বাগদাদ ও অন্যান্য রানী কেন্দ্র হতে আরব সওদাগরেরা কাপড়-চোপড় জওয়াহিরাত, ধাতব আয়না, কাঁচের গুটিকা এবং মসলা নিয়ে দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় চলে যেত। রাশীয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানীর মত সুদূর উত্তরে ইদানীং যেসব আরব-মুদ্রার গুপ্তভাণ্ডার পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে এ যুগের এবং এর পরবর্তী যুগের মুসলমানদের দুনিয়া-জোড়া সওদাগরীর পরিচয় পাওয়া যায়। আরব্য উপন্যাসে বণিক সিন্দাবাদের কাহিনীটি একান্ত সুপরিচিত। এই কাহিনীতে যে সব দুঃসাহসী কাজের বর্ণনা আছে, আরব বণিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাই যে তার বুনিয়াদ, এ কথা অনেক কাল হতে বহুজনে স্বীকার করে আসছেন।
বাগদাদের সমাজে সওদাগরদের একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল। আজকের মত তখনো আলাদা আলাদা জিনিসের ব্যবসায়ীদের আলাদা আলাদা বাজার ছিল। গলী জীবনের একটানা সুর ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে চলতো বিয়ে অথবা ত্বক ছেদনের উৎসবের শোভাযাত্রা। চিকিৎসক, উকিল, শিক্ষক, লেখক, এবং অনুরূপ শ্রেণীর অন্যান্যরা সমাজে উচ্চ স্থান দখল করতে শুরু করেন। একজন জীবনী লেখক জনৈক বুদ্ধিজীবীর দৈনিক কাৰ্যসূচীর একটা বর্ণনা রেখে গেছেন। তা দেখে মনে হয়, তৎকালীন বাজারে বুদ্ধিজীবীদের বেশ দাম ছিল। আমরা দেখতে পাই যে, এই বিদ্বান মানুষটি রোজ ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যান, তারপর সরকারী গোসলখানায় প্রবেশ করেন। সেখানে চাকরেরা তার উপর পানি ঢেলে দেয়। গোসলখানা হতে বের হয়ে তিনি আরামের পোশাক পড়েন, একটু শরবত পান করেন, একটা বিস্কুট মুখে দেন এবং বিছানায় গড়ান; হয়তো ঘুমিয়ে পড়েন। এই দিবা-নিদ্রা অন্তে তিনি নিজ দেহকে সুবাসিত করার জন্য গন্ধদ্রব্য পোড়ান এবং মধ্যাহ্নের খানা হাজির করার হুকুম দেন। সে খানায় সাধারণতঃ থাকে রুয়া, মুরগীর বাচ্চা ও রুটি। এরপর তিনি ফের ন্দ্রিা যান। ঘুম ভাঙ্গলে উঠে পান করেন চার বোতল পুরোনো শরাব এবং সঙ্গে কখনো কখনো সিরিয়া দেশের দুই চারটে ছেব নাশপতি খান।
বিলাস-ঐশ্বর্যময় জীবন এ যুগকে ইতিহাস ও উপন্যাসের নিকট প্রিয় করে তোলে। কিন্তু এ যুগকে দুনিয়ার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে এক জ্ঞানাত্মক জাগরণ। এ জাগরণ কেবল ইসলামের ইতিহাসে নয়–চিন্তা ও সংস্কৃতির সমগ্র ইতিহাসের মধ্যে এ ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ জাগরণের প্রধান হেতু ছিল বিদেশী প্রভাব : কতকটা ইন্দো-পারসিক এবং সিরীয়, কিন্তু প্রধানতঃ হেলেনিক। এ নব-জীবনের সাধনার এক বিশিষ্ট লক্ষণ ছিল ফারসী, সংস্কৃত, সিরিয়াক এবং গ্রীস হতে আরবী ভাষায় অনুবাদ। আরবরা অতিসামান্য নিজস্ব সাহিত্য, বিজ্ঞান বা দর্শন নিয়ে তাদের নতুন জাতীয় জীবনে যাত্রা শুরু করে; কিন্তু তারা মরুভূমি হতে নিয়ে আসে জ্ঞানাত্মক কৌতূহলের এক সুতীক্ষ্ণ বোধশক্তি ও বহু অন্তর্নিহিত বিশিষ্ট গুণ এবং অল্পকাল মধ্যেই তারা বিজিত কিংবা লড়াইর ময়দানে পরিচিত পুরোনো ও উন্নততর সংস্কৃতিবান জাতিসমূহের উত্তরাধিকারী হয়ে বসে। সিরিয়া সভ্যতা পরবর্তী গ্রীক সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। আরবের