আব্বাসীয় আমলের এই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অনুবাদ-যুগের পর আসে মৌলিক অবদানের যুগ। আমরা এর পরের এক অধ্যায়ে সে সম্বন্ধে আলোচনা করব। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবী ছিল কবিতার ভাষা–হযরত মুহম্মদের (সঃ) পর প্রধানতঃ প্রত্যাদেশ ও ধর্মের ভাষা; দশম শতাব্দীতে একান্ত বিস্ময়কররূপে সেই ভাষা বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও দার্শনিক ভাব-প্রকাশের মোলায়েম মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে কূটনীতি ও সৌজন্যের ভাষা হিসেবে আরবী মধ্য এশিয়া হতে সমস্ত উত্তর আফ্রিকার মধ্য দিয়ে স্পেন পর্যন্ত নিজকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই সময় হতে আজ পর্যন্ত ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর, তিউনিসিয়া, আলজিরিয়া ও মরক্কোর বাসিন্দারা আরবী ভাষায় তাদের মহত্তম চিন্তা প্রকাশ করে আসছে।
১১. জাতির জীবন
খলীফাদের বিচিত্র কার্যাবলী, শাসক-বংশের উত্থান ও পতনের জটিল রক্তাক্ত কাহিনী, ভণ্ড দাবীদারদের কিস্সা এবং সেনাপতি, উজীর ও রাজনৈতিক নেতাদের উত্থান ও পতনের বর্ণনা–এসবেই আরব ঐতিহাসিকদের মনোযোগ ও দরদ নিঃশেষ হয়ে গেছে। সাম্রাজ্যের জনগণের সামাজিক ও আর্থিক জীবনের কোন পর্যাপ্ত বিবরণ দেওয়ার অবকাশ তাঁদের ঘটে ওঠে নাই। তবে তাঁদের রচিত গ্রন্থে এখানে সেখানে দু’চারটি ঘটনার উল্লেখ মিলে। সাহিত্যিক কেতাবে এবং আজকের পরিবর্তন-বিমুখ মুসলিম-প্রাচ্যের সাধারণ জীবনের ঘটনাবলী হতে সে যুগের জনগণের জীবনের একটা খসড়া ছবি আঁকা যেতে পারে।
প্রাথমিক যুগের মুসলিম মহিলারা যেমন প্রচুর স্বাধীনতা ভোগ করত, নবম শতাব্দীর মহিলারাও তা-ই ভোগ করত; কিন্তু দশম শতাব্দীর শেষভাগে নারীর অবরোধ এবং নর নারীর মধ্যে পরিপূর্ণ বিভেদ-ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। আব্বাসীয় জামানার প্রথমভাগে আমরা দেখতে পাই, সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা কেবল যে সাম্রাজ্য পরিচালন ব্যাপারে দক্ষতা অর্জন ও প্রভাব বিস্তার করছে, এমন নয়–আরব কুমারীরা লড়াইয়ে যাচ্ছে, সৈন্য পরিচালনা করছে, কবিতা লিখছে এবং পুরুষদের সঙ্গে সাহিত্য-সাধনায় প্রতিযোগিতায় নামছে; অথবা তাদের হাস্যালাপ, তাদের সঙ্গীত প্রতিভায় বা কণ্ঠস্বরে মজলিস মহফিলকে উজ্জীবিত করে তুলছে।
অবনতির যুগে উপপত্নী-সম্ভোগ অস্বাভাবিক রকমে বেড়ে ওঠে–যৌন পত্রিতার বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে, বিলাস-ব্যসন মাত্রা অতিক্রম করে। তখন নারীর আসন নিতান্ত নিম্নস্তরে নেমে যায়। আরব্য উপন্যাসে এই নারীর সঙ্গেই আমাদের সাক্ষাৎ হয়। এ পুস্তকে দেখান হয়েছে যে, নারী সমস্ত ধূর্ততা ও ষড়যন্ত্রের প্রতিমূর্তি, সমস্ত হীনভাব ও হীন চিন্তার আকর।
মুসলিম জগতের প্রায় সর্বত্রই বিবাহ এক বড় কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছে; অবিবাহিত থাকাকে বিশেষভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং সন্তানকে–বিশেষ করে পুরুষ সন্তানকে আল্লাহর দান বলে মনে করা হয়েছে। স্ত্রীর প্রথম কর্তব্য ছিল স্বামীর সেবা, সন্তান পালন এবং এরপর যদি সময় থাকে তবে সে চরকা কাটবে এবং কাপড় বুনবে।
