী ছাত্র এখানে লেখাপড়া করত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে কুতুবখানা উন্নতি লাভ করে। কর্ডোভার রাজকীয় কুতুবখানা সর্বাপেক্ষা বড় ও শ্রেষ্ঠ ছিল। অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহও ছিল। এদের মধ্যে কয়েকজন নারীকেও দেখা যায়। রাজনৈতিক সভা ও থিয়েটার গ্রীস ও রোমের জাতীয় জীবনের এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ছিল। মুসলিম-জগতে এ দুইয়ের একান্ত অভাব হেতু বই-ই তাদের জ্ঞানার্জনের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।
বাগদাদ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছি যে, ইউরোপে কাগজ আমদানী সে মহাদেশের প্রতি ইসলামের মহত্তম অবদানসমূহের অন্যতম ছিল। আন্দালুসিয়াতে এই কাগজ উৎপন্ন হত। আর ওখানে কাগজ উৎপন্ন না হলে আন্দালুসিয়াতে এত বই স্থূপীকৃত করা সম্ভবপর হত না। কাগজ তৈরীর বিদ্যা প্রাচ্য হতে প্রথমে মরক্কোতে যায় এবং দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে স্পেনে প্রবেশ করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি আজো ইংরেজি ‘রীম’ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে। শব্দটি আসলে ছিল আরবী ‘রিজমা’। স্পেনীয় ভাষায় গিয়ে শব্দটি হয় ‘রেসমা । আর স্পেন হতে ফরাসী ভাষায় গিয়ে শব্দটি হয় রেইম’। তারপর ফরাসী ভাষা হতে ইংরেজিতে বীম’ শব্দের আকারে নব-রূপ গ্রহণ করে। সিসিলীর মুসলিম-প্রভাব ইতালীতে বিস্তৃত হয় এবং স্পষ্টতঃই সেই প্রভাবের ফলে ১২৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে ইতালীতে কাগজ তৈরীর শিল্প প্রবর্তিত হয়। কেউ কেউ বলেন, ক্রুসেডাররা ফিরে এসে ফ্রান্সে প্রথম কাগজের কল স্থাপন করে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। আসলে ফ্রান্স প্রথম কাগজের কলের জন্য মুসলিম-স্পেনের নিকট ঋণী। এইসব দেশ হতে কাগজ-শিল্প বাকী ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। আবদুর রহমানের এক সেক্রেটারী নিজ বাড়ীতে বসে চিঠিপত্র লিখতেন। তারপর কপি করার জন্য সেগুলি এক বিশেষ অফিসে পাঠানো হত। এ ছিল এক রকম প্রিন্টিং। এখান হতে পত্রের কপি সরকারের বিভিন্ন দফতরে বিলি হত।
স্পেনে মুসলিম-শক্তি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই হাজার বালামেরও কম বই রক্ষা পায় এবং সেসব বই দ্বিতীয় ফিলিপ (১৫৫৬-১৫৯৮) ও তার পরবর্তী বিভিন্ন আরব লাইব্রেরী হতে সংগ্রহ করেন। এইসব বই দিয়েই এসকুরিয়াল লাইব্রেরী শুরু হয়। আজো সে লাইব্রেরী মাদ্রিদের অদূরে অবস্থিত আছে। এ লাইব্রেরীর সঙ্গে অন্যান্য বালাম কিভাবে এসে যুক্ত হয়, তার একটা মজার কাহিনী আছে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মরক্কোর সুলতান রাজধানী হতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তার কুতুবখানাটি এক জাহাজে পাঠিয়ে দেন। জাহাজের ভাড়া পুরোপুরি অগ্রিম না পাওয়ায় জাহাজের কাপ্তান বইগুলি নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিতে অস্বীকার করে। মার্সাই যাওয়ার পথে জাহাজটি স্পেনীয় জলদুস্যর কবলে পড়ে। নূষ্ঠিত বইগুলি সংখ্যায় তিন হতে চার হাজার–তৃতীয় ফিলিপের হুকুম মোতাবেক এক্ষুরিয়াল লাইব্রেরীতে জমা দেওয়া হয়। এইরূপে এস্কুরিয়াল লাইব্রেরী আরবী পাণ্ডুলিপির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
