শহরটি গোলাকার ছিল। এইজন্য এর আর এক নাম ‘গোল শহর। শহরের চারপাশে ছিল পর পর দু’টি পাকা দেয়াল। তারপরে ছিল একটি গভীর পরিখা–তার পরে ছিল ইটের আরো একটি দেয়াল–৯০ ফিট উঁচু। এই শেষ দেয়াল কেন্দ্রস্থানকে ঘিরে রাখত। দেয়ালের চারপাশে চারটি ফটক ছিল এবং সেই ফটকের ভিতর দিয়ে চারটি রাজ-পথ নির্গত হয়ে সাম্রাজ্যের চারকোণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এইসব দেয়াল-বৃত্তের মাঝখানে অবস্থিত ছিল খলীফার প্রাসাদ। প্রাসাদের এক নাম ছিল সোনার দরজা–অন্য নাম ছিল সবুজ গম্বুজ। প্রাসাদের কাছেই ছিল বিশাল মসজিদ। দরবার-মহলের গম্বুজটি উচ্চতায় ছিল একশ’ ত্রিশ ফিট। এই গম্বুজ অনুসারেই প্রাসাদের অন্যতম নাম হয়। পরবর্তীকালের একটি উপ-কথায় পাওয়া যায় যে, এই গম্বুজের চূড়ায় দাঁড়ানো ছিল নেজা হাতে একজন অশ্বারোহী এবং বিপদের সময় নেজাটি সেই দিকে মুখ করে থাকত, যে দিক হতে দুশমনের আগমন সম্ভাবনা থাকতো। কিন্তু একজন আরব ভৌগোলিক বলেন যে, নেজাটি, বরাবর একই দিকে প্রসারিত ছিল। তাই বলে এই একই দিক হতে সর্বদা দুশমনের আগমণের আশঙ্কা আছে, মুসলমানেরা এমন আজগুবী কথা বিশ্বাস করার মতো বোকা ছিল না।
নতুন রাজধানীর এই অবস্থানের ফলে প্রাচ্য-দেশসমূহ হতে নব নব ভাবের আগমন পথ খুলে যায়। আরবের জীবনবাদ ইরানী প্রভাবের নিকট নতি স্বীকার করে। খলীফা আর আরবের শেখের মত রইলেন না; তিনি ইরানী বাদশাহর মত স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন। ক্রমে ইরানী উপাধি ইরানী শরাব, ইরানী পত্নী ও উপপত্নী, ইরানী সঙ্গীত ও ভাবধারা প্রধান্য বিস্তার করে। তাদের প্রভাবে আদিম আরব-জীবনের রুক্ষতা দূর হয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুশীলনের এক নব যুগের দুয়ার খুলে যায়। কেবল দুই বিষয়ে আরবরা তাদের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে সমর্থ হয় : ইসলামী রাষ্ট্রের ধর্ম এবং আরবী সরকারী-ভাষা রয়ে যায়।
নবম শতাব্দীর শুরুতে দুইজন বিশ্ববিখ্যাত সম্রাট ইতিহাসের দিগন্তে দেখা দেন! পাশ্চাত্যে শার্লেমেন আর প্রাচ্যে খলীফা হারুনর-রশীদ। এ দুইয়ের মধ্যে হারুন নিঃসন্দেহ রকমে অধিকতর শক্তিশালী ও উন্নততর সংস্কৃতির অধিকারী ছিলেন। স্বকীয় স্বার্থের খাতিরে এঁরা দুই জন বন্ধুত্ব-সূত্রে আবদ্ধ হন। শার্লেমেন হারুনের বন্ধুত্ব কামনা করেন এইজন্য, যাতে হারুন শার্লেমেনের শত্রু বাইজেন্টাইনদের সাহায্য না করেন। আবার হারুন শার্লেমেনের বন্ধুত্ব কামনা করেন এইজন্য, যাতে শার্লেমেন হারুনের বিপজ্জনক দুমশন স্পেনের উমাইয়াদের সাহায্য না করেন। কারণ, ইতিমধ্যে উমাইয়াদের এক শাখা স্পেনে এক মহাশক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাজ্য গড়ে তোলেন। পাশ্চাত্য লেখকদের মতে–এই