সে জামানার রথচাইলড় ও রকফেলাররা কি অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছিল, তার খানিকটা আঁচ পাওয়া যাবে বাগদাদের জওহরী ইবনুল জাস্সাসের ঘটনা হতে। ইবনুল জাস্সাসের সম্পত্তি হতে খলীফা ১ কোটি ৬০ লক্ষ দিনার বাজেয়াপ্ত করেন। তার পরও তিনি জওয়াহেরাতের সওদাগরমণ্ডলীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে থাকেন। বসরার কয়েকজন সওদাগর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সওদাগরী জাহাজ পাঠাতেন। এদের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় ছিল দশ লক্ষ দেরেমের বেশি। বসরা ও বাগদাদের একজন নিরক্ষর যাতা-কলওয়ালা দৈনিক ১ শত দিনার গরীবকে ভিক্ষা দিতে পারত। সীরা নগরে একজন সওদাগরের বাড়ী করতে গড়ে খরচ হত দশ হাজার দিনারের উপরে। কেউ কেউ ত্রিশ হাজার দিনারও খরচ করত এরং অনেক জাহাজী সওদাগরের প্রত্যেকে ৪০ লক্ষ দিনারের মালিক ছিল। এক দিনারের দাম ছিল প্রায় ২.৪০ ডলার।
সাম্রাজ্যের ভিতরে শিল্প ও কৃষির উপর নির্ভর না করে কোন বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপই এত ব্যাপকতা লাভ করতে পারত না। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে হস্তশিল্প প্রচুর উন্নতি লাভ করে। পশ্চিম এশিয়ায় এ শিল্প মারফত প্রধানতঃ উৎপন্ন হত কম্বল, কারুকার্যখচিত বস্ত্র, রেশম, সূতী ও পশমী কাপড়, সাটিন, কিংখাব, সোফা (সুফফা হতে), গদীর ঢাকনী, ঘরের আসবাব ও বাবুর্চীখানার বাসনপত্র। পারস্য ও ইরাকে বহু তাঁত ছিল এবং সে তাঁতে বোনা গালিচা ও কাপড় অত্যন্ত উঁচুমান রক্ষা করে চলত। তাদের স্বতন্ত্র মার্কা ছিল। এক খলীফার মা ফরমাস দিয়ে ১৩ কোটি দেরেম খরচে একটি কম্বল তৈয়ার করান। এ কম্বলের গায় সব রকম পাখীর সোনায় তৈরী ছবি ছিল এবং রুবী ও অন্যান্য বহুমূল্য পাথর দিয়ে সে পাখীর চোখ বানানো হয়। আত্তাব নামক একজন উমাইয়া শাহজাদা বাগদাদের এক মহল্লায় বাস করতেন। তাঁর নাম অনুসারে উক্ত মহল্লার নাম হয় আত্তাব। দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রথম এইখানে এক রকম ডোরাদার কাপড় তৈরি হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় আত্তাবী। স্পেনের আরবরা এ কাপড়ের অনুকরণে কাপড় তৈরি করে এবং তাবী নামে সে কাপড় ফ্রান্স, ইতালী এবং ইউরোপের অন্য বহু স্থানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শব্দটা আজো ‘টেব্বী’ শব্দের মধ্যে বেঁচে আছে; টেব্বী মানে ডোরাদার বিড়াল। কুফায় রেশম ও রেশমে তৈরী মাথার রুমাল উৎপন্ন হত। এখনো ‘কুফীয়া’ নাম এ রুমাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
দামেস্ক শহরে এক রকম ফুলদার কাপড় তৈরী হত; এই কাপড় দামাস্ক নামে পরিচিত হয়। সুসিয়ানার কয়েকটি কারখানা এই দামাস্ক কাপড়ে সোনার না ভোলার জন্য বিখ্যাত ছিল। এখানকার তৈরী পরদা, উট ও ছাগ পশমের কাপড় এবং রেশমী জামা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। শিরাজ নগরে তৈরী হত ডোরাদার পশমী জামা, সূক্ষ্ম রেশমী বস্ত্র ও কিংখাব। মধ্যযুগের ইউরোপীয় মহিলারা তাদের দোকান হতে ‘টাফেটা’ নামে পারস্যের রেশমী কাপড় ‘তাফ্তা’ খরিদ করতেন।
সিডন, টায়ার এবং লেবানন ও সিরিয়ার অন্যান্য শহরে তৈরী কাঁচ নিতান্ত স্বচ্ছ ও পাতলা বলে বিখ্যাত ছিল।
