আমরা আগে দেখেছি যে, ৭৫০ সালে আব্বাসীয় বংশ উমাইয়া বংশকে উৎখাত করে। আমরা আরো দেখেছি, বিজয়ী বংশ পরাজিত বংশের যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
অতিঅল্প সংখ্যক লোকই এই নৃশংস হত্যার কবল হতে রেহাই পায়; তার মধ্যে একজন ছিলেন বিশ বছরের একটি যুবক। নাম তার আবদুর রহমান। লম্বা, পাতলা, লালচুল, ঈগলের মত তীক্ষ্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অত্যন্ত সবল স্নায়ু, অসামান্য কর্মক্ষমতা নানাদিক দিয়েই অসাধারণ। ইনিই স্পেনে চলে যান ইনিই লড়াই করে প্রভুত্ব অর্জন করেন, ইনিই প্রাচ্যে নিশ্চিহ্ন উমাইয়া বংশকে স্পেনে ক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত রাখেন।
তাঁর পলায়নের কাহিনী রোমাঞ্চকর। তিনি ইউফ্ৰেতীস নদীর পশ্চিম পারে একটি বেদুঈন তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় একদা আব্বাসীয়দের কৃষ্ণ পতাকাবাহী একদল অশ্বারোহী সেখানে আবির্ভূত হয়। তাঁর সঙ্গে তাঁর তেরো বছরের ভাই ছিল। ভাইকে নিয়ে তিনি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মনে হয়, ভাই তাঁর সাঁতারে দক্ষ ছিল না। পার হতে লোকেরা চীৎকার করে ডাকতে থাকে, ‘ফিরে এস–ফিরে এস। তোমার গায় হাত তুলব না।’ আবদুর রহমানের নিষেধ সত্ত্বেও বালক ফিরে যায়। পারের লোকেরা তাকে তখনি হত্যা করে। আবদুর রহমান সাঁতরিয়ে অপর পারে গিয়ে ওঠেন।
বন্ধুহীন, কপর্দকহীন আবদুর রহমান পায় হেঁটে দক্ষিণ-পশ্চিম পানে চলেন এবং বহু কষ্টের পর ফিলিস্তিনে গিয়ে পৌঁছেন। এখানে একটি বন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। এখান হতে আবার তিনি পশ্চিম পানে রওয়ানা হলো। এমনিভাবে তিনি গিয়ে পৌঁছেন উত্তর আফ্রিকায়। সেখানকার প্রাদেশিক শাসনকর্তা তাকে হত্যা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কোনরকমে বেঁচে যান। আজ এ কওমের কাছে গিয়ে কয়েক দিন থাকেন; কাল আর এক কওমের কাছে যান–পর তৃতীয় এক কওমের কাছে। এমনিভাবে যুবক ঘুরে বেড়াতে থাকেন। আর নতুন বংশে গুপ্তচর তার পেছনে লেগে থাকে। অবশেষে পাঁচ বছর পর তিনি সিউটায় গিয়ে পৌঁছেন। তিনি দামেস্কের দশম খলীফার পৌত্র ছিলেন এই অঞ্চলের বার্বাররা তাঁর মাতুল বংশ ছিল। তারা তাকে আশ্রয় দেয়।
সিওটা বরাবর প্রণালীর ওপারে দামেস্কের নিযুক্ত একদল সিরীয় সৈন্য অবস্থান করছিল। তিনি তাদের কাছে গিয়ে হাজির হন। তারা তাঁকে নেতা বলে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণের শহরগুলি একে একে তাঁর সামনে দুয়ার খুলে দেয়। সমস্ত স্পেন আয়ত্তে আনতে তার আরো কয়েক বছর সময় লাগে; কিন্তু তিনি অবিরাম চেষ্টা করতে থাকেন। বাগদাদের আব্বাসীয় খলীফা স্পেনের জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান, যাতে তিনি আবদুর রহমানকে উৎখাত করে সেদেশে আব্বাসীয় শাসন কায়েম করতে পারেন। দুই বছর পর বাগদাদের খলীফা আবদুর রহমানের নিকট হতে একটি উপহার পান? সেই গভর্নরের মস্তক লবন ও কর্পূরে রক্ষিত, কালো পতাকা ও তার নিযুক্তির সনদ দ্বারা আবৃত। দেখে খলীফা ব্যস্তভাবে বলে ওঠেন : আল্লাহর দরগায় শুকরিয়া যে, তিনি আমার আর এমন দুশমনের মাঝখানে সমুদ্র স্থাপন করেছেন। স্বয়ং শার্লেমেন একটি সংঘর্ষে তার দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুর রহমানের শক্তি-পরীক্ষা করেন। সে সংঘর্ষের কাহিনী পাশ্চাত্য সাহিত্যে অমর হয়ে আছে।
