চাকরেরা প্রায় সবাই ছিল অমুসলমানদের মধ্য হতে সংগৃহীত গোলাম। এদের কেউ ছিল জোর করে ধরে আনা লোক, কেউ যুদ্ধবন্দী, কেউ বাজারে খরীদ। এদের কতক ছিল নিগ্রো, বাকীদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল তুর্ক, কিছুসংখ্যাক ছিল শ্বেতাঙ্গ। শ্বেতাঙ্গ গোলামরা জাতে প্রায়ই ছিল গ্রীক, স্ন্যাভ, আর্মেনীয়ান ও বার্বার। কতক ছিল খোঁজা–এরা নিযুক্ত হত হেরেমের কাজে; আবার কতক ছিল ‘গিলমান’-এরাও খোঁজা হতে পারত। তবে গিলমানরা মনীবের বিশেষ অনুগ্রহভাজন ছিল। তারা দামী সুন্দর পোশাক পরত; এবং অনেক সময় মেয়েদের মত আতর-গোলাব মাখত। আর-রশীদের জামানার বইপত্রে আমরা গিলমানদের কথা পাই। কবিরা তাদের এ অস্বাভাবিক আকর্ষণকে তাদের রচনায় বর্ণনা করতে এবং এই শহীন বালকদের কাছে প্রেমপত্র লিখতে লজ্জাবোধ করত না।
কুমারী দাসীদের গায়িকা, নর্তকী বা রক্ষিতা হিসেবে ব্যবহার করা হত। এদের কেউ কেউ তাদের খলীফা-মনীবের উপর বেশ প্রভাব বিস্তার করে বসত। এমন একজন ছিল, ‘তিল-ওয়ালা সুন্দরী।’ আর-রশীদ তাকে ৭০ হাজার দেরেমে খরিদ করেন এবং পরে এক ঈর্ষান্ধ মুহূর্তে তার এক চাকরকে দান করে দেন। আর-রশীদ আর একটি নর্তকী বালিকার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। সে নর্তকীর কবল হতে উদ্ধারের জন্য বেগম জোবায়েদা তাঁকে দশটি কুমারী উপহার দেন; এদের দুইজন পরে খলীফার মা হয়। আরব্য উপন্যাসে তাওয়াদুদ নাম্নী একটি সুন্দরী ও প্রতিভাশালিনী বাদীর কাহিনী আছে। হারুনর-রশীদ তাকে ১ লক্ষ দিনারে খরিদ করতে চেয়েছিলেন; কারণ খলীফার মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতদের সে চিকিৎসা, আইন, গ্রহ-বিজ্ঞান, দর্শন, সঙ্গীত, গণিত, অলঙ্কার, ব্যাকরণ, কবিতা, ইতিহাস ও কুরআন প্রভৃতি সর্বশাস্ত্রে প্রতিযোগিতায় পরাজিত করে। বাদীদের কারো কারো সাংস্কৃতিক স্তর কত উঁচু ছিল, এ কাহিনী হতে তা অনুমান করা চলে। আল আমিনের অন্যতম অবদান ছিল, একটি ছুরী বাহিনী গঠন। এ বাহিনীর ছুকরীরা বাবরীর মত করে চুল রাখত, বালকদের মত পোশাক পরত এবং রেশমী পাগড়ী মাথায় দিত। উঁচু নীচু উভয় সমাজে অল্পকাল মধ্যে এ প্রথা চালু হয়ে যায়। একজন চাক্ষুষ সাক্ষী বললেন যে, তিনি একদিন আল-মামুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন যে, আল-মামুনের সামনে বিশজন গ্রীক কুমারী সুসজ্জিত অবস্থায় এবং হাতে জলপাইর শাখা ও খেজুরের পাতা নিয়ে নাচছে। ৩ হাজার দিনার নর্তকীদের মধ্যে বিতরণ করে উৎসব সমাপ্ত করা হল।
রিপোর্টে পাওয়া যায়, খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিলের ৪ হাজার উপপত্নী ছিল এবং আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয় যে, এদের সবাইর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হত। খলীফা বা উজীরকে গভর্নর ও সেনাপতিদের পক্ষ হতে নজর পাঠানের রীতি ছিল; এবং সে নজরের মধ্যে প্রজাদের মধ্য হতে সংগৃহীত বালিকা থাকত। এ রীতির ব্যতিক্রম হলে, তা রাজদ্রোহ বলে গণ্য হত। (এই সব কথার মধ্যে অতিরঞ্জন থাকা স্বাভাবিক।)
