চিত্রশিল্পীর চেয়ে লিপি-শিল্পী উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিল। রাজা বাদশাহরা পর্যন্ত কোরআন নকল করে সওয়াব হাসিলের চেষ্টা করতেন। সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ক আরবী গ্রন্থে কতিপয় লিপি-শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু ভাস্কর্য-শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও ধাতু-শিল্পীদের সম্পর্কে সেসব গ্রন্থ নিশ্চুপ। লিপি-শিল্পই একমাত্র আরব আর্ট, যার অনুশীলনে ইস্তাম্বুল, কায়রো, বৈরুত এবং দামেস্কে আজো খৃষ্টান ও মুসলমান উভয় শ্রেণীর বহু শিল্পী ব্যাপৃত রয়েছেন। তাদের হাতের কাজ রুচি ও সৌন্দর্যে প্রাচীনকালের যে কোন শ্রেষ্ঠ শিল্পের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর। কোরআনের সঙ্গে যোগ থাকার ফলে কেবল লিপি-শিল্পই নয়, বিচিত্র রং ও চিত্রে বইয়ের অঙ্গ-সজ্জা ও বই বাঁধানোর সংশ্লিষ্ট শিল্পও যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে। শেষ জামানার আব্বাসীয়দের অধীনে বই চিত্রিত করার শিল্প হয়, ইহা পঞ্চদশ শতাব্দীতে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে।
শাস্ত্রকারদের সঙ্গীত সম্পর্কিত আপত্তি দামেস্কে যেমন কার্যকরী হয় নাই, বাগদাদেও তেমনি কার্যকরী হয় নাই। হারুনর রশীদের মার্জিত ও জমকালো দরবার সাহিত্য ও বিজ্ঞানের যেমন পৃষ্ঠপোষকতা করে, কণ্ঠ ও যন্ত্র-সঙ্গীতেরও তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা করে। কার্যতঃ সে দরবার আলা দরজার সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদদের একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গোলাম-বাঁদী, গায়ক-গায়িকাসহ বহু বেতনভোগী ওস্তাদ দরবারের সাহায্যে মান ইজ্জতের সঙ্গে বাস করত। এদেরই অবলম্বন করে বহু অদ্ভুত উপাখ্যান সৃষ্টি হয়ে আরব্য উপন্যাসে স্থান লাভ করে। খলীফার পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত একটি উৎসবে দুই হাজার গায়ক অংশগ্রহণ করে। তার পুত্র আল-আমিন অনুরূপ একটি নৈশ উৎসবের ব্যবস্থা করেন। সে উত্সবে তার প্রাসাদের আমলারা নর-নারী নির্বিশেষে ভোর পর্যন্ত নৃত্য করে।
সে আমলের গায়কদের বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়, মুখারিকের মধ্যে। মুখারিক হারুনর-রশীদের আশ্রয়ে বাস করত। আদতে সে ছিল এক কশাইয়ের ছেলে। অল্প বয়সে একদা সে পিতার দোকানে বসে ‘গোশত চাই’ চাই ভালো গোশত ইত্যাদি বলে চীৎকার করছিল। তার সুন্দর ও শক্তিমান গলা শুনে একজন গায়িকা তাকে কিনে নেয়। পরবর্তীকালে সে হারুনর রশীদের আয়ত্তে এসে পড়ে। হারুন তাকে আযাদ করে একলক্ষ দিনার উপহার দেন এবং তার নিজ পাশে তাকে স্থান দিয়ে তার ইজ্জত বাড়িয়ে দেন। একদা সন্ধ্যায় সে তাইগ্রিস নদীর বুকে গিয়ে ছেড়ে গান শুরু করে। তখনই দেখা যায় যে, বাগদাদের অলি-গলির চারদিক হতে প্রদীপ হাতে বহু লোক তার গান শোনার জন্য উতলা হয়ে ছুটে আসছে।
