মাতৃভাষা হিসেবে আরবী ভাষার জয়লাভের আগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে তার জয়লাভ ঘটে। আগের অধ্যায়গুলিতে আমরা দেখেছি, কিরূপে গ্রীক-সংস্কৃতি এবং পারস্য ও পাক-ভারত হতে নব নব চিন্তার ধারা এসে ৮০০ সালের দিকে বাগদাদে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম ও বিকাশের সূচনা করে। এখন আরবী ভাষা আরব সভ্যতার বাহন হিসেবে জয়লাভ করেছে। এই বিজয় ইসলামের জ্ঞানাত্মক সোনার-যুগের আগমন-বার্তা ঘোষণা করছে।
১২. সাহিত্য ও বিজ্ঞান
আমরা এখন সেই যুগে উপস্থিত হয়েছি যখন আরবী ভাষা কেবল দর্শন, ইতিহাস, নীতিশাস্ত্র ও সাহিত্যে নয়–চিকিৎসা, গৃহ-বিজ্ঞান, আলকিমিয়া (রসায়ন শাস্ত্রের আরম্ভ ও অগ্রগামী), ভূগোল ও গণিত প্রভৃতি বিজ্ঞান বিষয়েও নতুন মৌলিক গ্রন্থ লেখার উপযুক্ত বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরজমার যুগ ৭৫০ হতে ৮৫০ পর্যন্ত মোটামুটি একশ’ বছর চলে। এরপর নবম শতাব্দীর শেষার্ধে এই নয়া জামানার পত্তন হয়। এ যুগে অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন একদল মনস্বীর আবির্ভাব হয়। আজকের পাশ্চাত্যের জনসাধারণ তাদের খবর কমই রাখে। কিন্তু সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্বাৰেষীরা তাদের অনেককেই জানে এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমাদের পরিচিত সভ্যতা ইসলামের যে সন্তানদের অজস্র অবদানে সমৃদ্ধ, আমরা তাদের মাত্র কয়েকজনের কথা এখানে উল্লেখ করতে পারব।
এই সময়ের মধ্যে আরবরা পারস্য ও গ্রীসের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কেবল যে আত্মস্থ করে এমন নয়, সে নবলব্ধ জ্ঞানকে তারা নিজ প্রয়োজন ও চিন্তাধারা মোতাবেক খাপ খাইয়ে নেয়। তাদের তরজমা কয়েক শতাব্দী যাবত আরব মনের পরশ পেয়ে স্বভাবতঃই আংশিক রূপায়িত হয় এবং আরবরা সেই জ্ঞান রূপান্তরিত অবস্থায় বহু নতুন অবদানসহ সিরিয়া, স্পেন ও সিসিলী মারফত ইউরোপে পৌঁছিয়ে দেয়। জ্ঞানের যে সব সূত্র মধ্যযুগীয় ইউরোপের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারই মারফত তার ভিত্তি স্থাপিত হয়। সংস্কৃতির ইতিহাসে এই পৌঁছিয়ে দেওয়ার কাজ সৃষ্টি-কাজের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ যদি আরাস্তু, গ্যালেন ও টলেমীর গবেষণা হারিয়ে যেত, তবে জগত এত দরিদ্র হয়ে পড়ত যেন ওসব গবেষণা আদৌ কখনো হয় নাই। তরজমার কাজ আর মৌলিক কাজের সীমারেখা সবসময় স্পষ্ট করে আঁকা সম্ভব নয়। অনুবাদকদের অনেকেই মৌলিক দানও করে থাকেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতি আরবদের অনুরাগ মহানবীর একটি বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন : ‘বিজ্ঞানের দুই শাখা–ধর্মশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্র।’ চিকিৎসক একই সময়ে দার্শনিক ও জ্ঞানবীর ছিলেন। এই সময় আরবরা ঔষধের আরোগ্য বিষয়ক গবেষণায় অদ্ভুত সাফল্য লাভ করে। তারাই সর্বপ্রথম ঔষধ বিক্রেতার দোকান স্থাপন করে; তারাই সকলের আগে ঔষধ সংমিশ্রণের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম ফার্মাকোপিয়ার স্রষ্টা তারাই। খলীফা আল-মামুনের আমলেই আমরা দেখতে পাই যে, ফার্মেসী ওয়ালাদের (ঔষধ মিশ্রণকারীদের) একটা পরীক্ষা পাশ করতে হত। ঔষধ বিক্রেতাদের মত চিকিৎসকগণকেও একটা পরীক্ষা দিতে হত। একটা অনাচারের ব্যাপার ধরা পড়ায় খলীফা ৯৩১ সালে একজন সুবিখ্যাত চিকিৎসককে হুকুম দেন যে, উক্ত চিকিৎসক বাকী সমস্ত চিকিৎসককে পরীক্ষা করবেন এবং কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই সনদ দিবেন। বাগদাদে ৮৬০ জনের উপর চিকিৎসক এ পরীক্ষায় পাশ করে। রাজধানী হাতুড়ে ডাক্তারদের হাত হতে বেঁচে যায়। জনৈক উজীর এক রকম পল্লীস্বাস্থ্য সেবা-সংঘের পত্তন করেন। তিনি একদল চিকিৎসককে আদেশ দেন যে, তারা ঔষধ-পত্রসহ গ্রাম হতে গ্রামান্তরে গিয়ে বিমারীদের আরোগ্যের ব্যবস্থা করবে। অন্য চিকিৎসকেরা রোজ জেলখানা পরিদর্শন করত। এসব ব্যবস্থা হতে দেখা যায় যে, জনসাধারণের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হত। তৎকালীন জগতে এমন ব্যবস্থা আর কোথাও ছিল না। নবম শতাব্দীর প্রারম্ভে হারুনর-রশিদ পারস্যের আদর্শে মুসলিম জগতের প্রথম হাসপাতাল স্থাপন করেন। এরপর কিছুকালের মধ্যেই মুসলিম জাহানের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি হাসপাতাল গড়ে ওঠে। কায়রো তার প্রথম হাসপাতাল স্থাপন করে ৮৭২ সালে। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ হাসপাতালটি টিকে ছিল। একাদশ শতাব্দীতে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসালয় দেখা দেয়। মুসলিম হাসপাতালে নারীদের জন্য আলাদা বিভাগ ও ডিস্পেনসারী থাকত। কোন কোন হাসপাতালে থাকত–ডাক্তারী বইয়ের লাইব্রেরী এবং চিকিৎসা শিক্ষাদানের সুযোগ।