মুসলমানরা সিরিয়ায় গিয়ে এই গ্রীক প্রভাবিত সিরীয় সভ্যতা গ্রহণ করে। তেমনি ইরাকে গিয়ে তারা ইরান প্রভাবিত ইরাকী সভ্যতা গ্রহণ করে। বাগদাদ নগর স্থাপনের মাত্র পঁচাত্তর বছরের মধ্যে আরবী পাঠক-জগত আপন আয়ত্তে এনে নেয় আরাস্তুর প্রধান প্রধান দর্শন-গ্রন্থ, বড় বড় নিও প্ল্যাটনিক ভাষ্যকারদের গ্রন্থ, গ্যালেনের অধিকাংশ চিকিৎসা গ্রন্থ এবং পারসিক ও ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলী।–যার বিকাশ সাধন করতে গ্রীকদের বহু শতাব্দী কেটে গিয়েছিল, আরবরা কয়েক দশকের মধ্যেই তা আত্মস্থ করে নেয়। ইসলামের মূল প্রকৃতিতে ছিল মরুর প্রভাব ও আরব জাতীয়তার পরিচয়-চিহ্ন। গ্রীক ও পারস্য সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আত্মস্থ করার ফলে ইসলাম তার আদি প্রকৃতির অধিকাংশ হারিয়ে ফেলে; কিন্তু এই পথে ইসলাম মধ্যযুগীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। এই মধ্যযুগীয় সভ্যতা তৎকালে দক্ষিণ ইউরোপ ও নিকট-প্রাচ্যের মধ্যে যোগসূত্র ছিল। মনে রাখতে হবে, এ সভ্যতার খোরাক জোগাত একটি মাত্র স্রোতধারা। এ স্রোতধারা প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলনীয়া, ফিনিশীয়া এবং জুড়ীয়া হতে উৎপন্ন হয়ে চলে গিয়েছিল গ্রীসে এবং এই সময়ে হেলেনিজম-এর রূপ গ্রহণ করে প্রায় ফিরে আসছিল। আমরা পরে দেখতে পাব, কিরূপে স্পেন ও সিসিলীতে এই স্রোতধারা ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূচনা করে এবং আরবরা কিরূপে স্পেন ও সিসিলীর ভিতর দিয়ে একে ফের ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়।
প্রাথমিক যুগেই আরবের মুসলমানেরা পাক-ভারত হতে প্রচুর প্রেরণা লাভ করে। জ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও গণিতেই এ প্রেরণা বিশেষ কার্যকরী হয়। ৭৭৩ সালে একজন পাক-ভারতীয় ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন এবং গ্রহ বিজ্ঞান বিষয়ক একখানি গ্রন্থ খলীফার নিকট উপস্থাপিত করেন। খলীফার আদেশে আল-ফাজারী গ্রন্থখানি আরবীতে অনুবাদ করেন। অবশ্য মরুভূমিতে বাস করার কালেই গ্রহ-নক্ষত্র আরবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; কিন্তু এই সময়ের পূর্বপর্যন্ত তাদের মধ্যে ওসবের কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয় নাই। নামাযের কিবলা কোন্ দিকে হবে, তা ঠিকমত নির্ণয়ের জন্য ইসলাম গ্রহ-বিজ্ঞান অধ্যয়নে উৎসাহ দান করে। সুবিখ্যাত আল খাওয়ারিজমী ৮৫০ সালে ইন্তিকাল করেন। তিনি আল-ফাজারীর গ্রন্থকে ভিত্তি করে গ্রহ-বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর বহুবিশ্রুত নির্ঘণ্টগ্রন্থ প্রণয়ন করেন গ্রীক এবং পাক-ভারতীয় গ্রহ-বিজ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান ও তাঁর নিজস্ব অবদানে উক্ত বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেন। ইউরোপীয়রা যে সংখ্যাকে বলে আরবীয় আর আরবরা পাক-ভারতীয়, সে সংখ্যাও মুসলিম জগতে প্রবেশ করে ঐ একই পাক-ভারতীয় ভ্রমণকারীর নীত একটি গণিত গ্রন্থ মারফত। পরবর্তীকালে নবম শতাব্দীতে আরব গণিত-বিজ্ঞান–পাক-ভারতীয়দের আরো একটি অবদানে সমৃদ্ধ হয়। গাণিতিক জগতের এ অবদান হচ্ছে, দশমিক রীতি।
