আম, টমেটো, গোলআলু এবং তজ্জাতীয় লতা অল্পকাল আগে আমেরিকা ও সুদূর ইউরোপীয় উপনিবেশ হতে পশ্চিম এশিয়ায় আমদানী হয়েছে। এগুলি ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় আজকাল যে সব ফল ও সজীর আবাদ হয়, তার প্রায় সবই সেকালে বর্তমান ছিল। কমলালেবুর আদি জন্মস্থান ছিল উত্তর পাক-ভারত ও মালয়; এখান হতে এ ফল পশ্চিম এশিয়া, ভূমধ্যসাগরের উপকূলস্থ দেশ এবং অবশেষে আরবদের মারফত স্পেন দেশ হতে বাকী ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যে আখের আবাদ ও সংশ্লিষ্ট পরিশোধনাগার দেখে প্রায় এই সময় উহা সিরিয়ার উপকূল ভূমিতে প্রবর্তিত হয়। পরবর্তীকালে ক্রুসেডীয় যোদ্ধারা এখান হতে আখ ও চিনি ইউরোপে নিয়ে যায়। চিনির আদি জন্মস্থান হয়তো ছিল, বাংলাদেশ। সেই মিষ্টি দ্রব্যটি এমনিভাবে ধীরে ধীরে পশ্চিম পানে যাত্রা করে। আজ সভ্য মানুষের খাদ্যের অন্যতম উপকরণ হিসেবে চিনি কি অপরিহার্যই না হয়ে পড়েছে।
সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ লোকেরই পেশা ছিল কৃষিকাজ; কৃষকরাই রাজস্বের ছিল প্রধান উৎস। এরা দেশের আদিম বাসিন্দা ছিল। এদের সাথে বিজয়ীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার চুক্তি ছিল এবং সে সূত্রে এরা ছিল জিম্মী। আরবরা চাষের কাজকে তার মর্যাদাহানীকর মনে করত। জিম্মীরা প্রথমে ছিল কেবল কেতাবী জাতি খৃস্টান, ইহুদী ও সেবীয়ান। ক্রমে আরো কয়েকটি সম্প্রদায় এদের অন্তর্ভুক্ত হয়। পল্লীতে এবং তাদের গোলাবাড়ীতে জিম্মীরা তাদের প্রাচীনসংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে থাকত এবং তাদের নিজ ভাষা রক্ষা করে চলত। মোটের উপর চুক্তি ভালভাবেই রক্ষিত হত; যদিও কোন সময় ধর্মীয় নির্যাতনও ঘটত।
শহরে খৃস্টান ও ইহুদীরা গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সংক্রান্ত পদে, কেরানী পদেও পেশা সংক্রান্ত পদে অধিষ্ঠিত ছিল। এতে অবশ্য মুসলিম বাসিন্দাদের মনে হিংসার উদয় হত এবং এ সম্বন্ধে কোন কোন সময় নতুন আইনও হত কিন্তু এ সব বিভেদমূলক আইন প্রায়শঃ কাগজেই থাকত; কর্যত এদের প্রয়োগ হত না।
উমাইয়া খলীফা দ্বিতীয় ওমর খৃস্টান ও ইহুদীগণকে আলাদা পোশাক পরার, হুকুম দেন এবং সরকারী পদ তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ করেন। হারুনর রশীদই বোধহয় প্রথম কতকগুলি পুরানো আইন পুনঃপ্রবর্তন করেন। খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল ৮৫০ ও ৮৫৪ সালে আইন করেন যে, খৃস্টান ও ইহুদীগণকে তাদের বাড়ীর সঙ্গে শয়তানের কাষ্টমূর্তি লাগিয়ে রাখতে হবে, তাদের কবর উচ্চতায় মাটির সমান স্তরে রাখতে হবে, তাদের বহির্জামার রং হলদে হতে হবে, তাদের গোলামের জামায় দুটি হলদে রঙ্গের তালি দিতে হবে–একটি পেছনে অন্যটি সামনে; তারা কেবল গাধা ও খচ্চরে কাঠের গদিতে চড়বে। এই বিভেদমূলক পোশাকের জন্য