শার্লেমেনকে আব্বাসীয় খলীফাদের মিত্র মনে করা হত। তাছাড়া, নতুন আমীর বা সুলতান স্বভাবতঃই তার শত্রু মধ্যে গণ্য ছিলেন। শার্লেমেন ৭৭৮ সালে উত্তর-পূর্ব স্পেনের সীমান্ত পথে একদল সৈন্য পাঠান। তারা সারাগোসা পর্যন্ত এসে পৌঁছে। কিন্তু সারাগোসা আগন্তুক সৈন্যদের সম্মুখে নগর-দ্বার বন্ধ করে দেয়। ঠিক সেই সময়ই নিজ দেশে শার্লেমেনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে শত্রুদল মাথা তোলে। ফলে শার্লেমেনের সৈন্যদল সারাগোসা হতেই ফিরে যায়। পিরেনীজের পার্বত্য পথে যখন এরা প্রত্যাবর্তন করতে থাকে, তখন বাস্ক এবং অন্যান্য পার্বত্যজাতি পেছন হতে এদের আক্রমণ করে। ফলে এদের বহু সৈন্য ও রসদ বিধ্বস্ত হয়। নিহত নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন, প্রখ্যাতনামা বীর রোলেন্ড। চ্যানসন-ডি-রোলেন্ড’ নামক গ্রন্থে তাঁর সে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এ গ্রন্থখানি কেবল ফরাসী-সাহিত্যের অমূল্য রত্ন নয়–মধ্যযুগের একটি অপূর্ব সুন্দর মহাকাব্য।
৭৮৮ সালে আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়। তার দুই বছর আগে মক্কা ও বায়তুল মোকাদ্দেসের প্রতিদ্বন্দ্বী মসজিদ হিসেবে তিনি কর্ডোভায় একটি বিরাট মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর পরবর্তীরা এ মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ ও এর কলেবর বৃদ্ধি করেন। অল্পকাল মধ্যেই এ মসজিদ পাশ্চাত্য-ইসলামের উপাসনালয় হয়ে দাঁড়ায়। এর অসংখ্য উন্নত স্তম্ভ ও বিপুল অঙ্গন দর্শকদের বিস্ময় উৎপাদন করত। ১২৩৬ সালে মসজিদটিকে গীর্জায় পরিণত করা হয়। আজো এ কীর্তি ‘লা-মেজকিটা’ (মসজিদ) নামে বেঁচে আছে। এ মসজিদ ছাড়া, রাজধানীতে এর আগেই গোয়াডেল কুইভার নদীর উপর একটি মস্ত সেতু নির্মিত হয়। পরে এর খিলান সংখ্যা সতেরোতে গিয়ে দাঁড়ায়। গোয়াডেল কুইভার নামটি আরবী নাম ‘ওয়াদী-উল-কবীর’ (বড় নদী) নামের অপভ্রংশ। কিন্তু উমাইয়া প্রভুত্বের প্রতিষ্ঠাতা কেবল প্রজাপুঞ্জের সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন; তিনি বিভিন্ন উপায়ে আরব, সিরিয়ান, বার্বার, নুমিডিয়ান, হিস্পনো-আরব এবং গথ প্রভৃতি জাতিকে মিলিয়ে একজাতি গঠনের চেষ্টা করেন, যদিও তার এ চেষ্টার সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল নিতান্ত অল্প। নম হতে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুসলিম-স্পেনকে দুটি ‘বশ্ব-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করে, সে আন্দোলনের সূত্রপাত কার্যতঃ তিনিই করেন।
