এখানে টুস এবং পয়টিয়াস-এর মাঝখানে ক্লেইন ও ভিয়েন-এর সঙ্গমস্থলে চার্লস মার্টেল আবদুর রহমানের সম্মুখীন হলেন। চার্লস মেরোভিজীয়ান দরবারের প্রাসাদ মেয়র ছিলেন। ইউডিস তার সাহায্য চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে চার্লস মার্টেল’ (হাতুড়ীওয়ালা) উপাধি লাভ করেন। এই উপাধি হতেই বোঝা যায় যে, চার্লস অসম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি এর আগে অনেক শত্রু দমন করেন। ইউডি ইতিপূর্বে একুইটেইনে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন; চার্লস তাকে উত্তরাঞ্চলে ফিরিঙ্গীদের প্রভুত্বকে নামতঃ স্বীকার করতে বাধ্য করেন। চার্লস হেরিস্টলের পেপিনের জারজ সন্তান ছিলেন। নামে না হলেও কার্যতঃ তিনি রাজ-শক্তি পরিচালনা করতেন।
চার্লসের ফিরিঙ্গী সৈন্যদলের বেশীরভাগই ছিল পদাতিক। তাদের গায়ে ছিল নেকড়ে বাঘের চামড়া আর জটাযুক্ত বারী মাথা হতে কাঁধের উপর দিয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছিল। দীর্ঘ সাতদিন পর্যন্ত আবদুর রহমানের অধীনে আরব-বাহিনী আর চার্লসের অধীনে ফিরিঙ্গী সৈন্যদল সামনা সামনি দাঁড়িয়ে রইল। ছোট ছোট হাতাহাড়ি লড়াই চলতে লাগল। অবশেষে ৭৩২ সালের অক্টোবর মাসের এক শনিবার আরব নেতা অগ্রণী হয়ে আক্রমণ করলেন। ময়দান যখন যোদ্ধাদের হুঙ্কারে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল, তখন ফিরিঙ্গী যোদ্ধারা এক ফাঁপা চতুষ্কোণ তৈরি করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্ভেদ্য দেয়ালের মত (একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের ভাষায় এক অনমনীয় বরফখণ্ডের মত) দাঁড়িয়ে গেল। শত্রুদের অশ্বারোহী সৈন্যরা সে দেয়ালে প্রহত হয়ে ফিরে যেতে লাগল। ফিরিঙ্গী সৈন্য স্ব-স্থান হতে বিচ্যুত না হয়ে আক্রমণকারীদিগকে কেটে টুকরা টুকরা করতে লাগল। আবদুর রহমান নিজেও তাদের হাতে নিহত হলেন। অবশেষে রাত্রির অন্ধকার নেমে এল। শত্রুরা নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেল।
রাত্রি প্রভাতে শত্রু-শিবিরের নিস্তব্ধতা দেখে চার্লস সন্দেহ করলেন যে, শক্ররা কোথাও চুপচাপ ওঁত পেতে বসে আছে। তিনি খোঁজ নিতে গুপ্তচর পাঠিয়ে দিলেন। দেখা গেল, রাত্রির অন্ধকারে আরবরা নিরবে শিবির ত্যাগ করে উধাও হয়ে গেছে। চার্লস জয় লাভ করলেন। পরবর্তীকালের কাহিনী প্রিয় লোকেরা পয়টিয়ার্স বা টুস-এর এই যুদ্ধকে নানা গল্প-গুজবে সজ্জিত করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহুগুণে অতিরঞ্জিত করেছে। খৃস্টানদের পক্ষে এ ছিল তাদের চির-শকদের সামরিক-ভাগ্যে ভাটার শুরু। গিবন ও তার পরবর্তী ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, এই দিন আরবদের জয়লাভ ঘটলে আজ লণ্ডন ও প্যারিসে গীর্জার স্থলে দেখা যেত মসজিদ, আকত্সফোর্ড ও অন্যান্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে বাইবেলের বদলে ব্যাখ্যাত হত কোরআন। কতিপয় আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে টুসের যুদ্ধ এক চরম ভাগ্যনিয়ন্ত্রক ঘটনা।
