দামেস্কের জামে মসজিদের দিকে চাইলে আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, কিভাবে আরব-সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ৭০৫ সালে খলীফা ওলীদ দামেস্কের খৃস্টান গীর্জার স্থান নিয়ে নেন। এ স্থানে আদি যুগে ছিল জুপিটারের মন্দির, খৃস্টানরা এ স্থানকে উৎসর্গ করে সেন্ট জনের নামে। এখানেই খলীফা উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। খৃষ্টানদের গীর্জার কতটুকু মসজিদ নির্মাণকালে সংরক্ষিত হয়েছিল, তা বলা কঠিন। প্রাচীন গীর্জার বুরুজের উপর দক্ষিণের দুটি মিনার স্থাপিত; কিন্তু উত্তরের মিনার ওলীদ নিজে তৈরী করেছিলেন। এই মিনার আলোক-স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং এরই অনুকরণে সিরিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে বহু মিনার নির্মিত হয়। যে সকল খুঁটি মুসলিম মিনার আজো টিকে আছে, তার মধ্যে এইটিই সবচেয়ে প্রাচীন। এই মসজিদ নির্মাণে ওলীদ পারসিক, গ্রীক এবং ভারতীয় কারিগর মোতায়েন করেন। ইদানীং যে প্রাচীন দলিল-পত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কিছু কিছু মাল-মসলা ও কারিগর মিসর হতেও আনীত হয়েছিল। উপরে যা বর্ণিত হল এবং পরে যা বর্ণিত হবে, তা থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হবে যে, আরবরা দুনিয়াকে যুদ্ধ-বিদ্যায় তাদের যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জনেরও ক্ষমতা ছিল।
১০. গৌরবের যুগে বাগদাদ
আরবগণ সৌন্দর্যচর্চা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনে যেমন আত্মনিয়োগ করে, অনাচারেও তারা তেমনি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগের কিঞ্চিৎ আগে একজন বাদীর গর্ভজাত খলীফা উমাইয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। অত্যন্ত অশুভ লক্ষণ। তাঁর পরবর্তী দুই খলীফাও বাদীর গর্ভজাত ছিলেন–আর এরাই ছিলেন উমাইয়া বংশের শেষ খলীফা। খোঁজা-প্রথা ইতিমধ্যেই পূর্ণ বিকাশ-লাভ করে এবং এই খোঁজাদের সাহায্যেই হেরেম প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব সম্ভব হয়। অপরিমিত ঐশ্বর্য ও গোলাম-বাঁদীর ছড়াছড়ি হেতু বিলাস-সম্ভোগ চরমে ওঠে। শাসকগোষ্ঠীতে খাঁটি আরব-রক্ত কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সর্বত্র নৈতিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে।
এই অবধাঃগতি উমাইয়া বংশকে অনেকখানি দুর্বল করে ফেলে। উত্তর ও দক্ষিণ আরবের কওমদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আত্মকলহ উমাইয়াদের দুর্বলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রাক-ইসলামী যুগেও এমন গোষ্ঠীগত বিভেদ-প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। এখন সেই ব্যাধি চরমে গিয়ে ওঠে এবং অনন্ত বিবাদ-বিসম্বাদ সৃষ্টি করতে থাকে। সিন্ধুনদের তীরে তীরে, সিসিলীর উপকূলে উপকূলে এবং সাহারার সীমান্তে সীমান্তে এই প্রাচীন কলহ আত্মপ্রকাশ করে। এর ফলে দুটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয় : কাইস্ ও ইয়ামন। লেবানন ও ফিলিস্তিনে আধুনিক যুগ পর্যন্তও এ কলহ জীবন্ত ছিল। কারণ, অষ্টাদশ শতাব্দীতেও এ দুই দলের মধ্যে দস্তুরমত লড়াই হয়েছে।
