আরবদের ‘উর্বর হেলাল’ বিজয়কালে তাদের হাতের কাছে গ্রীসের জ্ঞানাত্মক উত্তরাধিকারই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান ভাণ্ডার। সুতরাং, আরব-জীবনে সমস্ত বৈদেশিক প্রভাবের মধ্যে হেলেনিজমই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব হয়ে দাঁড়ায়।
আল-মামুনের আমলে এই গ্রীক প্রভাব তার চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছে। আল-মামুনের চরিত্রে যুক্তিপ্রবণতার ঝোঁক ছিল। ধর্ম-শাস্ত্রের কথার সঙ্গে যে যুক্তির মিল থাকতে হবে, তাঁর এই মতের সমর্থনের জন্য তিনি গ্রীক-দর্শনের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ৮৩০ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘জ্ঞান-নিকেতন স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার, তত্ত্বমূলক আলোচনার কেন্দ্র ও অনুবাদ সংঘের সমাবেশ ছিল। খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে আলেকজান্দ্রিয়ায় যে যাদুঘর স্থাপিত হয়, তারপর জ্ঞান-নিকেতনের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আর একটিও স্থাপিত হয় নাই। এই সময়ের আগ পর্যন্ত খৃষ্টান, মুসলমান ও নও মুসলিমরা নিজ নিজ মরজী মোতাবেক বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বই অনুবাদ করে আসছিলেন। আল-মামুনের সময় হতে শুরু করে তার কাছাকাছি পরবর্তীদের কাল পর্যন্ত অনুবাদের কাজ প্রধানতঃ জ্ঞান-নিকেতনকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে। আব্বাসীয় অনুবাদ-যুগ-৭৫০ সাল হতে প্রায় একশ’ বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। অনুবাদকদের বেশির ভাগেরই মাতৃভাষা ছিল আরামেইক (সিরিয়াক)। সেই জন্য অনেক গ্রীক গ্রন্থ প্রথমে আরামেইক ভাষায় অনূদিত হয়–তারপর অনূদিত হয় আরবী ভাষায়। যীশুখৃস্ট আরামেইজ ভাষায় কথাবার্তা বলতেন।
আরবীতে যারা অনুবাদ করতেন, তাঁরা সাহিত্য ও ধর্ম গ্রন্থের খোঁজ-খবর নেন নাই । গ্রীক নাটক, গ্রীক কবিতা এবং গ্রীক ইতিহাস–এসবের সঙ্গে আরব মনের কোন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হয় নাই। এ ক্ষেত্রে পারস্যের প্রভাবই সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ছিল। আফলাতুন ও আরাস্তুর দ্বারা উদ্ভাবিত এবং পরবর্তী নিও-প্ল্যাটোনিস্টদের দ্বারা ব্যাখ্যাত গ্রীক দর্শন নিয়েই মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান আবিষ্কারের যাত্রা শুরু করে!
আরবরা হুনাইন ইবনে-ইসহাককে (৮০৯-৮৭৩) বলে অনুবাদকদের শেখ। ইনি সে জামানার সবচেয়ে বড় পণ্ডিত এবং চরিত্রে সবচেয়ে মহান ছিলেন। হুনাইন হীরাবাসী একজন নেস্টোরীয়ান খৃস্টান ছিলেন। যৌবনকালে ইনি এক ডাক্তারের দোকানে কম্পাউন্ডারের চাকরী গ্রহণ করেন। একদিন তার মনিব শ্লেষের সঙ্গে বলেন, হীরার বাসিন্দাদের চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নাই; তুমি বরং বাজারে গিয়ে টাকা ভাঙ্গানোর পেশা শুরু কর। বালক মনিবের এই তিরস্কারের প্রতিবাদস্বরূপ সাশ্রু-নয়নে চাকরী ছেড়ে আসেন ও গ্রীক ভাষা শিক্ষার জন্য সংকল্প করেন। কথিত আছে, হুনাইন গ্যালেন, হিপোক্রাটস্ এবং ডায়োস্ কোরাড়ীসের বই অনুবাদ করেন। এ ছাড়া, আল্লাতুলেন রিপাবলিক’ এবং আরাস্তুর ক্যাটিগরী ফিজিক্স ও ম্যাগনা মরালীয়া’রও অনুবাদ করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, গ্যালেনের প্রায় সমস্ত বৈজ্ঞানিক গ্রন্থেরই আরবীতে অনুবাদ। গ্যালেনের দেহ-বিজ্ঞান বিষয়ক সাতখানি বইয়ের মূল গ্রীক গ্রন্থ হারিয়ে গেছে; সৌভাগ্যক্রমে তা আরবী অনুবাদে রক্ষিত হয়েছে। হুনাইন গ্রীক সেপটুয়াজিন্ট হতে আরবীতে ওল্ড টেস্টামেন্টের যে অনুবাদ করেন, তা এখন আর পাওয়া যায় না।