প্রকৃতপক্ষে, টুসের লড়াই কোন কিছুই চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নাই। আরব-বার্বার তরঙ্গ প্রায় হাজার মাইল দূরস্থ ব্রিাটার হতে যাত্রা শুরু করে এখন এক স্বাভাবিক নিশ্চল অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। এ তরঙ্গ তার গতি হারিয়ে ফেলেছিল; এর শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। বার্বার-আরবের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষ, আভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং পরস্পর হিংসা আবদুল রহমানের সৈন্যদলকে দুর্বল করতে শুরু করেছিল। আরবদের মধ্যেও মনোভাব ও উদ্দেশ্যের ঐক্য ছিল না। একথা সত্য যে, এই দিকে মুসলমানের আক্রমণ রুদ্ধ হল, কিন্তু অন্যান্য দিকে তাদের আক্রমণ চলতেই লাগল। উদাহরণস্বরূপ, ৭৩৪ সালে তারা এভিগ্নন অধিকার করল; এর নয় বছর পর তারা লিয়ন্স লুণ্ঠন করল এবং ৭৫৯ সাল পর্যন্ত তারা নারূবন নিজ দখলেই রাখল। টুরূসের এই পরাজয় যদিও আরবদের গতিরোধের বাস্তবিক কারণ ছিল না, তথাপি বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর আগমনের শেষ সীমারেখা এই পরাজয় দ্বারা নির্ধারিত হল।
৭৩২ খৃস্টাব্দে মহানবীর মৃত্যুর প্রথম শতক। তাঁর অনুগামীরা এখন এক বিপুল সাম্রাজ্যের বিজেতা। এ সাম্রাজ্য বিস্কে উপসাগর হতে সিন্ধু ও চীনের সীমান্ত পর্যন্ত এবং আরল সাগর হতে নীলনদের উপরাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দামেস্ক ছিল এই মহান সাম্রাজ্যের রাজধানী। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল উমাইয়াদের সুরম্য প্রাসাদ। এইখানে দাঁড়ালে নজরে পড়ত শস্য-শ্যামলা সমতলভূমির অপূর্ব বিথার; তার দক্ষিণ সীমা ছিল বরফের পাগড়ী পরিহিত মাউন্ট হারুমন। উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবীয়াই এ প্রাসাদের নির্মাতা ছিলেন। এর সন্নিকটে অবস্থিত ছিল উমাইয়া মসজিদ। খলীফা ওলীদ নতুন করে এ মসজিদকে সুসজ্জিত করেন এবং ভাস্কর্য-শিল্পের সেই অপূর্ব মণিতে পরিণত করেন, যা আজো সৌন্দর্য-পিয়াসীদের আকর্ষণ করে। দর্শন দেওয়ার কামরায় অত্যন্ত দামী কারুকার্যখচিত গালিচায় ঢাকা একটি চতুষ্কোণ চৌকি থাকত। এই-ই ছিল খলীফার সিংহাসন। উৎসব উপলক্ষে দোলায়মান ঝলমল পোশাকে তিনি এই সিংহাসনের উপর আসন করে বসতেন। তার দক্ষিণে তার পিতৃবংশীয়রা নিজ নিজ বয়স অনুযায়ী দাঁড়িয়ে থাকতেন; তাঁর বাম পাশে দাঁড়াতেন তাঁর মাতৃবংশীয়রা। দরবারী, কবি ও দরখাস্তকারীরা দাঁড়াতেন পেছনে। অধিকতর আনুষ্ঠানিক উৎসব সম্পাদিত হত উমাইয়া মসজিদে। উমাইয়া মসজিদ আজো পৃথিবীর মহত্তম উপাসনালয়ের অন্যতম। এমনি একটি উৎসবেই খলীফা ওলীদ নিশ্চয়ই স্পেন বিজয়ী মুসা ও তারিককে তাদের বন্দী ও ঐশ্বর্য-সহ অভ্যর্থনা করেছিলেন। ইসলামের আগমন তার শেষ সীমায় এবং ইসলামের প্রথম শাসক-বংশের গৌরব-মহিমা উচ্চতম শিখরে পৌঁছেছিল।
০৯. সামাজিক ও তামদুনিক জীবনের আরম্ভ
আমরা আমাদের কাহিনীর প্রথম বড় অধ্যায়ের শেষাংশে এসে পৌঁছেছি। ইসলামের বিজয় অভিযান ক্ষান্ত হয়েছে। একথা সত্য যে, সাম্রাজ্যের ভিতর সাম্রাজ্যের মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত অশান্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ চলেছে, তথাপি এখন হতে আমাদের কাহিনীর প্রধান বক্তব্য বিষয় হবে যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-বিজয় ছাড়া অন্য বস্তু ও মুসলিম-সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ভাবের অগ্রগমন, তমদ্দুনের বিকাশ; সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, চারু-শিল্প এবং ভাস্কর্যশিল্পের অভ্যুদয়–আর তলোয়ারের বিজয় যখন খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ভেঙ্গে পড়ে, তখন বিভিন্ন তমদ্দুনের ব্যাখ্যার মারফত কেমন করে মানুষ তার আধ্যাত্মিক বিজয়ের ক্ষেত্রে চলে যায়, তারই প্রাণদায়িনী বিবরণ।
