শহর মুসলমানদের দখরে চলে গেছে, সে খবর তুর্ক সেনাবাহিনীর জানা ছিলো। অই তারা বিজয়ের আশা নিয়ে জীবন-পণ লড়াই করে যাচ্ছিলো। নয়ীম মুসলিম মুজাহিদদের হুকুম দিলেন পাঁচিলের উপরে উঠে তুর্কদের উপর তীরবর্ষণ করতে। শহরের দিক থেকে তীরবর্ষণ তুর্কদের মনে হতাশ সৃষ্টি করলো। পিছনে ফিরে তাদের নযরে পড়লো শহরে মুসলমান তীরন্দায ও উড্ডীয়মান ইসলামী ঝান্ডা।
ওদিকে কুতায়বা এ দৃশ্য দেখে কঠিন হামলার হুকুম দিলেন। খানিক্ষণ আগে মুসলমানদের যে অবস্থা ছিলো, এখন তুর্কদের অবস্থা ঠিক তেমনি। পরাজয়ের সময়ে শহরে মযবুত দেওয়ালের ভিতর আশ্রয় ভরসা ছিলো তাদের, কিন্ত সেদিকেও তখন মৃত্যুর ভয়ানক রূপ পড়ছে তাদের নযরে। যারা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে, তারা দাঁড়িয়ে আছে মুসমানদের প্রস্তর বিদীর্ণকারী তলোয়ারের মুখোমুখি। যারা পিছন দিকে হটছে, তারা ভয় করছে ভয়াবহ তীরবর্ষণের। জান বাঁচাবার জন্য তারা ছুটতে লাগলো ডানে-বায়ে এবং দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অগুণতি সৈনিক গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো খন্দকের মধ্যে।
এ মুসীবত শেষ করে দিয়ে মুসলিম বাহিনী মনোযোগ দিলো পিছন থেকে হামলাকারী ফউজের দিকে। প্রথমেই তারা শহর মুসলমানদের দখলে দেখে হিমমৎ হারিয়ে ফেলেছে। মুসলমানদের হামলার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে বেশির ভাগ পালালো ময়দান ছেড়ে এবং আরও অনেকে হাতিয়ার সমর্পণ করে দিলো।
কুতায়বা বিন মুসলিম ময়দান খালি দেখে এগিয়ে গেলেন। শহরে দরযায় পৌঁছে তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন এবং আল্লার উদ্দেশ্যে সিজদায় অবনমিত হলেন। নয়ীম ভিতর থেকে খন্দকের পুল পেতে দেবার হুকুম দিলেন এবং ওয়াকি ও হারীমকে সাথে নিয়ে এগিয়ে এলেন বাহাদুর সিপাহসালারের অভ্যর্থনার জন্য। কুতায়বা বিন মুসলিমের সাথে সাথে নয়ীমের নামও হয়ে উঠলো আলোচনার বিষয়বস্তু। তার দীলের পুরানো যখম ধীরে ধীরে মিটে গেলো। তার উচ্চ চিন্তাধারা বিজয়ী হলো স্বাভাবিক কামনার উপর। তখন তলোয়ারের ঝংকার তার কাছে প্রেমের কমনীয় সুর ঝংকারের চাইতেও মুগ্ধকর। ভাই ও উমরার খুশী তার কাছে নিজের খুশীর চাইতেও প্রিয়তর হয়ে দেখা দিলো। তার অন্তরের দোআ তখন বেশী করে তাদেরই জন্য উৎসারিত হতে লাগলো।
কোন অবসর মুহূর্তে তিনি যখন খানিকটা চিন্তা করার সুযোগ পান তখনই তার মনে খেয়াল জাগে, হয়তো ভাই উযরাকে বলে দিয়েছেন যে আমি যিন্দাহ রয়েছি। হয়তো এখন তারা আমার সম্পর্কে আলাপ করছেন। উযরার মনে হয়তো সত্যি সত্যি প্রত্যয় জন্মেছে যে, আমি আর কোন নারীকে অন্তরে স্থান দিয়েছি। দীল দিয়ে সে হয়তো আমায় ঘৃণা করছে। হয়তো সে আমায় ভুলেই গেছে। হাঁ, আমায় ভুলে যাওয়াই ভালো তার পক্ষে।