জিম্মীদের এক নাম হয় চক্করওয়ালা’ । জিম্মীদের আর একটা বিশেষ অসুবিধা ছিল এই যে, তকালীন মুসলিম আইনজ্ঞরা এক রায় দেন যে, কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে খৃস্টান বা ইহুদীদের সাক্ষ্য গৃহীত হবে না; কারণ, কোরআনের মতে খৃস্টান আর ইহুদীরা তাদের ধর্ম পুস্তককে বিকৃত করেছে। কাজেই তাদের আর বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু এসব বাধা সত্ত্বেও খলীফাদের অধীনে খৃস্টানরা যথেষ্ট পরিমাণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেছে। নবম শতাব্দীর শেষার্ধে আমরা খৃস্টান উজীরের কথাও শুনতে পাই। এ সব খৃস্টান উচ্চ আমলারা তাদের যথাযযাগ্য সম্মান লাভ করত। খলীফাদের অধীনে খৃস্টান ধর্মের প্রাণশক্তি যথেষ্ট প্রবল ছিল এবং এরই ফলে সুদূর পাক-ভারত ও চীন পর্যন্ত তারা মিশনারী পাঠিয়েছে।
কোরআনে ইহুদীদের সম্বন্ধে কয়েক স্থানে কঠোর মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও তাদের দিন খৃস্টানদের চেয়েও ভালভাবে গিয়েছে। আমরা কাগজপত্রে দেখি, কয়েকজন খলীফার অধীনে ইহুদীরা দায়িত্বপূর্ণ সরকারই পদ দখল করেছে। খাস বাগদাদের বুকে ইহুদীদের একটি সমৃদ্ধশালী উপনিবেশ ছিল এবং রাজধানীর পতনের আগ পর্যন্ত সে উপনিবেশ ভালভাবেই চলে। বেনজামিন নামক টুডেলার একজন ইহুদী ধর্মযাজক ১৯৭০ সালে এই ইহুদী উপনিবেশ পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে দশটি ধর্মশিক্ষালয় এবং তেইশটি ধর্মমন্দির দেখতে পান। প্রধান ধর্মমন্দিরটি বিচিত্র মার্বেল পাথর ও সোনা-রূপায় বিশেষরূপে সজ্জিত ছিল। বেনজামিন পরম গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করেন যে, প্রধান ধর্মযাজক স্বয়ং দাউদ পয়গম্বরের বংশধর বলে সকলে তাঁকে অগাধ শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং ইহুদীরা সকলেই বাগদাদের খলীফার পরম অনুগত। প্রধান ধর্মযাজক একদা খলীফার সঙ্গে দেখা করতে রাস্তায় বের হন। তাঁর গায় ছিল ফুলদার রেশমী পোশাক, তার মাথায় ছিল মণি মানিক্যখচিত সাদা পাগড়ী এবং তার সঙ্গে ছিল একদল অশ্বারোহী দেহরক্ষী। তার আগে আগে এব নকীব হেঁকে চলছিল ও রাস্তা কর–আমাদের প্রভু দাউদ পুত্রের জন্য পথ কর।’
খলীফার রাজ্যের মানুষের এবং তাদের পরস্পর সম্বন্ধের দৃশ্য এই । আমরা এখন আরব বিজয়ের তৃতীয় মঞ্চে। প্রথম মঞ্চ ছিল সামরিক ও রাজনৈতিক আরব সমর-বাহিনীর অভিযান। দ্বিতীয় মঞ্চ ছিল ধর্মীয় প্রথম শতাব্দীতে ছিল এর আরম্ভ। এই যুগ সাম্রাজ্যের বেশীরভাগ লোকই ইসলাম গ্রহণ করে। তৃতীয় মঞ্চ ছিল–ভাষাগত ও বিজিত জাতিদের নিজস্ব ভাষার উপর আরবী ভাষার জয়লাভ। এইখানে বিজয়-রথ চলে সবচেয়ে ধীরগতিতে এবং বিজিত জাতিরা এই মঞ্চেই সবচেয়ে কঠিন বাধা দেয়। মনে হয়, মানুষ বরং তাদের রাজনৈতিক এমন কি ধর্মীয় আনুগত্য বিসর্জন করতে রাজী, তথাপি ভাষার আনুগত্য ত্যাগ করতে রাজী নয়।