জনসাধারণ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল? উচ্চ শ্রেণী ও নিম্ন শ্রেণী। উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা অভিজাতদের কাছাকাছি স্থান দখল করত। এদের মধ্যে দেখতে পাই সাত্যিক, বিদ্বান সমাজ, শিল্পী, সওদাগর, কারিকর এবং পেশাদার শ্ৰেণী। জাতির অধিকাংশই ছিল নিম্ন শ্রেণীর লোক আর এদের মধ্যে ছিল কৃষক, পশুপালক এবং গেয়ে মানুষ। এই শেষোক্তরা ছিল দেশের আদত লোক (নেটীভ) এবং এরা এ সময় জিম্মীর অধিকার ভোগ করত।
সাম্রাজ্যের বিপুল বিস্তার এবং সভ্যতার উন্নত স্তর–এ উভয় কারণে ব্যাপক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। প্রাথমিক যুগে খৃস্টান, ইহুদী এবং জরোস্তরাই (জরোয়েষ্ট্রীয়ান) সওদাগরী কাজ করত। কিন্তু পরবর্তী যুগে আরব ও অন্যান্য মুসলমানরা অনেকাংশে তাদের স্থান দখল করে; কারণ এরা কৃষিকাজকে ঘৃণা করলেও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘৃণা করত না। বাগদাদ, বসরা, সিরাজ, কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়ার মত বন্দর স্থল ও জল-বাণিজ্যের কর্মব্যস্ত কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পূর্ব দিকে মুসলিম সওদাগররা চীন পর্যন্ত গিয়ে হাজির হত। চীনের সঙ্গে রেশমের ব্যবসা চলত। পাশ্চাত্য জগতের প্রতি চীনের বহু অমূল্য অবদানের মধ্যে এটিই ছিল সর্বপ্রথম। এ রেশমের কারবার চলত সমরকন্দ ও চীনা তুর্কীস্তানের ভিতর দিয়ে। এই পথকে বলা হত, ‘রেশমের রাজপথ। অথচ আজকের সভ্য মানুষ পৃথিবীর মধ্যে এ অঞ্চলেই সবচেয়ে কম পরিভ্রমণ করে থাকে। সওদাগরী মাল একের পর আর–এমনি বহু দলে বহন করত। সাধারণতঃ একই কাফেলাকে সমস্ত পথ চলতে হত না। সামুদ্রিক বাণিজ্য ইসলামকে দূর দূরান্তরের দ্বীপসমূহে নিয়ে যায় । এদেরই কতকগুলি দ্বীপ ১৯৪৯ সালে ইন্দোনেশীয়া রিপাবলিক গঠন করে।
পশ্চিম দিকে মুসলিম সওদাগররা মরক্কো ও স্পেনে দিয়ে পৌঁছে। লেসূসেপের এক হাজার বছর আগে একজন আরব খলীফা (হারুনর-রশীদ) সুয়েজ যোজাকের ভিতর দিয়ে একটি খাল কাটার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের আরবদের বাণিজ্য বিশেষ প্রসার লাভ করে নাই। কৃষ্ণ সাগর ও বাণিজ্যের জন্য খুব নিরাপদ ছিল না; যদিও দশম শতাব্দীতে উত্তরে ভগা অঞ্চলের লোকের সঙ্গে স্থল পথে দস্তুরমত ব্যাপক ব্যবসা চলত। কিন্তু কাষ্পীয়ান সমুদ্র ছিল পারস্য দেশীয় বহু বাণিজ্য কেন্দ্রের সন্নিকট এবং বোখারা, সমরকন্দের মত সমৃদ্ধিশালী শহরগুলিও দূরে ছিল না। কাজেই এই সমুদ্রই ছিল এ যুগের মুসলিম-বাণিজ্যের বিরাট আদান-প্রদান ক্ষেত্র। মুসলিম সওদাগররা সঙ্গে নিয়ে যেত খেজুর, চিনি, কার্পাস ও পশম-বস্ত্র, ইস্পাতের যন্ত্রপাতি এবং কাঁচের জিনিস। আর তারা সুদূর এশিয়া হতে অন্যান্য জিনিসের মধ্যে আমদানী করত : মসলা কর্পূর এবং রেশম, আর আফ্রিকা হতে হাতীর দাঁত, আবলুশ এবং নিগ্রো গোলাম-বাদী।
