আরব ঐতিহাসিকেরা সে যুগের ঘটনাবলী সম্বন্ধে যথেষ্ট বিস্তৃতভাবে লিখলেও তাদের নিজস্ব প্রকৃতিসঙ্গত ঐতিহাসিক সাধনার ফল হচ্ছে, হাদীস বা ধর্মীয় ঐতিহ্য-বিজ্ঞান। হযরত মুহম্মদের (সঃ) পর প্রথম আড়াই শতাব্দীর মধ্যে তাঁর কথা ও কাজের দলীল বহু পরিমাণে বেড়ে যায়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোন সমস্যার উদ্ভব হলেই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলি মহানবীর কোন কথা বা রায় উদ্ধৃত করে নিজ নিজ মত সমর্থন করত, তা মহানবীর উদ্ধৃত কথা বা রায় সঠিকই হোক আর কৃত্রিমই হোক।
প্রত্যেক পূর্ণ হাদীস দুই অংশে বিভক্ত ও বর্ণনা-পরম্পরা ও মূল বিষয়। মূল বিষয় বর্ণনানুক্রমের পরে আসে এবং সোজাসুজি বলা হয়? ক’ আমার কাছে বর্ণনা করল যে খ’ তার কাছে বর্ণনা করেছে; খ বলেছে গ এর উপর নির্ভর করে, আর গ বলেছে ঘ-এর উপর নির্ভর করে এবং ঘ বলেছে….।’ এই একই আর্যা ফরমূলা সরকারী ইতিহাস ও জ্ঞান-সাহিত্যে (উইজডম লিটারেচার) প্রযুক্ত হয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে সমালোচনা ছিল বাইরের জিনিস। কারণ, তা সীমাবদ্ধ ছিল বর্ণনাকারীদের সততা বিচারেযাতে একটা সম্পূর্ণ বর্ণনানুক্রম স্বয়ং মহানবী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে পারে।
রোমকদের পর মধ্যযুগীয় জাতিসমূহের মধ্যে একমাত্র আরবরাই আইন বিজ্ঞান অনুশীলন করে একটা স্বতন্ত্র বিধানের বিকাশ সাধন করে। এর আসল ভিত্তি ছিল কোরআন ও হাদীস; তবে এর উপর গ্রীকো-রোমাক আইনের প্রভাব বিস্তৃত হয়। ইসলামের শায়ী আইন মারফত কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর আদেশাবলী পরবর্তী যুগের মুসলমানদের জ্ঞাত করানো হয়।
শরায়ী আইনের বিধান মুসলমানের-কি ধর্মীয়, কি রাজনৈতিক, কি সামাজিক সমস্ত জীবনই নিয়ন্ত্রণ করে। এ আইন তার বিবাহ জীবন, তার নাগরিক জীবন এবং অমুসলমানের সঙ্গে তার ব্যবহারগত জীবন পরিচালনা করে থাকে। ধর্মীয় আইনের উপরই মুসলমানের নৈতিক আইনের ভিত্তি। আইনের দিক হতে মানুষের সমঃ কাজকে পাঁচভাগে বিভক্ত করা হয়েছে : ১. অপরিহার্য ফরয, –(অবশ্য পালনীয়) পালন না করলে শাস্তি; ২. প্রশংসনীয় পুণ্য কাজ । করলে পুরস্কার না করলে শাস্তি নাই ৩. অনুমতি দেওয়া কাজ; আইন এ সম্বন্ধে উদাসীন; . না পছন্দ কাজ; অননুমোদিত–তবে শান্তি নাই; ৫. হারাম কাজ । করলে কঠোর শাস্তি।
কোরআন ও হাদীসের উপর ভিত্তি করে নীতিশাস্ত্রের যে সব বই লেখা হয়েছে, তার সংখ্যা প্রচুর হলেও আরবী সাহিত্যে নীতিঘটিত যত কথার আলোচনা আছে, তার সমস্ত ও-সব বইয়ে স্থান পায় নাই। এইসব দার্শনিক গ্রন্থে আত্মসমর্পণ, সন্তোষ এবং সবরের যথেষ্ট প্রশংসা করা হয়েছে; পাপ হচ্ছে, আত্মার ব্যারাম আর দার্শনিক তার চিকিত্সক ।
