দর্শন-শাস্ত্রের ক্ষেত্রে আরবদের প্রধান অবদান এই যে, তারা গ্রীক চিন্তার সঙ্গে ইসলামী ভাবধারার সামঞ্জস্য বিধান করে। এ বিষয়টি নিতান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আরবদের বিবেচনায় মানুষের চিন্তা-শক্তির বলে যতখানি সভব, বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয়ের সেই পরিমাণ জ্ঞানই হচ্ছে দর্শন শারে দান। এ মতবাদ আসলে গ্রীক মতবাদের মূলকথা। আরবদের এ মতবাদ বিজিত, জাতিদের চিন্তাধারা এবং অন্যান্য প্রাচ্য চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেই পরিবর্তিত অবস্থায় আরবরা একে ইসলামের চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান ও আরবী ভাষায় প্রকাশের ব্যবস্থা করে। গ্রীক-বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আরবরা বিশ্বাস করত যে, আরাস্তু তাঁর গ্রন্থাবলীতে যাবতীয় দার্শনিক তত্ত্বকে সূত্ররূপে বিধিবদ্ধ করেছেন। আর গ্যালেন তার গ্রন্থাবলীতে যাবতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংক্ষিপ্ত সার দিয়েছেন। অবশ্য সে যুগে গ্রীক-দর্শন ও গ্রীক চিকিৎসা-বিজ্ঞানই প্রতীচ্যের একমাত্র সম্বল ছিল। মুসলমান হিসেবে আরবরা বিশ্বাস করত যে, কোরআন ও ইসলামী ধর্মশাস্ত্রে যাবতীয় ধর্মীয় আইন ও অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত সার আছে। সুরাং, তাদের মৌলিক অবদান এক দিকে দর্শন ও ধর্মশাত্রের, অন্য দিকে দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মধ্যম সীমান্ত ভূমিতে আবদ্ধ ছিল। একেশ্বরবাদ ছিল প্রাচীন সেমিটিক জগতের মহত্তম অবদান; আর গ্রীক দর্শন ছিল। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় জগতের মহত্তম অবদান। মধ্যযুগীয় ইসলাম এই একেশ্বরবাদিতা ও গ্রীক-দর্শনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান দ্বারা অবিনশ্বর কীর্তি অর্জন করে। এইরূপে ইসলাম ইউরোপকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীর জয়যাত্রার পথে নিয়ে আসে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জগতে–বিশেষ করে মুসলিম জাহানে–জ্ঞান বিভিন্ন বিভাগে এখনকার চেয়ে অনেক কম বিভক্ত ছিল দার্শনিকরা গণিত ও সঙ্গীতবিদ হতে পারতেন; আবার জ্যোতির্বিদরা কবি হতে পারতেন। আধুনিক পাশ্চাত্য পাঠক ইসলামের শ্রেষ্ঠতম জ্যোতির্বিদদের মধ্যে প্রথিতযশা ওমর খইয়ামকে দেখে বিস্ময় বোধ করবেন; কারণ সুবিখ্যাত রুবাইয়াত’ তারই অমর লেখনীর অবদান। তিনি সত্যিকার ফারসী কবি ও স্বাধীন-চিন্তাবিদ ছিলেন; আবার সেই সঙ্গে তিনি প্রথম শ্রেণীর গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ছিলেন। আল-কিন্দীও এই শ্রেণীর পণ্ডিত ছিলেন। দার্শনিক হিসেবে তিনি নিও-প্ল্যাটোনিকদের মত আফলাতুন ও আরাস্তুর মতবাদকে একীভূত করতে চেষ্টা করেন এবং লিও পিথাগোরীয়ান গণিতকে সমস্ত বিজ্ঞানের ভিত্তি বলে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তিনি দার্শনিক