জেনারেল ইউ. এস. গ্র্যান্টকে তার বিজয় গর্বের মুহূর্তে গ্রেপ্তার করা হলো কেন? বেশির ভাগ কারণ হলো তিনি তার অহঙ্কারী ওপরওয়ালাদের ঈর্ষার শিকার হন বলেই।
আমরা যদি অন্যায় সমালোচনার ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার ফাঁদে পা রাখতে যাই তাহলে নিচের কার্যকর নিয়মটা মেনে চলা উচিত :
মনে রাখবেন অন্যায় সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রেই আড়াল করা প্রশংসাই। মনে রাখবেন মরা কুকুরকে কেউ লাথি মারে না।
২১. সমালোচনা আপনাকে স্পর্শ করবে না
আমি একবার মেজর জেনারেল স্মেডলি বাটলারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। নানা বিশেষণেই তিনি ভূষিত হন। তাঁর কথা শুনেছেন তো? তিনি ছিলেন আমেরিকার নৌবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে খ্যাতনামা আর আঁকজমকপূর্ণ সেনাপতি।
তিনি আমায় বলেছিলেন যে তাঁর যখন বয়স কম ছিলো খুব জনপ্রিয় হবার দারুণ চেষ্টা করতেন আর প্রত্যেকের উপর প্রভাব বিস্তারের আগ্রহ পোষণ করতেন। তখনকার দিনে সামান্য সমালোচনাও আঘাত লাগতো আর হুল ফোঁটাতে চাইতো। তবে তিনি স্বীকার করেন যে নৌবাহিনীতে ত্রিশ বছর কাটানোর ফলে তার চামড়া বেশ পুরু হয়ে উঠেছিলো। তিনি বলেছিলেন, আমাকে অপমান করে, নিন্দা করা হয়েছিলো আর হলদে কুকুর, সাপ এবং অন্যান্য জানোয়ারের সঙ্গে তুলনাও করা হয়। বিশেষজ্ঞরা আমায় নিন্দা করেন। ইংরাজী ভাষায় যতরকম ছাপার অযোগ্য খারাপ কথা আছে সবই আমায় বলা হয়। এতে আমি ভাবনায় পড়ি ভাবছেন? ফুঃ! এখন কেউ আমাকে গাল দিতে চাইলেও আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখি না কে কথাটা বলছে।
তীক্ষ্ম–দৃষ্টিসম্পন্ন বাটলার হয়তো সমালোচনা গ্রাহ্য করতেন না, তবে একটা কথা নিশ্চিত, আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই ছোটোখাটো মন্তব্য আর ব্যঙ্গ বিদ্রুপে বড় বেশি রকম বিচলিত বোধ করি । আমার বেশ ক’ বছর আগেকার কথাটা মনে পড়ছে, যখন নিউ ইয়র্ক সানের একজন রিপোর্টার আমার বয়স্ক শিক্ষার ক্লাসে এসে সব দেখে কাগজে ব্যঙ্গ করে জঘন্য সব কথা লেখেন। আমি কি ক্ষেপে গিয়েছিলাম? আমি ব্যাপারটাকে ব্যক্তিগত অপমান বলেই ভেবেছিলাম। আমি টেলিফোন করে সানের কার্যকরী কমিটির চেয়ারম্যান গিল হাজেসকে প্রায় দাবী জানাই তিনি যেন সব ঘটনার বর্ণনা দিয়ে একটা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন–আর মস্করা না করেন। আমি মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি এই অপরাধের উপযুক্ত শাস্তিদান করবোই।
আজ অবশ্য আমি আমার সেদিনের কাজের জন্য লজ্জাবোধ করি। এখন বুঝতে পারি ওই কাগজ যারা কেনে তারা ওই প্রবন্ধটা হয়তো চোখেই দেখেনি। যারা কাগজ পড়েছে তাদেরও অর্ধেক বোধহয় ব্যাপারটাকে নিছক আমোদ বলেই ভেবেছিলেন। আবার যে অর্ধেক সেটা পড়ে হেসে মজা পান তারাও আবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা ভুলেও যান।