দুই সম্রাট তাদের বন্ধুত্বের পরিচয় হিসেবে নিজেদের মধ্যে দূত ও উপহার আদান-প্রদান করেন। এ আমলের একজন ফিরিঙ্গী লেখককে কেউ কেউ । শার্লেমেনের সেক্রেটারীরূপে বর্ণনা করেছেন। ইনি বলেন যে, পাশ্চাত্যের মহান সম্রাটের দূত পারস্যের রাজা হারুনের নিকট হতে বহু দামী সওগাতসহ ফিরে এলেন। এ সওগাতের মধ্যে ছিল কাপড়-চোপড়, গন্ধ-দ্রব্য ও একটি হাতী। এ বিবরণে আরও পাওয়া যায় যে, এ সওগাতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কাজ করা ঘড়ি ছিল। হারুন তার প্রদত্ত উপহারগুলির মধ্যে একটি অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে ছিলেন বলে যে কাহিনী প্রচলিত আছে, তা বহু মনোরম কাহিনীর মত সম্পূর্ণ অলীক। মূল বিবরণে ‘ক্লেপসিড্রা’ শব্দটির ভুল অনুবাদ হতে এ কাহিনীর উদ্ভব। শব্দটির আসল মানে হচ্ছে, পানির সাহায্যে সময় পরিমাপ করার একটি কৌশল। স্বভাবতঃ ঘড়িটি সম্পর্কেই এ শব্দ প্রযুক্ত হয়েছিল। হারুন বায়তুল মোকাদ্দেসের বড় গীর্জার চাবি শার্লেমেনের নিকট পাঠিয়েছিলেন বলে যে কাহিনী শুনা যায়, তা-ও ভিত্তিহীন। এইসব উপহার ও দূত বিনিময় নাকি হয় ৭৯৭ সাল হতে ৮০৬ সালের মধ্যে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এ সম্বন্ধে মুসলিম লেখকেরা একদম চুপ। অন্য বহু দূত ও উপহার বিনিময়ের কথা তারা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে একটি হরফও তারা উচ্চারণ করেন নাই।
হারুনের আমলে (৭৮৬-৮০৯) বাগদাদের বয়স পঞ্চাশেররা কম ছিল; অথচ এই স্বল্পপরিসর সময়ের মধ্যে বাগদাদ একদম শূন্য হতে মহা ঐশ্বর্যশালী ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। সে যুগে এই-ই ছিল বাইজানটিয়ামের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী বাগদাদেরও ঐশ্বর্য-মহিমা বেড়ে চলে। বাগদাদ হয়ে ওঠে এ দুনিয়ার অতুল্য নগরী।
হেরেম, খোঁজাদের আবাস, অন্যান্য আমলাদের ইমারতসহ খলীফার প্রাসাদ ‘গোল শহরের তিনভাগের একভাগ জুড়ে ছিল। প্রাসাদের মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, তার মোলাকাত মহল। প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ গালিচা, পরদা, সোফা ইত্যাদিতে সুসজ্জিত থাকত এ মহলটি। খলীফার বেগম ছিলেন জোবায়দা আগের সম্বন্ধে চাচাতো বোন। পরবর্তী যুগের লোকেরা খলীফার জীবনকে যে গৌরব-মহিমায় মণ্ডিত করেছে, বেগম জোবায়দা তার আংশিক অধিকারিণী। মণি-মাণিক্য খচিত সোনা-রূপার বাসনপত্র ছাড়া অন্য বাসন জোবায়দার টেবিলে স্থান পেত না। তিনিই প্রথম তার জুতা বহুমূল্য মণি-মাণিক্যে খচিত করেন। কথিত আছে, হজ্ব করতে যাওয়া উপলক্ষে তিনি ত্রিশ লক্ষ দিনার ব্যয় করেন। এই অর্থের আংশিক ব্যয়ে বিশ মাইল দূরের এক নদী হতে খাল কেটে মক্কা শরীফে পানি আনা হয়।
