প্রাইভেট ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থাতেই অনেক সময় মদ খাওয়া হত। আগানী ও আরব্য উপন্যাসের মত কেতাবে আমরা প্রমোদ-উৎসবের যে অসংখ্য কাহিনী দেখতে পাই এবং মদের প্রশংসায় যে অগণ্য কবিতা ও গান আছে, তাতে মনে হয় মদ খাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কার্যতঃ সে নিষেধ বড় কেউ মেনে চলত না। এমন কি খলীফা, উজীর, শাহজাদা এবং বিচারক কাজীরাও ধর্মীয় আদেশের দিকে ক্ৰক্ষেপ করত না। খেজুর হতে তৈরি ‘খমর’ প্রিয় পানীয় ছিল।
প্রমোদ উৎসবে কখনো কখনো মদের মহিমা-কীর্তনমূলক গান হত। এই সব মদের মজলিসে মেহমান ও মেজবান মেশক অথবা গোলাব পানিতে তাদের দাড়ি সুগন্ধ করত এবং উজ্জ্বল রঙ্গের খাস পোশাক পরত। সুগন্ধ কাঠ পুড়িয়ে কামরা সৌরভময় করা হত। অনেক কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয় যে, এসব মজলিসের গায়িকারা প্রধানতঃ ছিল হয় বাদী, না হয় ভ্রষ্ট-চরিত্র নারী। যুগের তরুণদের নৈতিক চরিত্রের পক্ষে এরা ছিল মারাত্মক ভয়ের কারণ। জনসাধারণ খৃষ্টানদের মঠ অথবা ইহুদীদের পরিচালিত মদখানায় গিয়ে মদ খেতে পারত।
মহানবী বলেছেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ধর্মের অঙ্গ। এ কথা মুসলিম জগতের সবাই জানে। হযরত মুহম্মদের (সঃ) আগে আরবে কোন গোসলখানা ছিল বলে আমরা শুনি না। তিনি নিজেও নাকি গোসলখানার প্রসন্ন ছিলেন না এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্রত্যেকে কাপড় পরে কেবল গোসলের জন্য গোসলখানায় যেতে পারে। আমরা যে সময়ের কথা বলছি তখন সরকারী গোসলখানা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কেবল উৎসব উপলক্ষে বা স্বাস্থ্য লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য নয়, আমোদ প্রমোদ ও বিলাসের স্থান হিসেবেও। বিশেষ রিজার্ভ করা দিনে মেয়েরাও সরকারী গোসলখানায় যেতে পারত। দশম শতাব্দীর আরম্ভে বাগদাদ ২৭ হাজার সরকারী গোসলখানার গর্ব করত। অন্য সময় নাকি গোসলখানার সংখ্যা ৬০ হাজারে গিয়ে পৌঁছে। অবশ্য আরবদের বর্ণিত বেশির ভাগ সংখ্যাতেই যেমন অতিরঞ্জন থাকে, এ সংখ্যাতেও তেমনি অতিরঞ্জন আছে। ১৩২৭ সালে একজন মুর ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন এবং তিনি দেখতে পান যে, শহরের পশ্চিম অংশের তেরটি বাড়ীর প্রত্যেক বাড়ীতে দুই হতে তিনটি ব্যাপকভাবে সজ্জিত গোসলখানা আছে এবং প্রত্যেক গোসলখানায় গরম ও ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা আছে।
এখনকার মত কখনো গোসলখায় কয়েকটি কামরা থাকত। কামরাগুলির মেঝে মোজাইক করা এবং ভিতরের দিকের দেয়ালে মার্বেল বসানো থাকত। মাঝখানের একটি বড় কামরার চারপাশে এই কামরাগুলির স্থান ছিল। এই মাঝখানের কামরাটির উপরে একটি গম্বুজ; গম্বুজে উজ্জ্বল গোলাকার ছিদ্র থাকত, যাতে ঐ পথে আলো আসতে পারে। পানি গরম করে সেই পানির বাষ্পে এই ঘরকে গরম করা হত। উক্ত বাইরের কামরাগুলি বিশ্রাম, নাস্তা ও পান উপভোগের জন্য ব্যবহৃত হত।
