কোরআন অধ্যয়ন এবং তার তফসীরের প্রয়োজন হতে উদ্ভূত হয় শব্দ-তত্ত্ব, অভিধান রচনা এবং মুসলমানদের সেই একান্ত নিজস্ব সাহিত্য-সাধনা হাদীস বিজ্ঞান। হাদীসের শব্দগত মানে বর্ণিত বস্তু, আখ্যান; পরিভাষা হিসেবে এর মানে হচ্ছে, মহানবী বা তার কোন সাহাবীর কোন কাজ বা কথার বিবরণ। কোরআন এবং হাদীসের ভিত্তির উপরই রচিত হয় ধর্ম-তত্ত্ব ও আইন-কানুন। বর্তমান যুগে বিধান-তত্ত্ব (জুরি প্রডেন্স) বলতে যা বুঝায়, ইসলামে আইন তার উপর তত নির্ভরশীল নয়, যত নির্ভরশীল ধর্মের উপর। তালমুড এবং অন্যান্য সূত্রে রোমক আইন নিঃসন্দেহ রকমে উমাইয়াদের আইন প্রণয়নের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল; তবে সে প্রভাবের পরিমাণ নির্ণীত হয় নাই।
অমরা এই যুগে আরব-বিজ্ঞানের আরম্ভ দেখতে পাই। একজন ইহুদী আলেকজান্দ্রিয়ার জনৈক খৃস্টান পাদ্রীর গ্রীক ভাষায় লিখিত একখানি বইয়ের অনুবাদ করেন। আরবী ভাষার চিকিৎসা সম্বন্ধে এই-ই প্রথম পুস্তক চিকিৎসা শাস্ত্রের মত আল-কিমিয়াও পরবর্তীকালে আরব অবদানে বিশেষ পরিপুরি লাভ করে এবং আল-কিমিয়া সংক্রান্ত সাধনাও এই প্রাথমিক যুগেই শুরু হয়।
দামেস্কের দরবারে কবিতা ও সঙ্গীত বিশেষ উন্নতি লাভ করে। অবশ্য সমাজের রক্ষণশীলেরা সঙ্গীতের সমর্থক ছিল না; তারা মনে করত, সুরা পান ও জুয়া খেলার মত গানের আনন্দ-উৎসবকে মহানবী হারাম করে গেছেন। কাব্য রচনার ক্ষেত্রেই উমাইয়াদের আমলে সাংস্কৃতিক প্রগতি সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করে। উমাইয়াদের আগের আমল ছিল কঠোর বিজয়ের আমল। আরবরা কবির জাতি হওয়া সত্ত্বেও এ যুগে সে জাতির মধ্যে কোন কবির আবির্ভাব হয় নাই। দুনিয়াদার উমাইয়াদের ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুরার দেবী, গানের দেবী এবং কবিতা দেবীদের সঙ্গে পুরাতন সম্বন্ধ পুনঃস্থাপিত হল। আরবী ভাষায় এই প্রথম প্রেমের কবি পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করল।
মুসলিম আরবদের বেলায় চারু-শিল্প সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করে তাদের ধর্মীয় দালান-কোঠা নির্মাণে। মুসলিম স্থপতিবিদ বা তাদের নিযুক্ত লোকেরা দালান-ইমারত নির্মাণের এক নব-পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তাদের নির্মিত দালান-কোঠা একাধারে সরল ও মহিমান্বিত ছিল। পুরাতন নমুনার উপরই এ পদ্ধতির বুনিয়াদ ছিল; কিন্তু তথাপি এ পদ্ধতিতে তাদের নব ধর্মের অন্তর্বাণী যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। এই জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং জাতির সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপিত হওয়ার ফলে যে ইসলামী-সভ্যতার বিকাশ ঘটে, তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস মিলে মুসলমানের মসজিদে। ইসলাম এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে যে তামন্দুনিক আদান-প্রদান হয়েছে, মসজিদ ছাড়া তার স্পষ্টতর নিদর্শন বোধহয় আর কোথাও নাই।
ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে হযরত মুহম্মদের (সঃ) মদীনাস্থ সাদাসিধা মসজিদটিই জামে মসজিদের মূল আদর্শ ছিল। এ মসজিদটি ছিল একটি ছাদহীন খোলা অঙ্গন; তার চারদিকে ছিল রোদে-পোড়া ইটের দেয়াল। রোদ হতে আত্মরক্ষার জন্য মহানবী পরে সংলগ্ন দালান হতে একটি সমতল ছাদ বাড়িয়ে এনে সমস্ত অঙ্গন ঢেকে দেন। এ ছাদ তৈরি ছিল খেজুর পাতা আর কাদায় এবং স্থাপিত ছিল খেজুর গাছের খামের উপর। খেজুর গাছের একটা খণ্ড মাটিতে পুঁতে মেহরাব তৈরি করা হয়; মহানবী তারই উপর দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলকে খোবা দিতেন। পরে খেজুর গাছের এ-খণ্ড তুলে ফেলে সেখানে সিরিয়ার গীর্জার অনুকরণে তিন ধাপ যুক্ত একটি কাঠের মঞ্চ স্থাপিত হয়। সুতরাং জামে মসজিদের জন্য সাধারণভাবে যা দরকার এখানে আমরা তার একটা মোটামুটি পরিচয় পাই–একটি অঙ্গন, মুসুল্লীদের শীতাতপ হতে রক্ষার জন্য খানিকটা ছাদ এবং একটি খোত্বা-মঞ্চ।
পরবর্তীকালে আরবরা পশ্চিত এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অত্যন্ত উন্নত ভাস্কর্য-শিল্পের পরিচায়ক অগণ্য ভগ্ন ও অভগ্ন দালান-কোঠার অধিকারী হয়। কেবল তা-ই নয়, বিজিত জাতিরা যুগ-যুগান্তর হতে যে জীবন্ত শিল্প-জ্ঞান উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিল, আরবরা তার নিয়ন্ত্রণভার পায়। মুসলমানদের ধর্মীয় প্রয়োজনে এই জ্ঞান প্রযুক্ত হয় এবং তারই ফলে কালক্রমে বিকাশ লাভ করে সেই সুন্দর শিল্প, যাকে কেউ বলে সারাসেনী, কেউ বলে আরবী, কেউ বা বলে মুসলিম আর্ট। মুহম্মদী আর্ট’ শব্দ ব্যবহারে মুসলমানদের আপত্তি আছে। খৃস্টানরা খৃস্টের উপাসনা করে বলে খৃষ্টান; মুসলমানরা হযরত মুহম্মদের (সঃ) উপাসনা করে না; কাজেই তারা মুহম্মদী’ নয়।
বায়তুল মোকাদ্দেস বাইবেলের বহু ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া, হযরত মুহম্মদের (সঃ) মেরাজে যাওয়ার কালে এ স্থান ছিল তার এক মঞ্জিল। এ উভয় কারণে সেই প্রাথমিক যুগেই বায়তুল মোকাদ্দেস মুসলমানদের চোখে পবিত্র হয়ে ওঠে। পৌত্তলিক, ইহুদী, খৃস্টান এবং মুসলিম ঐতিহ্যে পবিত্র এক ভূখণ্ডের উপর ৬৯১ সালে পাথরের গম্বুজ নির্মিত হয়। কথিত আছে, ঐ স্থানেই ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাইলকে কোরবান করতে চেয়েছিলেন। এই গম্বুজ নির্মাণে সম্পূর্ণ নতুন স্থাপত্য-রীতি অনুসৃত হয় এবং খৃস্টানদের প্রধান গীর্জার চেয়ে সুন্দর করার জন্য এ প্রস্তর-গম্বুজকে এমন অভাবনীয় সুন্দর কারুকার্যে খচিত করা হয় যে, আজ পর্যন্তও তার চেয়ে সুন্দর অমন কিছু আর কোথাও নির্মিত হয়েছে বলে মনে হয় না।