এখন বুঝতে পারি মানুষ আমার বা আপনার সম্বন্ধে ভাবে না বা সেটা গ্রাহ্য করে না। তারা কেবল নিজেদের কথাটাই ভেবে চলে–প্রাতরাশের আগে, প্রাতরাশের পরে, বা মাঝরাতের দশ মিনিট আগে বা ঠিক পরেও। আমার বা আপনার মৃত্যুর খবরের চেয়েও তাদের প্রায় হাজার গুণ বেশি ভাবনা নিজেদের সামান্য মাথা ব্যথা নিয়ে।
যদি আপনার বা আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা ছড়ানো হয়, ঠাট্টা করা হয় ঠকানো হয়, অথবা পিঠে ছুরি মারা হয়, হয়তো বা আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রতি ছ’জনের মধ্যে একজন যদি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে–তাহলেও যেন আমরা আত্মধিক্কারে অস্থির হয়ে না পড়ি। তার বদলে আসন আমরা মনে মনে যীশু খ্রীষ্টের কথাই ভাবি–কারণ তার ভাগ্যে ঠিক এমনটাই ঘটেছিলো। তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের মধ্যে একজন সামান্য টাকার বিনিময়ে–আজকের টাকার হিসেবে মাত্র উনিশ ডলারের ঘষ নিয়ে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তার বারোজন বন্ধুর মধ্যে একজন, যীশু বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ত্যাগ করে তিনবার বলে দেয় সে যীশুকে চেনে না–কথাটা সে শপথ নিয়ে বলে । ঠিক ছ’জনের মধ্যে একজন। ঠিক এই রকম ঘটে যায় যীশুর জীবনেও। আমি বা আপনি এরচেয়ে আর ভালো আশা করি কেমন করে?
বেশ কয়েক বছর আগেই আমি আবিষ্কার করি যে মানুষের অন্যায়ভাবে আমাকে সমালোচনা করা বন্ধ করতে পারি না বটে–তবে একটা ব্যাপার অবশ্যই বন্ধ করতে পারি, তাহলে অন্যায় সমালোচনা শুনে দুশ্চিন্তা করা। আমি নিশ্চিয়ই ঠিক করতে পারি অন্যায় এই নিন্দাবাদে আমি চিন্তায় পড়বো কিনা।
ব্যাপারটা পরিষ্কার করেই বলি। আমি এর মধ্য দিয়ে সবরকম সমালোচনা আগ্ৰহ্য করার কথা বলছি । একেবারেই না। আমি শুধু অন্যায় সমালোচনা অগ্রাহ্য করতে বলছি। আমি একবার এলিনর রুজভেল্টের কাছে জানতে চেয়েছিলাম অন্যায় সমালোচনার তিনি কীভাবে মোকাবিলা করেন। আর ঈশ্বর জানেন এমন জিনিস তাকে কত সহ্য করতে হতো। হোয়াইট হাউসে যত মহিলা বাস করেছেন তার মধ্যে তারই বোধ হয় সবার চেয়ে বেশি বন্ধু আর সাংঘাতিক রকম শত্রু ছিল।
তিনি আমায় বলেন অল্পবয়সে তিনি সাংঘাতিক লাজুক মেয়ে ছিলেন। তাঁর খালি ভয় হতো লোকে কি বলবে । সমালোচনা সম্বন্ধে তার এমনই ভয় ছিলো যে একদিন তিনি তাঁর কাকিমা, থিয়োডোর রুজভেল্টের বোনের কাছে এব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। তিনি যা জানতে চেয়েছিলেন সেটা এই রকম : কাকিমা, আমি যা কাজ করতে যাই খালি ভয় হয় লোকে কী বলবে।