ছাড়া আরো কিছু ছিলেন। তিনি জ্যোতিষী, কিমিয়াবিদ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং সঙ্গীত-বিদ্যাবিদ ছিলেন। তিনি ২৬৫ খানা বই লেখেন বলে কথিত; কিন্তু দুঃখের বিষয় এর বেশীর ভাগই হারিয়ে গেছে। চক্ষু সংক্রান্ত আলোক-বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় তার প্রধান বইখানি ইউক্লিডের অপটিকস-এর উপর ভিত্তি করে লিখতে হয়। এ পুস্তক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় জগতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয় এবং রোজার বেকনকে প্রভাবিত করে। তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ হতে প্রতীয়মান হয় যে, ছন্দ ও তালযুক্ত সঙ্গীত খৃস্টান ইউরোপে প্রবর্তিত হওয়ার বহু শতাব্দী আগে মুসলিম জগতে প্রচলিত ছিল।
পাক-ভারতীয় গ্রন্থ ‘সিদ্ধান্ত’ ৭৭১ সালে বাগদাদে নীত এবং এরই প্রভাবে মুসলিম জগতে জ্যোতিষ-শাত্রের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন শুরু হয়। নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যে মোটামুটি নির্ভুল যন্ত্রের সাহায্যে প্রথম পর্যবেক্ষণ শুরু হয় এবং সে শতাব্দীর মধ্যভাগের আগেই খলীফা আল-মামুন বাগদাদের ভিতরে ও দামেকের বাইরে মান-মন্দির নির্মান করেন। সে যুগের উপকরণ ছিল উচ্চতা পরিমাপক যন্ত্র ( কোয়াডরেন্ট ও এস্ট্রোলেব) সূর্য ঘড়ি (ডায়াল) ও গোলক (গ্লোব)। এই খলীফার জ্যোতির্বিদারা একটা নিতান্ত সূক্ষ্ম হিসাবের কাজ করেন : অর্থাৎ পার্থিব ডিগ্রীর দৈর্ঘ্য পরিমাপ। এর উদ্দেশ্য ছিল, পৃথিবীকে গোলাকার ধরে নিয়ে তার আয়তন নির্ণয় করা। ইউফ্রেতীসের উত্তরখ সমতল ভূমি ও পামীরার নিকট এই জরিপ কাজ সমাধা করা হয় এবং এ জরিপের ফলে মধ্যরেখার মেরিডিয়ামের) এক ডিগ্রীর দৈর্ঘ্য পাওয়া যায় ৫৬জত(২,৩) আরবী মাইল। আশ্চর্য রকম সূক্ষ্ম হিসাব; কারণ ওখানকার ডিগ্রীর যা প্রকৃত দৈর্ঘ্য, এ হিসাবে তার চেয়ে মাত্র ২৮৭৭ ফুট বেশী দেখান হয়।
যে সব জ্যোতির্বিদ এ কাজে সম্ভবতঃ শরীক হন, তাদের মধ্যে ছিলেন আল-খাওয়ারিজমী। ইনি ইসলামের শ্রেষ্ঠতম বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম এবং মধ্যযুগীয় সমস্ত লেখকের চেয়ে ইনি গণিত-বিষয়ক চিন্তাকে অধিকতর প্রভাবিত করেন। তিনি সবচেয়ে আগে গ্রহ-বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় নির্ঘন্ট সংকলন করেন, সবচেয়ে আগে অঙ্ক ও এলজেবরা সম্বন্ধে বই লেখেন। তার লিখিত এলজেবরা ল্যাটিনে অনূদিত হয় ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে যোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত গণিত সম্বন্ধীয় প্রধান বই হিসেবে পাঠ্য থাকে এবং ইউরোপে এইরূপে এলজেবরা বিজ্ঞানের প্রবর্তন হয়। তারই গ্রন্থাবলী মারফত পাশ্চাত্যে আরবী সংখ্যাতত্ত্ব প্রবেশ লাভ করে এবং তাঁর নাম অনুসারে সে সংখ্যাতত্ত্বের নাম হয়, এলগোরিজম’। এই সময় শূন্য বা সাইফারও আরবী সিফার’ প্রবর্তিত হয়।
