আল-মুতাওয়াক্কিলের আগ পর্যন্ত বাগদাদের বাইরের কোন বিধ্বস্ত আব্বাসীয় কীর্তির আনুমানিক তারিখ নির্ণয় কঠিন। মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭ ৮৬১) সামাররার বিরাট মসজিদের নির্মাতা। এই জামে মসজিদটি ৭ লক্ষ দিনার খরচ করে তৈরী করা হয়। আকারে মসজিদটি চৌকোণ ছিল; এর জানালার বিচিত্র খিলান পাক-ভারতীয় প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগের যেসব আব্বাসীয় ভগ্ন-কীর্তি রাককায় পাওয়া যায়, তা এবং সামাররায় প্রাপ্ত কীর্তি-চিহ্ন এশিয়ার বিশেষ করে পারসিক ভাস্কর্য-রীতির ঐতিহ্যের পরিচায়ক। উমাইয়া ভাস্কর্য-রীতি কিন্তু বাইজেন্টাইন-সিরিয়ান ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট পরিচয় বহন করে।
আমরা আগেই বর্ণনা করেছি যে, একজন খলীফা তার প্রাসাদশীর্ষে একটি বর্শাধারী অশ্বারোহী মূর্তি স্থাপন করেন। এ মূর্তি হয়তো দিক-নির্দেশক যন্ত্রের কাজ করত। আর একজন খলীফা তাইগ্রিস বক্ষে প্রমোদ-বিহারের জন্য সিংহ, ঈগল ও শুশুক মূর্তির বজরা তৈরী করেন; এবং আরো একজন খলীফা তাঁর প্রাসাদের বিরাট পুকুরে সোনা-রূপায় তৈরী আঠারোটি শাখামুক্ত এক গাছ স্থাপন করেন। পুকুরের দুই পারে কিংখাবের পোশাক পরিহিত অশ্বারোহীর মূর্তি ছিল; তারা বর্শা হাতে নিয়ে এমনভাবে নড়াচড়া করত, যেন লড়াইয়ে মেতে আছে।
সামাররার নির্মাতা খলীফা আল-মুতাসীমের প্রাসাদ-দেয়াল নারীমূর্তি এবং শিকারের দৃশ্যে সজ্জিত ছিল। এগুলি হয়তো ছিল কোন খৃস্টান শিল্পীর কাজ। তার পরবর্তী দ্বিতীয় খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে এই অস্থায়ী রাজধানী সামাররা উন্নতির শিখরে আরোহণ করে। আল-মুতাওয়াক্কিল তার প্রাসাদ প্রাচীরের রূপসজ্জার জন্য বাইজেন্টাইন চিত্রকর নিযুক্ত করেন। তারা নানা, চিত্রের মধ্যে পাদ্রীসহ একটি গীর্জার চিত্র সে সজ্জার অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই।
মুসলিম-জগতে চিত্র-বিদ্যাকে জোর করে কাজে লাগানো হয়েছে অনেক দেরীতে। বৌদ্ধ ও খৃস্টান-জগতে চিত্র-বিদ্যা যেমন সম্পূর্ণরূপে ধর্মের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে, মুসলিম-জগতে তেমন কখনো ঘটে নাই। জনৈক আরব ভ্রমণকারী নবম শতাব্দীর শেষভাগে চীনের দরবারে মহানবীর একটি ছবি দেখেন। এর আগের আর কোন ছবির দলীল নাই। তবে এ ছবি হয়তো নেস্টোরীয়ান খৃস্টানদের আঁকা ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রারম্ভের আগে মুসলিম ধর্মীয় ছবি পূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে নাই। স্পষ্টই মনে হয়, প্রাচ্যদেশীয় খৃষ্টান গীর্জা বিশেষ করে জ্যাকোবাইট ও নেস্টোরীয়ান খৃস্টানদের নিকট হতেই এ আদর্শ গ্রহণ করা হয়।
আরবরা পারসিক সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। পারসিকরা অতি প্রাচীনকালেই রং ও রূপ-সজ্জামূলক পরিকল্পনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। তাদের চেষ্টায় ইসলামে ব্যবসায়গত চিত্র-শিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। ফেরাউনীয় যুগের মিসরে গালিচা-শিল্পের সূচনা হয়। পারসিকদের হাতে এ শিল্পের অসাধারণ বিকাশ লাভ হয়। কম্বলের উপর সাধারণতঃ শিকার ও বাগানের ছবি আঁকা হত; রং পাকা করার জন্য তারা ফিটকারী ব্যবহার করত। মিসর ও সিরিয়ার হস্তচালিত তাঁতে যে সব কারুকাজ করা রেশমী কাপড় উৎপন্ন হত, ইউরোপে তার কদর এত বেশী ছিল যে, ক্রুসেডার ও পাশ্চাত্যের ঋষি-দরবেশদের মাজার ও পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন ঢাকার জন্য এই কাপড়কেই সর্বাগ্রগণ্য মনে করা হত।
মৃৎ-শিল্প মিসর ও সুসার মতই প্রাচীন। মাটির বাসনের এ শিল্পে সৌন্দর্য বিধানের কাজে মুসলমানেরা যে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে, তার চেয়ে অধিক দক্ষতা তারা আর কোন শিল্পেই করে নাই। বাসনের গায়ে তারা মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা এবং জ্যামিতিক চিত্র আঁকত–কখনো-বা লিখত উদ্ধৃত কবিতা। চিত্রিত কাশানী টাইল’ পারস্য হতে দামেস্কে আমদানী হয়। দালান কোঠার ভিতর এবং বাইর সাজানোর জন্য এই টাইল ও মোজাইক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। আরবী বর্ণমালার হরফ অবলম্বন করেও একটি সুন্দর আর্টের সৃষ্টি হয়। বাস্তবিক, ইসলামী চিত্র-শিল্প আরবী হরফ থেকে যথেষ্ট প্রেরণা লাভ করে। এমনকি আরবী হরফ চিত্রণ ধর্মের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যেসব শহরে ইনামেল করা ও কাঁচে সোনালী রং করার কাজ পূর্ণ বিকাশ লাভ করে, তার মধ্যে এনটিওক, আলেপ্পো, দামেস্ক এবং প্রাচীন ফিনিশীয় শহরের মধ্যে টায়ার ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লুভার, বৃটিশ মিউজিয়াম ও কায়রোর আরব মিউজিয়ামের বহু অমূল্য সংগ্রহের মধ্যে আছে সামাররা ও ফুসতাত হতে আনীত বাসন, পেয়ালা, ফুলদানী, সোরাহী এবং বাতিদানী (বাড়ী ও মসজিদ উভয় স্থানে ব্যবহারের জন্য)। অদ্ভুত উজ্জ্বল রঙে এগুলি চিত্রিত। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন তাতে ফুটে উঠছে রামধনুর পরিবর্তনমান রঙের সুন্দর আভা।
দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হিজরীতে লিপি-শিল্পের উদ্ভব হয়। এ শিল্পে কোরআনের অনুমোদন ছিল। আর এর উদ্দেশ্যও ছিল আল্লাহর কালামকে রূপ দেওয়া। কাজেই অনতিকাল মধ্যেই এ একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ছিল সম্পূর্ণ ইসলামী আর্ট এবং চিত্র-শিল্পের উপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জীবন্ত কোন সৃষ্টির ছবি আঁকতে পারত না বলে মুসলমানদের সৌন্দর্য-পিপাসা এই খাতে প্রবাহিত হয়।
