সৌন্দর্যে জোবায়দার প্রতিদ্বন্দ্বিণী ছিলেন হারুনের সতেলা বোন উলাইয়া । উলাইয়ার কপালে সামান্য একটু দাগ ছিল। সেই দাগ ঢাকার জন্য উলাইয়া একটি জড়োয়া ফিতা ব্যবহার শুরু করেন। অল্পকাল মধ্যেই ফ্যাশন জগতে ‘আলা-উলাইয়া নামে এই ফিতার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।
খলিফার অভিষেক উৎসব, বিয়ে-শাদী, হজে গমন ও বিদেশী দূতদের অভ্যর্থনা ইত্যাদি বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে রাজকীয় ঐশ্বর্য ও ধূমধামের পূর্ণ আয়োজন হত। ৮২৫ সালে খলীফা মামুনের সঙ্গে তাঁর উজীর কন্যা আঠারো বছর বয়স্কা বুরানের বিয়ে হয়। এই বিয়ে উপলক্ষে এমন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত হয় যে, তা সমসাময়িক আরবী সাহিত্যে অপরিমিত ব্যয়ের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি হিসেবে স্থান পেয়েছে। নব-দম্পতি মণিমুক্তা খচিত এক সোনার পাটির উপর দাঁড়ান; একটি খাঞ্চা হতে অতুল্য আকারের এক হাজার মতি তাঁদের উপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়। একটি বিরাট আকারের মোমবাতি রাতকে দিন করে রাখে। মেশকের বড় বড় গোলা-প্রত্যেক গোলার সঙ্গে আটকানো একটি টিকেট, সেই টিকেটে লেখা একটি জমিদারী, একটি গোলাম, কিংবা অনুরূপ মূল্যবান কোন বস্তুর নাম–আর সেই গোলা উপস্থিত শাহ্জাদা ও আমীর-রইসদের উপর বর্ষণ করা হয়। ৯১৭ সালে খলিফা মুক্তাদীর তার প্রাসাদে মহাধুমধামে সপ্তম কন্স্ট্যানটাইনের দূতগণকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। যুদ্ধবন্দীর মুক্তি-মূল্য নির্ধারণ করার জন্য এ দূতগণ এসেছিলেন বলে মনে হয়। অভ্যর্থনার জন্য খলীফার পক্ষ হতে যেসব লোক সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, তার মধ্যে ছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক, ৭ হাজার সাদা ও কালা খোঁজা এবং ৭ শ’ উচ্চপদস্থ আমলা। প্যারেডের সঙ্গে চলেছিল এক শ’ সিংহ আর খলীফার প্রাসাদে ঝুলেছিল ৩৮ হাজার পর্দা (তার মধ্যে ১২ হাজার ৫ শ পর্দা ছিল জরির কারুকার্য খচিত), আর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল ২২ হাজার গালিচা। দূতেরা, এমন চমৎকৃত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁরা প্রথমে প্রাসাদ অধ্যক্ষের কামরাকে, তারপর উজীরের কামরাকে খলীফার মোলকাত মহল বলে মনে করেছিলেন। তারা বিশেষ করে বিস্মিত হন দরাত-মহল দেখে। এই মহলে ৫ লক্ষ ড্রাম (প্রায় ২৯ মণ) ওজনের সোনা ও রূপায় তৈরী একটি গাছ ছিল। তার শাখায় শাখায় বসান ছিল সোনার তৈরী কৃত্রিম গায়ক পাখী। বাগানে গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখেন যে, কৃত্রিম উপায়ে কতকগুলি খেজুর গাছকে ছোট করা হয়েছে এবং তাতে থোকায় থোকায় ধরে আছে দুষ্প্রাপ্য জাতের খেজুর।
