এ একটি আশ্চর্যের বিষয় যে, খৃস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে দামেস্কের সাধারণ জীবন যাত্রা যেমন ছিল, তা সে শহরের বর্তমান জীবন-যাত্রার চেয়ে বিশেষ ভিন্ন ছিল না। আজকের মত তখনো দামেস্কের সংকীর্ণ রাজপথে দেখা যেত, ফিলা পাজামা, লাল সরু-ঠোঁট জুতা ও বিরাট পাগড়ী পরিহিত পথিকের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে মরুভূমির রোদ-পোড়া বেদুঈন–পরনে তার ঢিলা আল-খেল্লা, মাথায় ইকালবদ্ধ রুমাল। মাঝে মাঝে পথে দেখা যায় ইউরোপীয় পোশাক পরিহিত কোন একজন ইন্জী (ফিরিঙ্গী)–আজো ইউরোপীয়রা সবাই ঐ নামেই পরিচিত। এখানে সেখানে মাঝে মাঝে দেখা যায়, দামেস্কের অভিজাত-ঘোড়ার পিঠে সওয়ার’ গায় সাদা রেশমী আবা’, কোমরে ঝুলানো তলোয়ার কিংবা নেজা। শহরে ওরাই ধনীকশ্রেণী। বোরখায় সম্পূর্ণ রকমে ঢাকা দুই-চারটি রমনী রাস্তা পার হয়; অন্যরা চুপে তাদের বাড়ীর পরদাওয়ালা জানালার ফাঁকে ফাঁকে বাজার ও হাওয়া-খাওয়ার ময়দানের দিকে চেয়ে থাকে। রাস্তায় মানুষের হল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শরবত আর হালুয়া বিক্রেতারা প্রাণপণে চীৎকার করে। আবাদী জমির ও মরুভূমির উৎপন্ন শস্য পিঠে বয়ে চলেছে গাধা উটের বহর। শহরের হাওয়া গন্ধ-ভারাক্রান্ত। দুনিয়ায় যত রকম সুগন্ধ আছে, সব ঐ হাওয়ার বুকে বাসা বেঁধেছে।
অন্যান্য শহরের মত দামেস্কেও আরবরা নিজ নিজ কওমের আনুগত্য মোতাবেক স্বতন্ত্র মহল্লায় বাস করত। দামেস্ক, হি, আলেপ্পো ও অন্যান্য। শহরে এই মহল্লাগুলির পার্থক্য আজো সুস্পষ্ট। প্রত্যেক বাড়ীর ফটক পার হলেই সম্মুখে ছিল উঠান। সাধারণতঃ, এসব উঠানের মাঝখানে পানির বড় চৌবাচ্চা থাকত আর চৌবাচ্চার মাঝখানে থাকত ফোয়ারা । ফোয়ারার মুখ হতে হীরক চূর্ণের মত পানির কণা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। চৌবাচ্চার ধারে হয়তো থাকত একটা কমলালেবুর গাছ। উঠানের চারপাশ ঘিরে ঘরের কামরা সাজানো থাকত। বড় বড় বাড়ীতে এবাদতখানাও থাকত। উমাইয়াদের এ এক অবিনশ্বর গৌরব যে, তাঁরা দামেস্কে পানি সরবরাহের যে ব্যবস্থা করেছিলেন, তার চেয়ে ভাল ব্যবস্থা তকালে সমগ্র প্রাচ্যের আর কোথাও ছিল না। আর সে ব্যবস্থা আজো চালু আছে।
সাম্রাজ্যর সর্বত্র বাসিন্দারা চারটি সামাজিক ভাগে বিভক্ত ছিল। শাসক-শ্ৰেণীর মুসলমানরাই স্বভাবতঃ উচ্চতম শ্রেণীর ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন খলীফার পরিবার ও বিজেতা আরব অভিজাত-গোষ্ঠী। কোথায় এদের সংখ্যা কত ছিল বলা কঠিন। তবে হিস ও দামেস্কে এদের সংখ্যা ছিল ২০ হতে ৪৫ হাজার।
আরব-মুসলমানদের পরবর্তী স্তর-ভুক্ত ছিল নবদীক্ষিত মুসলমানগণ। নীতি হিসেবে এরা ইসলামের সর্বপ্রকার নাগরিক অধিকারের অধিকারী ছিল। উমাইয়া আমলের প্রায় আগা-গোড়াই জমির মালিকরা ধর্মনির্বিশেষে খাজনা দিত। তথাপি সরকারী আয় কমে যাওয়ার একটা নিঃসন্দেহ কারণ ছিল, ইসলামে নব দীক্ষা।
