খলীফা আবদুর রহমানের দরবার সমস্ত ইউরোপের সর্বাপেক্ষা জাকজমকপূর্ণ দরবারসমূহের অন্যতম ছিল। সে দরবারে বাইজেন্টাইন ম্রাট এবং জার্মানী, ইটালী ও ফ্রান্সের রাজাদের তরফ থেকে দূত আনাগোনা করত। তার রাজধানী কর্ডোভার বাসিন্দা ছিল ৫ লক্ষ, মসজিদ ছিল ৭শ’, সরকারী গোসলখানা ছিল ৩শ’। তৎকালীন জগতে বাগদাদ ও কনস্টানটিনোপল ছাড়া এমন আড়ম্বরপূর্ণ নগর আর একটিও ছিল না। ৪শ’ কামরা, হাজার হাজার গোলাম-বাঁদী ও প্রাসাদ রক্ষীদের আবাসস্থানসহ রাজপ্রাসাদ শহরের উত্তর পশ্চিমে সিয়েরা মোরেনার একটি শৈল-বাহুর উপর স্থাপিত ছিল। নীচে প্রবাহিত ছিল গোয়াডাল কুইভার। ৯৩৬ সালে আবদুর রহমান এই শাহী মনজিল নির্মাণ শুরু করেন। একটা কাহিনী প্রচলিত আছে যে, খলীফার একজন উপপত্নী মৃত্যুকালে অগাধ ধন রেখে ওসিয়ত করে যায় যে, খৃস্টানদের দেশে কোন মুসলমান বন্দী থাকলে ঐ টাকায় যেন তাদের মুক্তি-মূল্য দেওয়া হয়। কিন্তু খৃস্টানদের দেশে অমন কোন মুসলিম বন্দী না পাওয়া যাওয়ায় খলীফা আজ জাহরা নাম্নী তার অন্য উপপত্নীর পরামর্শ ও নাম অনুসারে এই প্রাসাদের পত্তন করেন। এ মনজিলের জন্য মার্বেল আনা হয় নুমিডীয়া ও কার্থেজ হতে এবং সোনার মূর্তিসহ স্তম্ভ (খরিদা সূত্রে বা উপহার হিসেবে) আনা হয় কনস্টানটিনোপল হতে। ১০ হাজার শ্রমিক ১৫০০ ভারবাহী পশু সহ বিশ বছর কাল এর নির্মাণ কাজে মোতায়েন থাকে। পরবর্তী খলীফারা এর বিস্তৃতি ও সৌন্দর্য বিধান করেন। ফলে একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শাহী মহল্লা। ১৯১০ সালে এবং তার পরে মাটি খুঁড়ে আজ-জাহরার কতকাংশকে বের করা হয়েছে।
আজ-জাহরা প্রাসাদে যখন খলীফা বসতেন, তখন ৩,৭৫০ জন ব্ল্যাভ’ দেহরক্ষী তাঁকে ঘিরে থাকত। তাঁর একলক্ষ সুশিক্ষিত সৈন্য ছিল। দেহরক্ষীরা তাদের আগে চলত। জার্মান এবং অন্যান্য জাতি স্ল্যাভোনিক জাতিসমূহের মধ্য হতে লোক বন্দী করে এনে আরবদের কাছে বিক্রি করত। কেবল এদেরই স্ন্যাভ বলা হত। পরবর্তীকালে ফিরিঙ্গী, গ্যলিসীয়ান, লম্বার্ড ও অন্যান্য বিদেশীদের মধ্য হতে যত গোলাম খরিদ করা হত, তাদের সবাইকে স্ল্যাভ নাম দেওয়া হয়। এদের সাধারণতঃ অল্প বয়সে খরিদ করে আরবায়িত করা হত। স্পেনের এই ‘জেনিসারী’ বা মামলুকদের সাহায্যে কেবল যে রাজদ্রোহ ও দস্যুতা দমন রাখা হত এমন নয়, প্রাচীন আর অভিজাত সমাজের প্রভাবকেও আয়ত্তে রাখা হত। এ-সময় কৃষি ও বাণিজ্যের যথেষ্ট উন্নতি হয়; রাজকোষ কেঁপে ওঠে। আদায়ী রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৬২ লক্ষ ৪৫ হাজার দিনার; সৈন্যদের বেতন ও জনহিতকর কাজের জন্য এর এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ই যথেষ্ট ছিল। বাকী একৃ তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত তহবিলে যেত। এর আগে কোন সময়ই কর্ডোভা এত সমৃদ্ধিশালী, আন্দালুসীয়া এমন সম্পদের আকর এবং রাষ্ট্র এত শক্তি-দৃপ্ত ছিল না। একজন লোকের প্রতিভা বলে এ অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়। তিনি ৭৩ বছর বয়স মহাপ্রয়াণ করেন। কথিত আছে, মৃত্যুর আগে তিনি বলেন যে, তাঁর সমস্ত জীবনে মাত্র চৌদ্দদিন সুখে কেটেছিল।
