সমাজের নিম্নতম-স্তরে ছিল গোলাম। অতি প্রাচীনকাল হতে সেমিটিক সমাজে দাস প্রথার চল ছিল। ইসলাম এ প্রথাকে বর্জন করে নাই। ওল্ড টেস্টামেন্ট দাস-প্রথাকে আইনসঙ্গত প্রতিষ্ঠান বলেছে; তবে এ গ্রন্থ দাসদের ভাগ্যকে অনেকখানি উন্নত করেছিল। ধর্মীয় আইন এক মুসলমানের পক্ষে অন্য মুসলমানকে গোলাম করা হারাম করেছে। আর বাইরের কোন গোলাম ইসলাম কবুল করলে তাকে আযাদ করার প্রেরণা দিয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হতে গোলাম সগ্রহ করা হত। এ যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে নারী এবং শিশুও থাকত। অবশ্য মুক্তি-মূল্য দিয়ে এদের আযাদ করে নেওয়া চলত। বাজারে খরিদ করে, কখনো বা অতর্কিত আক্রমণ দ্বারাও গোলাম সংগৃহীত হত। অল্পকাল মধ্যে দাস-ব্যবসায় মুসলিম-জগতের সর্বত্র জেঁকে উঠল এবং খুব লাভজনক তেজারতিতে পরিণত হল। পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার কতক গোলাম কৃষ্ণকায় ছিল; চীন-তুর্কীস্তানের গোলাম পীতকায় ছিল, নিকট প্রাচ্য কিংবা পূর্ব এবং দক্ষিণ ইউরোপের গোলাম ছিল শ্বেতকায়। স্পেনীয় গোলামদের প্রত্যেকের দাম ছিল হাজার দিনার; তুর্কী গোলামদের প্রত্যেকের দাম ছিল ছয়শ’ দিনার। ইসলামী বিধান মোতাবেক বাদীর গর্ভে গোলাম বা অন্য কারো কিংবা স্বয়ং মনিবের ঔরসজাত সন্তান (যেখানে মনিব সন্তানকে নিজ ঔরসজাত বলে অস্বীকার করত) গোলামরূপেই জন্মগ্রহণ করত। কিন্তু আযাদ নারীর গর্ভে গোলামের ঔরসজাত সন্তান আযাদরূপে ভূমিষ্ঠ হত।
বিস্তীর্ণ বিজয়ের ফলে গোলাম দ্বারা মুসলিম-সাম্রাজ্য কি ভয়াবহরূপে প্লবিত হয়েছিল, পরবর্তী অতিরঞ্জিত হিসেব হতে তার খানিকটা ধারণা পাওয়া যায় : মুসা উত্তর আফ্রিকা হতে ৩ লক্ষ বন্দী নিয়ে আসেন; এর ৬০ হাজার বন্দী তিনি খলীফাকে পাঠিয়ে দেন এবং স্পেনের গথ অভিজাতদের ঘর হতে ৩০ হাজার কুমারীকে বন্দী করেন –তুর্কীস্তানের একজন মুসলিম সেনাপতি একা ১ লক্ষ লোককে বন্দী করেন।
মনিব বাদীকে রক্ষিতা হিসেবে রাখতে পারত, কিন্তু বিয়ে করতে পারত না। এমন মিলনের সন্তানেরা মনিবের সন্তান বলে গণ্য হত; সুতরাং তারা আযাদ হিসেবে জন্মগ্রহণ করত। কিন্তু এতে রক্ষিতার সম্মান কেবল সন্তানের জননী’ পর্যন্তই উন্নীত হত–তাকে মনিব-স্বামী বিক্রি বা দান করতে পারত না এবং স্বামীর মৃত্যুর পর সে আযাদী লাভ করত। ক্রমাগত আন্তঃবিবাহের ফলে আরবজাতির সঙ্গে অনারবৃদের এই যে মিশ্রণ ঘটছিল, এ প্রক্রিয়ায় দাস-ব্যবসায় নিঃসন্দেহরূপে প্রচুর সাহায্য করেছিল।