ইতিহাসে বরাবরই দেখা গেছে যে, চারুশিল্পের মত খেলা-ধুলাও ইন্দো ইউরোপীয় সভ্যতারই প্রকৃতিগত লক্ষণ–সেমিটিক সভ্যতার নয়। খেলা-ধুলায় কেবল খেলা-ধুলার জন্যই অনেক হিনত করতে হয়। কবিত্ব-প্রবণ আরব সন্তানের চোখে এ এক অযৌক্তিক কার। বিশেষতঃ নিতান্ত সঙ্গত কারণেই সে দিনের গরম এড়িয়ে চলতে চায়।
বাইরের খেলাধুলার মধ্যে দেখতে পাই তীরন্দাজী, পলো, বল, হকী, তলোয়ারবাজী, বর্শা নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় এবং সর্বোপরি শিকার। কেউ ভবিষ্যতে খলীফার প্রমোদসঙ্গী হতে চাইলে অন্যান্য গুণের মধ্যে তাকে দক্ষতা অর্জন করতে হত তীরন্দাজী, শিকার, বল ও দাবা খেলায়। এসবের মধ্যে সঙ্গী তার রাজকীয় মনীবের সমকক্ষ হলেও তার বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। খলীফাদের মধ্যে বিশেষ করে পলোর ভক্ত ছিলেন আল–মুতাসিম। একদা তাঁর তুর্ক সেনাপতি তার বিপক্ষে খেলতে অস্বীকার করেন। বলেন : এখন কি খেলার ব্যাপারেও আমি আমীরুল-মুমিনের বিপক্ষতা করতে চাই না।’ এক রকম বল খেলার কৌতূহল-উদ্দীপক উল্লেখ পাওয়া যায়। এই খেলায় একখণ্ড কাঠ ব্যবহার করা হত। এ-কি টেনিসের শৈশব অবস্থার কথা? সাধারণতঃ মনে করা হয় যে, টেনিস শব্দটা ফরাসী ক্রিয়া ‘টেনেজ’ (মানে-খবরদার!) হতে উৎপন্ন; কিন্তু আসলে শব্দটা বোধহয় ‘টিন্নিস’ হতে এসেছে। মোহনায় অবস্থিত একটি মিসরীয় শহরের আরবী নাম ছিল টিন্নিস। মধ্যযুগে এই শহর পট্টবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই পট্টবক্সে টেনিস বল তৈরি হয়ে থাকবে।
সাধারণ শিকার, রাজপাখী দিয়ে শিকার এবং ফাঁদ ব্যবহার সম্বন্ধে প্রাথমিক যুগের আরবীতে যত বই আছে তার সংখ্যা দেখে মনে হয়, এসব ব্যাপারে সবাই খুব আনন্দ পেত। বাজপাখী দিয়ে শিকার করার প্রথা পারস্য হতে আরবে আসে; এ শিকার সম্বন্ধে আরবীতে যে সব শব্দ আছে, তাতেই এ প্রমাণিত হয়। খলীফাদের যুগের শেষভাগে এবং ক্রুসেডের যুগে বাজ দিয়ে শিকার অতিপ্রিয় হয়ে ওঠে। আরব্য উপন্যাসে যেমন বর্ণনা পাওয়া যায়, মোটামুটি সেই নিয়মেই আজো পারস্য, ইরাক ও সিরিয়ায় বাজ দিয়ে শিকার করা হয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা চলে যে, শিকার ধরার পরই মুসলমান তাকে জবেহ করে, নইলে তার গোশত্ হালাল হয় না।
সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদাতাদের মধ্যে সবার উপর স্থান ছিল খলীফা ও তার পরিবারস্থ লোকের; তারপর সরকারী আমলা, তারপর উপরোক্তদের ভক্ত অনুগৃহীতদের দলের। এই শেষোক্ত পর্যায়ে পড়ত সৈন্য, দেহরক্ষী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রমোেদ সঙ্গী এবং চাকর-বাকর।