আন্তরিক দো’আ সাথে শেষ হয় এ সব চিন্তার। তিন বছর এমনি করে কেটে গেলো। কুতায়বার সেনাবাহিনী বিজয় ও সৌভাগ্যের ধ্বজা উড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তুর্কিস্তানের চারদিকে। নয়ীম হয়েছেন অসাধারণ খ্যাতির অধিকারী। দরবারে খিলাফতে এক চিঠি লিখে কুতায়বা নয়ীমের সম্পর্কে জানিয়েছেন, এই নওজোয়ানের বিজয়ে আমি নিজের বিজয়ের চাইতেও বেশী গৌরব বোধ করছি।
*
হিজরী ৯১ সালে তুর্কিস্তানের অনেকগুলো রাজ্যে ধুমায়িত হয়ে উঠলো বিদ্রোহের লেলিহান অগ্নিশিখা। এই আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে দূর থেকে তামাশা দেখছিলো সেই ইবনে সাদেক। নয়ীম মুক্তি পেয়ে যাবার পর প্রাণের ভয় হয়ে উঠেছে ইবনে সাদেকের নিত্যসহচর। সে পালিয়ে এসেছে কেল্লা ছেড়ে। পথে বদনসীব ভাতিজীর সাথে দেখা হলে সে দুবৃত্ত চাচার হাতে কয়েদ হবার চাইতে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
জানের ভয় ইবনে সাদেকে পেয়ে বসেছে। সে তার অনুচরদের সাথে নিয়ে চললো তুর্কিস্তানের দিকে। সেখানে পৌঁছে সে তার বিচ্ছিন্ন দলকে সংহত করতে শুরু করলো এবং কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে তুর্কিস্তানের পরাজিত শাহযাদাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে এক চুড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি চালাতে লাগলো।
তুর্কিস্তানের গণ্যমান্য লোকদের মধ্যে একজন ছিলো নাযযাক। ইবনে সাদেক তার সাথে দেখা করে প্রকাশ করলো তার ধারণা। আগে থেকেই নাযযাক বিদ্রোহ ছড়াবার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো। তার প্রয়োজন ছিলো ইবনে সাদেকের মত মন্ত্রনাদাতার। স্বভাবের দিক দিয়ে দু’জন ছিলো অভিন্ন। ন্যযাক চাইতো তুর্কিস্তানের বাদশাহ হতে, আর ইবনে সাদেকের আকাংখা ছিলো শুধু তুর্কিস্তানের নয়, বরং তামাম ইসলামী দুনিয়ার তার নামের খ্যাতি ছড়িয়ে দেওয়া। নযযাক ওয়াদা করলো যে, তুর্কিস্তানের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারলে সে ইবনে সাদেককে বানাবে তার উযিরে আযম। ইবনে সাদেক তাকে দিলো সাফল্যের আশ্বাস।
তুর্কিস্তানের লোকদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো কুতায়বার নামে। বিদ্রোহের কথা শুনলে তারা ঘাবড়ে যেতো, কিন্ত ইবনে সাদেকের দুষ্ট পরামর্শ তাদের কাছে নিষ্ফল হলো না। যার কাছেই সে যায়, তাকে বলে, তোমাদের রাজ্য তোমাদেরই জন্য। অপর কারুর কোনো অধিকার নেই তার উপর। আকলমন্দ লোক অপরের হুকুমাত মেনে নিতে পারে না। ইবনে সাদেক ও নযকের চেষ্টায় তুর্কিস্তানের বহুসংখ্যক বিশিষ্ট শাহযাদা ও সরদার এসে জমা হলো এক পুরানো কেল্লায়। এই জনসমাবেশে নাযযাক এক লম্বা চওড়া বক্তৃতা করলো। নাযযাকের বক্তৃতার পর চললো দীর্ঘ বিতর্ক। কয়েকজন বৃদ্ধ সরদার মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ হুকুমাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা তোলার বিরোধিতা করলেন। অবস্থা নাযুক দেখে ইবনে সাদেক কি যেন বললো নায়কের কানে।