আমরা আগে বলেছি যে, মরুভূমি হতে আগত আক্রমণকারীরা তাদের সঙ্গে বিজিত দেশে কোন জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য কিংবা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আনে নাই। উমাইয়াদের জামানা আইয়ামে-জাহেলিয়াতের সন্নিকট ছিল বলে–আর এ জামানায় অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহে মুসলমানরা এত ব্যস্ত ছিল এবং মুসলিম জগতের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা এমন অনিশ্চিত ছিল যে, সে প্রাথমিক যুগে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের কোন প্রশ্নই উঠতে পারে নাই। কিন্তু বীজ এই সময়েই বপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তী বংশের আমলে বাগদাদে বৃক্ষ ফল-ফুলে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল। তার মূল নিঃসন্দেহ রকমে পূর্ববর্তী জামানার গ্রীক, সিরিয়া ও পারস্য সংস্কৃতির মধ্যে নিবদ্ধ ছিল। উমাইয়া জামানা মোটের উপর ডিমে তা দেওয়ার জামানা ছিল।
পারসিক, সিরিয়ান, কাপৃত, বার্বার এবং অন্যান্যদের ইসলাম কবুল এবং আরব রমনীর পানি গ্রহণের ফলে প্রাথমিক যুগে আরব ও অনারবের মধ্যে যে বিভেদ-দেয়াল গড়ে তোলা হয়েছিল, তার ক্রমে ধসে পড়ল। মুসলমানের মধ্যে কে কোন্ জাতি হতে উদ্ভূত, সে প্রশ্ন পেছনে পড়ে গেল। গোড়ায় জাতিতে যে যা-ই থাক না কেন, হযরত মুহম্মদের (সঃ) অনুসরণ করলেই সে আরব জাতি বলে গণ্য হয়ে যেত। অতঃপর কোন মানুষ আদতে সে যে জাতির অন্তর্গতই থাক না কেন, ইসলাম গ্রহণ কলেই এবং আরবী ভাষায় কথাবার্তা বল্লে ও লিখলেই সে আরব হয়ে যেতে পারত। আরব সভ্যতার ইতিহাসের এক বিশিষ্ট লক্ষণ। আরবী ভাষা-ভাষী মানুষ এতকাল ছিল কেবল আরব, এখন সে হয়ে পড়ল আন্তর্জাতিক। কাজেই যখন আমরা বলি আরব চিকিৎসা শাস্ত্র’, ‘আরব দর্শন’, অথবা আরব গণিত, তাতে এ বুঝায় না যে, ঐ আরব চিকিৎসা শাস্ত্র বা দর্শন বা গণিত কেবল আরবদের উপদ্বীপের বাসিন্দাদের সাধনার ফল। তাতে এই বুঝায় যে, ঐ সব জ্ঞান-বিজ্ঞান সংক্রান্ত গ্রন্থগুলি আরবী ভাষায় লিখিত এর লেখকেরা প্রধানতঃ খেলাফতী আমলে আবির্ভূত হয়েছিলেন; সে লেখকেরা ছিলেন পারসিক, সিরিয়াবাসী, মিসরবাসী, আরববাসী, খৃষ্টান, ইহুদী বা মুসলিম এবং তারা তাদের উপকরণের কতকাংশ সগ্রহ করেছিলেন গ্রীক, আরামিয়ান, ইন্দো-পারসিক অথবা অন্য উৎসমূল হতে।
আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের বিজ্ঞান-সম্মত অধ্যয়ন শুরু হয় পারস্যের সীমান্ত ভূমিতে এবং প্রধানতঃ বিদেশী নও-মুসলিমরাই এ অধ্যয়ন চালিয়ে যান। নও মুসলিমদের অনেকে কোরআন অধ্যয়ন করতে সরকারী পদে স্থান পেতে এবং বিজেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতেই স্বভাবতই আগ্রহান্বিত ছিল। প্রধানতঃ, এই প্রয়োজন মিটানোর জন্যই উপরোক্ত অধ্যয়নের প্রথম তাগিদ আসে। কথিত আছে, আরবীর আদি ব্যাকরণ রচিত হয় এক খলীফার এই ফরমান অনুসারে যে, শব্দ প্রকারণের তিন ভাগ–বিশেষ্য, ক্রিয়া এবং অব্যয়। আসলে কিন্তু আরবী ব্যাকরণের বিকাশ ঘটে দীর্ঘকালব্যাপী, ধীর গতিতে এবং তার উপর গ্রীক তর্ক-শাস্ত্রের প্রভাব সুস্পষ্ট।