মুখারিক ও অন্যান্য বহু গুণী মানুষ সে উন্নতির যুগে খলীফাদের সাথী হিসেবে অমরত্ব অর্জন করেন। কিন্তু এঁরা কেবল গানের ওস্তাদ ছিলেন না, আরো কিছু ছিলেন। এঁদের তীক্ষ্ণ রস-জ্ঞান ও প্রবল স্মরণশক্তি ছিল। এঁরা বহু বাছা বাছা কবিতা ও রসাল উপাখ্যান বলতে পারতেন। এঁরা তল্কালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে সুপরিচিত গায়ক, রচক, কবি এবং পণ্ডিত ছিলেন। গুরুত্বের দিক দিয়ে এরপরই স্থান ছিল বাদকদের। বীণা সবচেয়ে লোক-প্রিয় ছিল। বেহালা (ভায়োল) সাধারণতঃ নিম্নস্তরের বাদকরা বাজাত। তারপর স্থান ছিল গায়িকা বালিকাদের। এরা প্রায়শঃ পরদার আড়ালে থেকে গাইত। এ শ্রেণীর গায়িকা বালিকারা ক্রমে হেরেমের অপরিহার্য সৌন্দর্যের প্রতীকরূপে পরিগণিত হয়। এদের লালন ও শিক্ষা দান এক লাভজনক শিল্প হয়ে দাঁড়ায়। এমন একটি বালিকার জন্য মিসরের গভর্নর ৩০ হাজার দিনার দিতে চেয়ে দূত পাঠান; বাইজেন্টাইন সম্রাটের এক প্রতিনিধি ঐ পরিমাণ অর্থ দিতে চান; খোরাসানের গভর্নর দিতে স্বীকার করেন ৪০ হাজার দিনার। বাদীর মালিক সবাইকে হার মানিয়ে তাকে আযাদী দিয়ে সাদী করেন।
আব্বাসীয়দের সোনার যুগে বহু গ্রীক গ্রন্থ আরবীতে অনূদিত হয়। তাঁর মধ্যে কয়েকটি ছিল সঙ্গীতের তত্ত্বমূলক গ্রন্থ। এইসব গ্রন্থ হতেই আরবরা সঙ্গীত সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব লাভ করে এবং দেহের উপর শব্দ কি ক্রিয়া করে, সে সম্বন্ধে অবহিত হয়। কিন্তু সঙ্গীতের ব্যবহারিক ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণভাবে আরব-আদর্শের উপর নির্ভর করে। এর কাছাকাছি সময়ে আরবরা গ্রীক ভাষা হতে ‘মিউজিকী’ পরে (মিউজিকা–মিউজিক) শব্দটি ধার করে এনে সঙ্গীত বিজ্ঞানের কেবল তত্ত্বমূলক ভাগের জন্য ব্যবহার শুরু করে ব্যবহারিক ভাগের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে পুরোনো আরবী শব্দ ‘গীনা।’ এর আগে গীনা শব্দে নাচ-গান উভয়ই বুঝাত। কিতার’ (গিটার) এবং উরগুন’ (অরগান) যন্ত্রের নাম হিসেবে ও অন্যান্য পারিভাষিক শব্দ এই সময় গ্রীক হতে এসে আরবী ভাষায় স্থান লাভ করে। অরগান’ নিঃসন্দেহ রকমে বাইজেন্টাইনদের নিকট হতে আমদানী করা হয়।
দুর্ভাগ্যক্রমে পারিভাষিক গ্রন্থগুলির বেশীর ভাগই হারিয়ে গেছে। নগম’ ও ইকা প্রভৃতি আরবী সঙ্গীতের উপকরণ কেবল মুখে মুখে শিখানো হত। সে পর্যন্ত এই দুই-ই লোপ পেয়েছে। আরবী সুরে (চ্যান্ট) স্বর-মাধুর্যের (মেলোডী) পরিমাণ কম; কিন্তু এ সুর ছন্দে শক্তিশালী। পুরোনো সঙ্গীত সম্বন্ধে যে কয়খানা বই আছে, তা কোন আধুনিক পাঠক ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে পারে না বা ছন্দ ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় সেকালের মানে বোঝে না।
১৪. জগত-মণি কর্ডোভা
মুসলিম-সাম্রাজ্যের পূর্বভাগ যখন তার সোনার যুগের সীমান্তে উপনীত, সেই সময় সে সাম্রাজ্যের সুদূর পশ্চিমভাগও স্পেনে অনুরূপ জাঁকজমকের মধ্যে রাজ্য-শাসনে ব্যস্ত। আমাদের পক্ষে স্পেনের এ যুগ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, আমরা যে সভ্যতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি তার জন্ম হয় প্রাথমিক মধ্যযুগীয় খৃস্টান সংস্কৃতির অন্তঃস্থলে আরব সংস্কৃতির প্রবেশের ফলে; আর সে আরব সংস্কৃতি প্রধানতঃ এই স্পেন হতেই অগ্রসর হয়। নবম এবং একাদশ শতাব্দীর মাঝখানে এই পাশ্চাত্যে মুসলিম-সভ্যতা তার উচ্চতর শিখরে আরোহণ করে। কিন্তু এ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার আগে আমাদিগকে আমাদের কাহিনী প্রসঙ্গে ৭৫০ অব্দে ফিরে যেতে হবে।