মুসলমান রাজা-বাদৃশাহদের মধ্যে হারুন অত্যন্ত বিলাসী ছিলেন। তার ও তাঁর পরবর্তী খলীফাদের অফুরন্ত বদান্যতার আকষর্ণ চুম্বকের আকর্ষণের মত রাজধানীতে কবি, বিদূষক, গায়ক, বাদক, নর্তক, লড়াইর মোরগ ও কুকুরের শিক্ষাদাতা এবং অন্যান্য নানা রকমের আনন্দ পরিবেশকরা এসে হাজির হত। কবি আবু-নুয়াস আর রশীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাঁর অনেক নৈশ অভিসারের শরীক ছিলেন। তিনি এই গৌরবময় যুগের দরবারী জীবনের যে বিচিত্র বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। আল-আগানীর গ্রন্থ এই গৌরবময় যুগের কাহিনীতে পরিপূর্ণ এবং সে কাহিনী হতে মূল সত্য উদ্ধার করা কঠিন নয়। এই কাহিনীর এক কাহিনীতে আমরা শুনতে পাই যে, হারুনর রশীদের পুত্র খলীফা আল-আমীন একদা অপরাহ্নে তার দরবারে বসে তার পিতৃব্য গায়ক ইব্রাহীমকে আবু-নুয়াসের কয়েকটি কবিতা আবৃত্তির জন্য তিন লক্ষ দিনার উপহার দেন। ইব্রাহীম খলীফার নিকট হতে ইতিপূর্বে যে ভাতা পেয়েছিলেন, এ দান তাঁর সঙ্গে যোগ করে মোট পরিমাণ দাঁড়ায়, দুই কোটি দেরহাম। কয়েকটি জিলার খাজনাতেই এ অর্থের সংকুলান হয়ে যেত। আল-আমীন তাইগ্রীস নদীতে মজলিস করার জন্য অনেকগুলি বজরা তৈয়ার করেছিলেন। এসব বজরার আকার নানারকম জীব-জন্তুর মত ছিল। একটি বজরা দেখিতে ছিল শুকোরের মত, একটি ছিল সিংহের মত, আর একটি ছিল ঈগল পাখীর মত। এর একটি তৈয়ার করতে খরচ হয় ৩০ লক্ষ দেরহাম। এই বিবরণে আমরা দেখতে পাই সারা রাত্রিব্যাপী অনুষ্ঠিত কোন একটি নাচের বিবরণ। খলীফা আল-আমীন নিজে হাজির থেকে এ নাচ পরিচালনা করেন অনেক সুন্দরী তরুণী এ নাচের উৎসবে যোগ দেয় এবং মৃদু গানের তালে তালে নাচে। উপস্থিতদের সকলেই গানে শরীক হয়। অন্য একজন গ্রন্থকার বলেন যে, আর-রশীদের ভাই ইব্রাহীম একদিন আর-রশীদকে দাওয়াত করেন। খলীফার সামনে মাছের যে পেয়ালা দেওয়া হয়, দেখা যায় সে পেয়ালায় মাছের টুকরা নেহায়েত ছোট ছোট। কারণ জিজ্ঞাসা করায় ইব্রাহীম বলেন যে, এগুলি কেবল মাছের জিভ এবং ঐ এক পেয়ালার ১৫০টি জিভ সগ্রহ করতে তার খরচ হয়েছে এক হাজার দেরহামের উপর। বর্ণনাকারীদের স্বাভাবিক অতিরঞ্জন বাদ দিলেও বাগদাদ দরবারের জাঁকজমক আমাদের গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
বাগদাদের বহু মাইল-ব্যাপী জেটির ধারে যুদ্ধ-জাহাজ ও প্রমোদতরী সহ শত শত জলযান বাঁধা থাকত। তাদের মধ্যে চীনের জাঙ্কও দেখা যেত। আর ভেড়ার চামড়া ফুলিয়ে তৈরী ভেলাও দেখা যেত। শহরের বিভিন্ন বাজারে আসত-চীন হতে মাটির বাসন, রেশম ও কস্তুরী; ভারত হতে মসলা, খনিজ-দ্রব্য এবং রং; মালয় দ্বীপপুঞ্জ হতে লাল-পাথর ও কাপড়-চোপড়; মধ্য এশিয়ার তুর্কি-ভূমি হতে দাস-দাসী; স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও রাশীয়া হতে মধু, মোম এবং শেতাঙ্গ দাস-দাসী; পূর্ব-আফ্রিকা হতে হাতীর দাঁত, সোনা চূর্ণ এবং কৃষ্ণাঙ্গ দাস-দাসী। চীনা মালপত্র বিক্রির জন্য একটি খাস বাজার ছিল। সাম্রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চলসমূহ হতে জল-স্থল উভয় পথে আসত তাদের নিজস্ব উৎপন্ন দ্রব্য। মিসর হতে ধান, গম, যব এবং পট্টবস্ত্র; সিরিয়া হতে কাঁচ, ধাতব-দ্রব্য ও ফল; আরব হতে কিংখাব, মতি ও অস্ত্র-শস্ত্র এবং পারস্য হতে রেশম, আতর এবং শাক-সঞ্জী।