পৃথিবীতে মিসরই সর্বপ্রথম কাঁচ শিল্পের প্রবর্তন করে। তারপরই প্রাচীন ফিনিশীয়ানরা এ শিল্পে হাত দেয়। সিডন, টায়ার প্রভৃতি স্থানের কাঁচ শিল্পের মূল ছিল এই ফিনিশীয়ান শিল্প। ক্রুসেডের ফলে সিরীয় কাঁচের অনুকরণে ইউরোপের গীর্জায় গীর্জায় রঙ্গীন কাঁচ ব্যবহারের চল হয়। ব্যবহারের সুবিধা ও বিলাদ্রব্য হিসেবে বাজারে সিরিয়ার কারুকার্য খচিত কাঁচ ও ধাতুর বাসনপত্রের যথেষ্ট চাহিদা ছিল।
লেখার জন্য কাগজ উৎপাদন এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চীন হতে সমরকন্দে কাগজ আমদানী হয়। সমরকন্দের কাগজকে অতুলনীয় বিবেচনা করা হত। আমরা আগে দেখেছি যে, মুসলমানরা ৭০৪ সালে সমরকন্দ জয় করে। অষ্টম শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই বাগদাদে কাগজের প্রথম কল স্থাপিত হয়। ক্রমে ক্রমে আরো অনেক কল জন্মলাভ করে। ৯০০ সাল বা তার আগেই মিসরে, ১১০০ সালের কাছাকাছি কালে মরক্কোতে, ১৯৫০ সালের দিকে স্পেনে কাগজের কল দেখা দেয় এবং সাদা ও রঙ্গীন নানা রকম কাগজ উৎপন্ন হতে থাকে। মুসলিম-স্পেন ও ইতালী হতে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাগজ-শিল্প খৃষ্টান ইউরোপে চলে যায় এবং সেখানে ১৪৫০-৫৫ সালে ছাপার কল আবিষ্কার হওয়ার ফলে ইউরোপ আমেরিকায় আজ আমরা এই বহু বিস্তৃত শিক্ষা দেখতে পাই।
আব্বাসীয় বংশের আগের দিকের খলীফারা কৃষির উন্নতির জন্য বিশেষ যত্নবান হন। প্রথম কারণ, তাঁদের রাজধানীই অবস্থিত ছিল অত্যন্ত উর্বর পলিমাটি অঞ্চলে; দ্বিতীয় কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজ্যের আয়ের বড় উৎসই হল কৃষিকাজ; তৃতীয় কারণ, চাষের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ রকমে দেশের আদিম বাসিন্দাদের হাতে ছিল এবং নতুন শাসকদের আমলে তাদের অবস্থার খানিক উন্নতি হয়েছিল। পরিত্যক্ত জোত-জমি ও বিধ্বস্ত গ্রাম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল; ক্রমে ক্রমে সেগুলির আবাদ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার তাইগ্রীস-ইউফ্রেতীম উপত্যকার নিম্ন অঞ্চল ও কথিত ইডেন উদ্যান অঞ্চলে বিশেষ মনোযোগ দেয়। এক মিসর ছাড়া সমস্ত সাম্রাজ্যের মধ্যে উক্ত উপত্যকার মত উর্বর স্থান আর কোথাও ছিল না। ইউফ্ৰেতীস নদী হতে নির্গত খাল দিয়ে এ-অঞ্চলের যেন একটা সত্যিকার জাল বোনা হয়েছিল। আরব ভৌগোলিকেরা মাঝে মাঝেই খলীফাদের নদী কাটা বা নদীর মুখ খুলে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আসল কথা এই যে, ব্যাবিলনীয় যুগ হতে যে সব খাল ছিল, তারা প্রধানতঃ সেগুলিই পুনরায় কাটেন বা সেগুলির মুখ খুলে দেন। ইরাক এবং মিসর উভয় দেশেই খালসম্পর্কিত কাজ ছিল, প্রধানতঃ প্রাচীন পানি সেচ ব্যবস্থাকে কায়েম রাখা। এমন কি মহাযুদ্ধের আগে যখন তুর্ক সরকার স্যার উইলিয়াম উইলককে ইরাকের সেচ সমস্যার অনুসন্ধান করতে নিযুক্ত করেন, তখন তাঁর রিপোর্টে তিনি এই কথার উপরই জোর দেন যে, নতুন খাল কাটার চেয়ে পুরাতন খালগুলিকে চালু করাই এখানকার প্রধান কাজ। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, আব্বাসীয় জামানা হতে আজ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই বিরাট পলিময় প্রান্তরের চেহারা অনেকখানি বদলে গেছে এবং তাইগ্রীস, ইউফ্ৰেতীস উভয় নদীই তাদের আসল প্রবাহ পথ হতে বহু দূরে সরে গেছে।