এই নব-দীক্ষিত মুসলমানরাই মুসলিম সমাজের নিম্নতম স্তর-ভুক্ত ছিল। তাদের এ সামাজিক মর্যাদাহীনতার জন্য তারা হামেশাই বিক্ষুব্ধ থাকত। আর এই জন্যই আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই যে, বার বার তারা ইরাকে শীয়া দল ও ইরানে খারেজী দলে যোগদান করেছে এবং তার ফলে ঘটেছে অন্তহীন আত্মকলহ ও রক্তপাত। এদের কেউ কেউ উত্তাপে বালি হয়ে সূর্যের চেয়ে দুঃসহ ছিল। তাদের ধর্মোৎসাহ অনেক সময় ধর্মোন্মাদনায় পরিণত হয়ে অমুসলমানদের উপর অত্যাচারের কারণ হত। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পরমত-অসহিষ্ণু ছিল, তাদের মধ্যে ইহুদী খৃস্টান ধর্ম হতে ইসলামে দীক্ষিতের দলই বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল।
মুসলমান সমাজে স্বভাবতঃ এরাই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এবং চারুশিল্পের অনুশীলনে প্রথম আকৃষ্ট হয়; কারণ, এদেরই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল দীর্ঘতম। এরা মুসলমান আরবদের তুলনায় যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় শ্রেষ্ঠতর স্থান দখল করতে লাগল, তখন তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হল। বিজেতা আরবদের সঙ্গে বিয়ে-শাদী করে তারা আরব রক্তে মিশ্রণ আমদানী করল এবং পরিণামে বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে আরব রক্তের পূর্ব বৈশিষ্ট্য আর বজায় রইল না।
তৃতীয় সমাজিক শ্রেণী গঠিত ছিল, সয়ে-নেওয়া-সম্প্রদায়সমূহের দ্বারা যারা প্রত্যাদেশ-প্রাপ্ত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল–তথাকথিত ‘জিম্মী’ দল-খৃস্টান, ইহুদী, সেবীয়ান। এদের সঙ্গে মুসলমানরা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। এই সয়ে-নেওয়া ধর্মের অনুসরণকারীগণকে নিরস্ত্র করে মুসলিম-আশ্রয়ে রক্ষা করা হত এবং এর বিনিময়ে তাদের একটা কর দিতে হত। হযরত মুহম্মদই (সঃ) এ নীতির প্রথম প্রবর্তন করেন। এর এক কারণ ছিল, বাইবেলের প্রতি মহানবীর শ্রদ্ধা এবং অন্য কারণ ছিল, কোন কোন খৃস্টান কওমের অভিজাত-সুলভ আত্মীয়তা।
জিম্মীরা তাদের এই সমাজ-স্তরে ভূমি-কর ও মাথাপিছু কর হতে অনেকাংশে মুক্ত ছিল। কোন মামলায় মুসলমান বিজড়িত না থাকলে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন-ঘটিত ব্যাপারে তারা কার্যতঃ তাদের ধর্মগুরুর অধীনেই বাস করত। মুসলিম-কানুন এত পবিত্র যে, তাদের প্রতি প্রযুক্ত হতে পারত না। এই আইন-বিধির মৌলিক বংশ তুর্ক-সাম্রাজ্যে জারী ছিল এবং সিরীয় ও ফিলিস্তিনের অছি-জামানাতেও তা মরে যায় নাই, দেখা গেছে।