১০০০ সালের কাছকাছি আরবী সাহিত্য উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করে; কিন্তু পারস্যের প্রভাবের ফলে রচনা-রীতি কৃত্রিম ও অলঙ্কারবহুল হয়ে পড়ে। প্রাথমিক যুগের সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ এবং সহজ প্রকাশভঙ্গী চিরদিনের জন্য বিদায় গ্রহণ করে। এর স্থান দখল করে এক মার্জিত সুন্দর উপমাবহুল ও ছন্দোময় রচনাশৈলী। পাশ্চাত্য জগত এ যুগের সাহিত্যের মধ্য হতে একখানি। বই বেছে নিয়েছে–আরব্য উপন্যাস এবং তারই উপর এর সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে। আল-জাহশিয়ারী (মৃত্যু ৯৪২) একটি পারস্য দেশীয় কাহিনী অবলম্বন করে এর প্রথম খসড়া তৈরী করেন। পরে স্থানীয় গাল্পিকরা অন্যান্য কাহিনী ও নায়িকা শাহারজাদের নাম যোগ করে। যতই দিন যেতে থাকে ততই পাক-ভারতীয়, গ্রীক, হিব্রু, মিসরীয় এবং অন্যান্য সর্বপ্রকার প্রাচ্য গল্প এর সঙ্গে যোগ হতে থাকে। হারুনর রশীদের কাল্পনিক দরবার অবলম্বনে অনেকগুলি রসাল গল্প ও ভালোবাসার কাহিনী জন্মলাভ করে। চতুর্দশ শতাব্দীর আগে এ উপন্যাসে গল্পের সংযোজন শেষ হয় নাই। আশ্চর্যের কথা এই, আরব্য-উপন্যাস প্রাচ্যের চেয়ে পাশ্চাত্যে অনেক বেশী লোক-প্রিয়।
আরব্য উপন্যাস যখন আরবীতে শেষ আকার ধারণ করে, তখন সাহিত্য ও বিজ্ঞানে মুসলমানদের সোনার যুগ শেষ হয়ে গেছে। আব্বাসীয় যুগের পর বিজ্ঞানের কোন বিভাগেই আর কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় নাই। আজকের মুসলমানেরা কেবল তাদের নিজের বইয়ের উপর নির্ভর করলে তাদের সেই সুর একাদশ শতাব্দীর পূর্ব পুরুষদের চেয়ে নীচেই তাদের স্থান হবে। চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা ও অন্যান্য শাস্ত্রে মুসলমানরা একটা নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত ওঠে। তারপর যেন মুসলিম-জগতের মন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম ও বিজ্ঞানঘটিত অতীত ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ ভক্তি আরব-বুদ্ধিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলে; কেবল ইদানীং তারা শৃঙ্খল ভাঙ্গতে শুরু করেছে।
১৩. চারু শিল্প
সেমিটিক মনের অধিকারী আরব। কবিতার মত চারু-শিল্পের সে বস্তুর বিভিন্ন খণ্ড ও অন্তর্নিহিত আদর্শের দিকে নজর দিয়েছে বেশী–সমস্ত খণ্ডকে মিলিয়ে এক সুসমঞ্জস অখণ্ড সৃষ্টিতে তার ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেছে কম। তবে বিজ্ঞানে যেমন সে খানিক দূর অগ্রসর হয়ে তার থেমে যায়–ভাস্কর্য শিল্পে, বিশেষ করে চিত্র-শিল্পে তেমন ঘটে নাই।
ভাস্কর্য শিল্পের যে-সব অতুল্য অবদান একদিন বাগদাদের শোভা বর্ধন করত, আজ তার কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নাই। মুসলিম ভাস্কর্য-প্রতিভার দুটি অমর সৃষ্টি এখনো বেঁচে আছে? এ দুটি হচ্ছে, দামেস্কের মহান মসজিদ আর বায়তুল মোকাদ্দেসের প্রস্তর গম্বুজ। কিন্তু এ দুটিই আরো আগের জামানার কীর্তি। সেকালের বাগদাদের অদ্ভুত জাকজমকের কথা আমরা জানি; কিন্তু খলীফা আল আমিন ও আল-মামুনের গৃহযুদ্ধ, ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের অনুষ্ঠিত ধ্বংসলীলা এবং স্বাভাবিক কারণ–সমস্ত মিলে শহরটির এমনি পরিপূর্ণ বিনাশ সাধন করেছে যে, আজ সে প্রাসাদসমূহের অবস্থান-ভূমি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