এ যুগের কবিদের প্রণয়-সংক্রান্ত ভাষা হতে মনে হয়, প্রাথমিক যুগে নারী সৌন্দর্যের যে আদর্শ ছিল, এ যুগে তার বিশেষ পরিবর্তন ঘটে নাই। নারীর দৈহিক উচ্চতা বৃক্ষ-লতার মধ্যে বাঁশের মত হবে, তার মুখ হবে পুর্ণিমার চাঁদের মত গোলাকার, তার চুল হবে রাতের চেয়ে অন্ধকার, তার গাল হবে সাদা ও গোলাপী–তাতে থাকবে একটি তিল। তার চোখ হবে অত্যন্ত কালো এবং বন্য হরিণের চোখের মত ডাগর, তার চোখের পাতা হবে ঘুমলো, তার মুখ হবে ছোট, তাঁর দাঁত প্রবালের উপর বসানো মুক্তার মত হবে, তার বুক হবে ডালিমের মত, তার নিতম্ব হবে চওড়া এবং তার সরু আঙ্গুল লতিয়ে যাবে–আর সে আঙ্গুলের ডগা হবে মেহেদী রঞ্জিত।
মহিলাদের ফ্যাশান-সম্মত শিরস্ত্রাণ ছিল, মাথা-চোখা টুপী; টুপীর নিম্নভাগে একটি ছোট্ট বৃত্ত ছিল। কেউ কেউ হীরা-জহরতে এ বৃত্ত সাজিয়ে রাখত। নারীদের সজ্জিত হওয়ার অন্যান্য উপকরণের মধ্যে ছিল মল ও বালা। পুরুষদের পোশাক এখন যা আছে, তখন মোটামুটি তা-ই ছিল। লেবানন ও সিরিয়াতে প্রচীনেরা এখনো সেই পোশাকই পরিধান করে। সাধারণ শিরস্ত্রাণ ছিল কালো উঁচু চূড়া-যুক্ত পশমের টুপী। পোশাকের মধ্যে ছিল পারস্য ফ্যাশানের ঢিলা পাজামা, সার্ট, ফতুয়া, ছোট কোর্তা এবং জুব্বা’। এই আরবী শব্দটিকে আমরা দশম শতাব্দীতেও স্পেনীয় ভাষার অভিধানে দেখতে পাই; স্পেনীয় ভাষার মারফত এই শব্দ রোমান্স ভাষার বাকী শাখাগুলির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান হতে ইংরেজী, ম্যানিক এবং জার্মান জাতীয় বিভিন্ন ভাষায় প্রবেশ করে।
বাড়ীর আসবাবপত্রের মধ্যে দিন ক্রমে সবচেয়ে বড় আসন দখল করে বসে। দিবান মানে কামরার তিন পাশ বরাবর প্রসারিত সোফা। উমাইয়াদের আমলেই চেয়ারের মত উঁচু আসনের প্রবর্তন হয়। কিন্তু মেঝের উপর পাতা ছোট চারকোণা মাদুরের উপর বিছানো গদীর চল রয়েই যায়। এ গদীর উপর একজন আরামের সঙ্গে আসন করে বসতে পারত। মাদুরের ইংরেজী প্রতিশব্দ ‘ম্যাট্রেস’ কথাটি আরবী মারাহ্ শব্দ হতে উদ্ভূত। হাতে বোনা গালিচায় মেঝে ঢাকা থাকত। পিতলের বড় গোলাকার খাঞ্চায় খানা সাজিয়ে তা দিবান কিংবা মেঝের গদীর সামনে একটি নিচু টেবিলের উপর রাখা হত। ধনীদের বাড়ীতে রূপার খাঞ্চা এবং আলুশ কাঠ, মতি বা কচ্ছপের খোলস খচিত-কাঠের টেবিল ব্যবহার করা হত। অমন টেবিল এখনো দামেস্কে তৈরি হয়ে থাকে। একদা যারা বিচ্ছা, গোবরে পোকা এবং বেজীকে অতি উপাদেয় খাদ্য মনে করত, ভাতকে বিবেচনা করত বিষাক্ত খাদ্য এবং রুটী পাতলা করে তার উপর লিখত–এই সময়ের মধ্যে তাদের খানার রুচি এত উন্নত হয়ে উঠেছিল যে, সভ্য জগতের অতি উপাদেয় খাদ্য ছাড়া আর কিছু তাদের মুখে ভালো লাগত না। তাদের খানার মধ্যে থাকত, মূল্যবান মিষ্টি ইত্যাদি ইরানী খানার বিভিন্ন দফা। তাদের মুরগীকে খাওয়ান হত জলপাই, দুধ, নারিকেল ইত্যাদি। গ্রীষ্মকালে বরফ দ্বারা ঘর ঠাণ্ডা রাখা হত। পান করার জন্য পরিবেশন করা হত মাদকতাহীন শরবত। পানিকে চিনি দিয়ে মিঠা ও গোলাব, কলা ইত্যাদির নির্যাস দিয়ে সুগন্ধ করে এই শরবত বানানো হত। পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে কফি প্রচলিত হয় নাই এবং আমেরিকা অধিকারের আগে তামাক অজানা ছিল। নবম কি দশম শতাব্দীর একজন গ্রন্থকার তার লিখিত একটি বইয়ে সে আমলের ভদ্রলোকের মেজাজ, আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতিবোধ সম্বন্ধে বর্ণনা দিয়ে গেছেন : ভদ্রলোকের ব্যবহার মোলায়েম, আত্মসম্মান-জ্ঞান পুরুষোচিত, আচার মার্জিত; সে হালকা তামাসা হতে বিরত থাকে, সৎলোকের সঙ্গ করে, একান্ত সত্যনিষ্ঠ, প্রতিজ্ঞা পালনে উদগ্রীব, অন্যের গোপন সত্য রক্ষা করে, অমলিন তালিহীন কাপড় পরে, খানার টেবিলে বসে ছোট ছোট লোকমা মুখে দেয়, কথা অল্প বলে, উচ্চস্বরে হাসে কম, তার খানা ধীরে চিবিয়ে খায়, আঙ্গুল চাটে না, পিয়াজ, রসুন খাওয়া পরহেজ করে, মুখ ধোয়ার কামরায়, গোসলখানায়, প্রকাশ্য সভায় এবং রাস্তাঘাটে খিলাল করা বন্ধ রাখে।