প্রাচ্যে হোক আর পাশ্চাত্যেই হোক, মুসলিম-জগতের সর্বত্র যে কোন বংশের অধীনে রাজপদ অনিশ্চিত ছিল। প্রথম আবদুর রহমানের সময় হতে স্পেনে উমাইয়া বংশ নামতঃ রাজ্যশাসন চালিয়ে যাচ্ছিল। এ বংশের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য শাসনকর্তা তৃতীয় আবদুর রহমান যখন ৯১২ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন গৃহ-বিবাদ, কওমী বিদ্রোহ এবং আমীরদের রাজনৈতিক অযোগ্যতা–সমস্ত মিলে স্পেনের সুসংবদ্ধ রাজ্যের সীমানাকে সংকীর্ণ করতে করতে কর্ডোভা ও তার উপকণ্ঠে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল।
তৃতীয় আবদুর রহমান প্রখ্যাতনামা পূর্ববর্তী আবদুর রহমানের মতই শাসন ভার গ্রহণকালে ২৩ বছরের যুবক ছিলেন এবং তাঁর মতই এঁরও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা ও সংকল্পের দৃঢ়তা ছিল। একে একে তিনি বিজিত প্রদেশগুলি পুনর্জয় করেন, রাজ্যময় শৃঙ্খলা স্থাপন করেন এবং বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে শাসন চালাতে থাকেন। তিনি পঞ্চাশ বছরকাল ৯১২-৯৬১ রাজত্ব করেন। সে যুগের হিসেবে এ অত্যন্ত দীর্ঘকাল। স্পেনে তিনিই প্রথম নিজকে খলীফা বলে ঘোষণা করেন। তাঁরই সময় হতে স্পেনে উমাইয়া বংশীয় খিলাফত শুরু হয়। তার এবং তার লাগ পরবর্তী দুইজন খলীফার আমলে পাশ্চাত্যে মুসলিম-শাসন উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়। এই যুগে–অর্থাৎ মোটামুটি দশম শতাব্দীতে কর্ডোভা সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সংস্কৃতির দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত শহর এবং বাগদাদ ও কন্সটানটিনোপলের সঙ্গে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তিনটি সংস্কৃতিকেন্দ্রের অন্যতম ছিল। কর্ডোভার পরিবার সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৩ হাজার, শহরতলী ছিল ২১টি, কুতুবখানা ছিল ৭০টি, বইয়ের দোকান, মসজিদ ও প্রাসাদ ছিল অসংখ্য। স্বভাবতঃই এর খ্যাতি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর দৃশ্য ভ্রমণকারীদের মনে বিস্ময়-সম্ভ্রমের উদ্রেক করে। শহরে বহু মাইল বিস্তৃত ইটে বাঁধানো পাকা রাস্তা ছিল এবং দুই পাশের বাড়ীর দীপের প্রভায় গলিসমূহ আলোক-উজ্জ্বল হয়ে থাকত। এ সময়ের ৭০০ বছর পর লন্ডনে একটি সরকারী বাতি দেখা যায়নি। আর এর অনেক শতাব্দী পর পর্যন্ত প্যারিসে কোন বৃষ্টির দিনে কেউ সিঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠলে তাকে এক হাঁটু কাদা নিয়ে উঠতে হত।”