বংশের মধ্যে কার পর কে খলীফার সিংহাসনে বসবে, তার কোন সুনির্দিষ্ট নীতি না থাকায় অনিশ্চয়তা উমাইয়া বংশকে আরো দুর্বল করে তোলে। মুয়াবীয়া তার পুত্রকে সিংহাসনের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। আরবের সনাতন রীতি ছিল যে, সমাজের বয়োঃজ্যেষ্ঠই উত্তরাধিকারী হবে; কিন্তু এ-সত্ত্বেও শাসক পিতা স্বভাবতই তাঁর পুত্রকে সিংহাসন দিতে লালায়িত হতেন। ফলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠত।
এ আমলের ইতিহাসে ‘জনসাধারণ বা জাতির উল্লেখ কমই মিলে। অথচ এই জনসাধারণ বা জাতির আনুগত্যই সিংহাসন লাভের একমাত্র দাবী হয়ে দাঁড়ায়। এই আনুগত্য প্রকাশ করা হত নেতাদের মারফত। জনসাধারণ শক্তির চূড়ান্ত উত্স হওয়া সত্ত্বেও এ আমলে তারা মাঝে মাঝে উচ্ছঙখল গণ-বিক্ষোভ দ্বারা গোলযোগের সৃষ্টি করত। তাদের ইচ্ছাকে শাসন-শক্তির নিকট কার্যকরী করার দিন তখনো দূরে ছিল।
উমাইয়াদের জাতি-ভাই আব্বাসীয়রা ৭৪৭ সালে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আব্বাসীয়রা মহাবীর অন্যতম পিতৃব্য আল আব্বাসের বংশধর। এই সময় আব্বাসীয়দের বিদ্রোহ সাফল্যমণ্ডিত হয় এবং উমাইয়া খান্দান ধ্বংস হয়ে যায়। জনৈক আব্বাসীয় সেনাপতি ক্ষমতাচ্যুত উমাইয়া পরিবারের আশি জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে এক ভোজে দাওয়াত করেন এবং ভোজের সময় তাদের প্রত্যেককে কেটে টুকরা করে তাদের মৃত ও অর্ধমৃত দেহের উপর চামড়ার চাদর বিছিয়ে ভোজন করেন। প্রথম আব্বাসীয় খলীফা নিজকে আস্-সাফফা (রক্তপাতকারী) বলে পরিচয় দিতেন এবং পরে এ-ই তাঁর উপনাম হয়। আস্-সাফফার এই কাজের ফল দূরগামী ছিল। নতুন রাজবংশ তাদের নীতি কাজে পরিণত করার জন্য জোর-জুলুমের উপর নির্ভর করতে শুরু করে। এ জামানার জল্লাদৃরা একটি চামড়াকে তাদের গালিচা হিসেবে ব্যবহার করত। ইসলামের ইতিহাসে এই প্রথম সেই চামড়া খলীফার সিংহাসনের পাশে তার অনুবদ্ধ হিসেবে স্থান লাভ করল। আব্বাসীয় খলীফারা কোনদিনই উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের উপর শাসন-পরিচালনা করে নাই; কিন্তু তারা পরবর্তী পাঁচশ’ বছর পর্যন্ত মুসলিম-জগতের পূর্বাংশ শাসন করেছে। তাদের বংশের সপ্তত্রিংশ খলীফা ১২৫৮ সালে মোগলদের হাতে নিহত হন। প্রকৃতপক্ষে আব্বাসীয়দের-আমলকেই ইসলামী সভ্যতার সোনার যুগ বলা যায়। বাগদাদ আব্বাসীয় খলীফাদের সৃষ্টি। এই বংশের দ্বিতীয় খলীফা তাইগ্রিস নদীর পশ্চিম পারে এর পত্তন করেন। এইখানে প্রাচীনযুগের কয়েকটি মহাশক্তিশালী সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। খলীফা তাঁর রাজধানীর জন্য এই স্থান নির্বাচন কালে বলেনঃ “এখানে সুন্দর একটা সেনানিবাস হবে। তাছাড়া, এই তাইগ্রিস নদীর সাহায্যে আমরা সুদূর চীন পর্যন্ত বহু দেশের সংগে সংযোগ স্থাপন করতে পারব। সমুদ্রের ঐশ্বর্য যা পাওয়া যাবে, নিয়ে আসতে পারব। মেসোপটেমীয়া, আর্মেনিয়া এবং তাদের সন্নিহিত স্থান হতে খাদ্যদ্রব্য আমদানী করতে পারব। এর উপর, কাছেই আছে ইউফ্রেতিস। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়া, আর-রাকা এবং তৎসলগ্ন স্থান হতে বহু জিনিস আমরা আনতে পারব। এ নির্বাচন বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক ছিল। এক লক্ষ কারিগর ও ওস্তাগর চার বছর ক্রমান্বয়ে কাজ করে চলে। এমনিভাবে জেগে ওঠে এ স্বপ্নের শহর।