মনস্বী অনুবাদকদের যুগের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে সব চিকিৎসাবিদ গ্রন্থকারের আবির্ভাব হয়, তাঁরা জাতিতে ছিলেন পারসিক, ভাষায় ছিলেন আরব। এঁদের মধ্যে আবু আলী ইবনে-সীনা (সংক্ষেপে ইবনে সিনা) এবং আল রাজীর চিত্র প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল-অব মেডিসিন-এর বিরাট সভাগৃহ অলঙ্কৃত করছে।
আল-রাজী (৮৬৫-৯২৫) কেবল মুসলিম জগতের মধ্যে নয়, সমস্ত মধ্যযুগের মধ্যে তীক্ষ্ণতম মৌলিক চিন্তাবিদ ও শ্রেষ্ঠতম চিকিৎসাবিদদের অন্যতম ছিলেন। তিনি বাগদাদের বিশাল হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। কথিত আছে, এই হাসপাতালের জন্য স্থাননির্বাচনকালে তিনি বিভিন্নস্থানে গোশতের টুকরা টানিয়ে রাখেন; যে স্থানের টুকরায় পচন ক্রিয়া সবচেয়ে কম দেখা যায়, সেই স্থানকে তিনি হাসপাতালের জন্য নির্বাচন করেন। সার্জারীতে তাকেই সিটনের আবিষ্কর্তা বলে মনে করা হয়। তার লিখিত আলকিমিয়া সংক্রান্ত বইয়ের মধ্যে গোপনতত্ত্ব’ নামক বইটি বহুজন দ্বারা সম্পাদিত হওয়ার পর দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ক্রেমোনার অধিবাসী বিখ্যাত অনুবাদক জিরার্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত এই-ই ছিল রসায়ন জ্ঞানের প্রধান আকর। রোজার বেকন একে ‘ডি. পিরিটিবাস-এট-করপোরিবাস’ নামে তার বইয়ে উদ্ধৃত করেন। আল-রাজীর এক-বিষয়ক বইয়ের মধ্যে বসন্ত ও হাম সম্পর্কিত বইটি সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত এবং উক্ত বিষয়ে এ-ই সর্বপ্রথম বই। নিতান্ত সঙ্গতভাবেই এ বইটিকে আরবী চিকিৎসা সাহিত্যের অন্যতম অলঙ্কার মনে করা হয়। তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ছিল ‘আল-হাভী। এ একটি ব্যাপক আলোচনার বই। আনজুর প্রথম চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় এ-গ্রন্থ ১২৭৯ সালে সিসিলীর ইহূদী চিকিৎসক ফারাজ-বেন-সলিম কর্তৃক সর্বপ্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। ১৪৮৬ সাল হতে পরবর্তীকালের মধ্যে ‘কনটিনেনস’ নামে এই বইয়ের বহু সংস্কারণ হয়; এর পঞ্চম সংস্কারণ ১৫৪২ সালে ভেনিসে প্রকাশিত হয়। নামেই বোঝা যায়, লেখক এ বইটিকে চিকিৎসা-জ্ঞানের বিশ্বকোষ করতে চেয়ে ছিলেন। ঐ সময় গ্রীক, পারসিক ও হিন্দু চিকিৎসা-বিজ্ঞান সম্বন্ধে আরবরা যা কিছু জানত, আল রাজী এ গ্রন্থে তার সংক্ষিপ্ত সার দেওয়ার পর তার সঙ্গে নিজ মৌলিক গবেষণার ফল যোগ করেছেন। যে যুগে পুস্তক-মুদ্রণ তার শৈশব অতিক্রম করে নাই, সেই যুগে আল-রাজীর এসব বই মুদ্রিত হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত ল্যাটিন-পাশ্চাত্যের মনের উপর বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে। আরব চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে আল-রাজীর পরই ইবনে সীনার নাম ভুবন বিখ্যাত। তার বিশ্বকোষ-সম গ্রন্থ ‘ক্যানন’ নামে অনূদিত হয়ে সে যুগের চিকিৎসা শাস্ত্রের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে এবং ইউরোপের বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে পাঠ্যবই হিসাবে নির্বাচিত হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ বছরের মধ্যে ল্যাটিনে এর পনেরটি এবং হিব্রতে একটি সংকরণ হয়। কিছুকাল আগে ইংরেজিতে এর আংশিক অনুবাদ হয়। এ গ্রন্থের মেটেরিয়া-মেডিকো বিভাগে ৭৬০টি ঔষধের গুণ বিচার করা হয়। দ্বাদশ হতে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই গ্রন্থ প্রধান পথপ্রদর্শক হিসাবে ব্যবহূত হয়েছে। মুসলিম-প্রাচ্যে এখনো মাঝে মাঝে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। ডাক্তার উইলিয়াম ওসলার-এর ভাষায় : এ গ্রন্থটি অন্য যে কোন গ্রন্থের চেয়ে দীর্ঘতর কাল পর্যন্ত মেডিক্যাল বাইবেল হিসাবে টিকে ছিল।