হুনাইন যে সুদক্ষ অনুবাদক ছিলেন, তার সমর্থনমূলক প্রমাণ আছে। তিনি এবং অন্যান্য অনুবাদকেরা মাসে ৫ শত দিনার (১২ শত ডলার বা ৪ হাজার টাকার মত) পেতেন। উপরন্তু আল-মামুন তাঁর অনূদিত গ্রন্থ ওজন করে তাকে সেই পরিমাণ সোনা দিতেন। কিন্তু কেবল অনুবাদক হিসেবে তাঁর গৌরব ছিল; তিনি তাঁর গৌরবের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন তখন, যখন খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল তাকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত করেন। একবার খলীফা তাঁর জনৈক দুশমনের জন্য হুনাইনকে একটা গোপন বিষয় তৈরি করে দিতে বলেন। হুনাইন অস্বীকার করেন। ফলে খলীফা তাঁকে এক বছর জেলে আটক রাখেন। খলীফার সামনে এনে মৃত্যুর ভয় দেখালে তিনি উত্তর দেন : মানুষের পক্ষে যা হিতকর, আমি কেবল তাই শিখেছি–অন্য কিছু শিখি নাই। খলীফা বলেন : ‘আমি কেবল তোমার সততা পরীক্ষা করছিলাম। এখন বল, কি জন্য তুমি মারাত্মক বিষ তৈরি করতে অস্বীকার করলে?’ হুনাইন উত্তরে বলেন : দুই বস্তু আমাকে এ কাজ করতে বাধা দেয় । এক-আমার ধর্ম, অন্য–আমার পেশা। আমার ধর্ম বলে যে, আমাদের শত্রুরও আমাদের উপকার করা উচিত; বন্ধুর উপকার তো আরো বেশি করা কর্তব্য। আর আমার এ চিকিৎসা পেশার প্রবর্তনই হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের রোগ আরোগ্যের কাজেই এর, কর্তব্য সীমাবদ্ধ। তাছাড়া, প্রত্যেক চিকিৎসকই প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ যে, সে কখনো কাউকে মারাত্মক বিষ দিবে না।
চিকিত্সাশাস্ত্রের একজন আধুনিক ফরাসী ঐতিহাসিকই বলেন যে, হুনাইন নবম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন।
তরজমার জামানা খতম হয়ে আসার আগে আরাস্তুর প্রচলিত প্রায় সমস্ত গ্রন্থই আরবী পাঠকদের আয়ত্তে আসে। তার নামে প্রচলিত এই সব বইয়ের । অনেকগুলি অবশ্য মেকী ছিল। এইসব যখন ঘটে, তখন ইউরোপ গ্রীক চিন্তা ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। কারণ, যখন আর-রশীদ আর আল-মামুন গ্রীক ও পারসিক দর্শন নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত, সেই সময় তাঁদের পাশ্চাত্য সমসাময়িক শার্লেমেন ও তার লর্ডরা নাকি তাদের নাম দস্তখত শিখতে খেটে মরছিলেন। ইসলামে মানব-প্রতিমূলক অধ্যয়নের অঙ্গ হিসেবে শীঘ্রই আরাস্তুর তর্ক-শাস্ত্র বিষয়ক অর্গানন এবং পফিরীর ইসাগোণ’ আরবী-ব্যাকরণের পাশে স্থান গ্রহণ করে। আরবী অনুবাদে আরাস্তুর অলঙ্কার ও কাব্য শাস্ত্র তাঁর অরগাননের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজ পর্যন্তও এই রীতিই চলে আসছে। নিও প্ল্যাটোনিক ভাষ্যকারদের মতে আফলাতুন ও আরাস্তুর বাণী যে মূলতঃ এক, মুসলমানরা সে অভিমত গ্রহণ করে। নিও-প্ল্যাটোনিজমের প্রভাব বিশেষ করে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে সুফী মতবাদের মধ্যে। আমরা পরে দেখতে পারব যে, আরব পণ্ডিতদের–বিশেষ করে আবু আলী সীনা ও ইবনে রুশদের মারফত আরাস্তুর ও আফলাতুনের মতবাদ ল্যাটিনে প্রবেশ লাভ করে এবং ইউরোপের মধ্যযুগীয় সূক্ষ্ম চিন্তা-ধারার উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
