মেটিরিয়ামেডিকা, গ্রহ-বিজ্ঞান এবং গণিতের পরই আরবদের শ্রেষ্ঠ দান রসায়ন-শাস্ত্রে। রসায়ন এবং অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়নে তারা বাস্তব পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান শুরু করেন। গ্রীকদের অস্পষ্ট আন্দাজের চেয়ে এ নিঃসন্দেহ রকমে উন্নতর পদ্ধতি ছিল। প্রকৃতির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য সংগ্রহে অসাধারণ ধৈর্য থাকা সত্ত্বেও আরবরা সহজে কোন উপযুক্ত হাইপথিসিস বা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারত না। তাদের চরম দুর্বলতা দেখা দিত, কোন পদ্ধতির চরম বিশ্লেষণের বেলায়।
‘আল কিমিয়াকে’ আমরা আরবী শব্দ বলে জানি। আসলে শব্দটি ছিল অতি প্রাচীন যুগের একটি মিসরীয় শব্দ; মানে ছিল কালো। গ্রীক ভাষার ভিতর দিয়ে শব্দটি আরবীতে আসে। আরবীয় আল-কিমিয়ার জনক ছিলেন জাবের-ইবনে হাইয়ান। ৭৭৬ সালের কাছাকাছি কুফায় তার আবির্ভাব হয়। তাঁর মিসরীয় ও গ্রীক পূর্ববর্তীদের মত তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, কোন রহস্যপূর্ণ দ্রব্যের সাহায্যে টিন, সীসা, লোহা ও তামা প্রভৃতি মৌলিক ধাতুকে সোনা বা রূপায় রূপান্তরিত করে চলে এবং এই অনুসন্ধানে তিনি ব্যাপৃত হন। পরীক্ষামূলকভাবে বিজ্ঞান অধ্যয়নের গুরুত্ব তিনি সে আমলে সমস্ত কিমিয়াবিদদের চেয়ে অধিতর স্পষ্টরূপে উপলব্ধি করেন এবং রসায়নশাস্ত্রের উন্নতি বিধানে তার তত্ত্বগত ও কার্যগত অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্য জগতে একটা বিশ্বাস চলে আসছে যে, তিনি কয়েকটি রাসায়নিক কমপাউন্ড আবিষ্কার করেন; কিন্তু যে বাইশটি আরবী বইয়ে লেখক হিসেবে তার নাম আছে, তার কোনটিতে এ আবিষ্কারের উল্লেখ নাই। একথা সত্য যে, আরবী ও ল্যাটিনে যে একশ বই তার নামে চলে, তার বেশীর ভাগই মেকি। তথাপি তার নামে চলিত বইগুলি চতুর্দশ শতাব্দীর পর এশিয়া ও ইউরোপ উভয় মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাসায়নিক আলোচনা পুস্তক ছিল। তার কয়েকটি অবদান সম্বন্ধে আমরা নিঃসন্দেহ। তিনি বিজ্ঞানসম্মত ভাষায় রসায়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া–ভস্মীকরণ (ক্যালসিনেশন) এবং উপাদান বিশ্লেষণ (রিডাকশন) বর্ণনা করেন। বাষ্পীভূতকরণ (ইভাপোরেশন), ঊর্ধ্বপাতন (সাবলিমেশান), দ্রবীভূতকরণ (মেলটিং) এবং জমাটভুক্তকরণ (ক্রিস্টালিজেশন) প্রক্রিয়ার তিনি উৎকর্ষ সাধন করেন। তিনি কাঁচা সালফিউরিক ও নাইট্রিক এসিড তৈরী করে তা মিশিয়ে একোয়া রিজীয়া (পানির রাজা) উৎপাদন করতে জানতেন এবং সে একোয়া রিজীয়ায় সোনা ও রূপা গলান যেত। এই যে দাবী, এর কোন প্রমাণ নাই। ধাতুর উপাদান সম্বন্ধে আরাস্তুর মতবাদকে তিনি সংশোধন করেন এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে আধুনিক রসায়নের আরম্ভের আগ পর্যন্ত সামান্য পরিবর্তনসহ তার সেই মতবাদ প্রচলিত থাকে।
হজ অনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, মক্কার দিক করে মসজিদ তৈরীর নিয়ম এবং নামাজের সময় কাবার দিকে সিজদাকরণ–এইসব কারণ মুসলমানকে ভূগোল অধ্যয়নে উৎসাহিত করে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমা নির্ণয়ের জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রের দরকার ছিল। জ্যোতিষও তার বৈজ্ঞানিক-প্রভাব বিস্তার করে। সপ্তম এবং নবম শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম সওদাগরেরা পূর্ব দিকে জল-স্থল উভয় পথে চীনে পৌঁছে; দক্ষিণ জাঞ্জিবার দ্বীপ ও আফ্রিকার দূরতম উপকূলে গিয়ে হাজির হয় এবং উত্তরে রাশিয়ায় গিয়ে প্রবেশ করে। পশ্চিম দিকে তাদের অগ্রগতি রুদ্ধ হয় অন্ধকার সমুদ্রে (আটলান্টিকের) অনন্ত বারিরাশি দ্বারা। প্রত্যাগত সওদাগরদের মুখের কাহিনী জনগণের মনে দূরদূরান্তের দেশ ও জাতি সম্বন্ধে কৌতূহলের উদ্রেক করত। টলেমীর ভূগোল সোজাসুজি কিংবা সিরীয় ভাষা মারফত আরবীতে কয়েকবার অনূদিত হয় এবং এর সাহায্যে বিখ্যাত খাওয়ারিজমী অন্যান্য ৬৯ জন পণ্ডিতসহ পৃথিবীর একটি রূপ-কল্প মূর্তি মানচিত্র তৈরী করেন। এই-ই ছিল মুসলিম জগত ও পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানচিত্র। আরব ভৌগোলিকেরা পাক-ভারত হতে একটা ধারণা পেয়েছিল যে, পৃথিবীর একটা কেন্দ্রস্থল আছে। তারা এর নাম দিয়েছিল আরিন। এ ছিল টলেমীর ভূগোলে উল্লেখিত একটি পাক-ভারতীয় শহরের নামের অপভ্রংশ। এ শহরে একটি মান-মন্দির ছিল এবং এই শহরের দ্রাঘিমা রেখার উপর নাকি স্থাপিত ছিল পৃথিবীর চূড়া। টলেমীর মত মুসলিম ভৌগোলিকেরা সাধারণতঃ প্রধান প্রাইম মেরিডীয়ান হতে দ্রাঘিমার মাপ-জোক করতেন। এখন যাকে ক্যানারী দ্বীপমালা বলে, এ মেরিডীয়ান তারই উপর দিয়ে গেছে।
দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে যেমন গ্রীক প্রভাব সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ছিল, ইতিহাস এবং সাহিত্য রচনাতে তেমনি পারসিক প্রভাব সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ছিল। কিন্তু বিষয়ের উপস্থাপনে চিরাচরিত ইসলামী প্রথাই চলতে থাকে। প্রত্যেক ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শী বা সমসাময়িকদের কথায় বর্ণিত হয় এবং একের পর এক অনেকজন বর্ণনাকারীর মারফত শেষ বর্ণনাকারী গ্রন্থকারের নিকট পৌঁছে। এই পদ্ধতি অনুকরণ করায় ঘটনার সঠিকতা বৃদ্ধি পায়; আর এতে তারিখ ও একদম মাসের দিন পর্যন্ত দেওয়ার তাগিদ থাকে। কিন্তু বর্ণনাকারীরা অখণ্ড শৃঙ্খলে বর্ণনা করেছে কিনা এবং তারা বিশ্বাসযোগ্য ছিল কিনা, ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ের জন্য এর উপর যতখানি নির্ভর করা হত, আসল ঘটনার সূক্ষ্ম বিচারমূলক পরীক্ষার উপর ততখানি নির্ভর করা হত না। ব্যক্তিগত বিচার-বুদ্ধি অনুসারে বর্ণনাকারী নির্বাচন এবং তথ্যাবলী সাজানো ছাড়া ইতিহাসবেত্তা বিশ্লেষণ, সমালোচনা, তুলনা বা অনুমানশক্তির প্রয়োেগ কমই করতেন।
