এ ধরনের কথায় কত তফাৎ ঘটে যায়। এর ফলে ছেলেরা সহযোগিতা করতে চায়। কোন বিরক্তি বা অসহিষ্ণুতা তাদের মধ্যে থাকে না। তাদের হুকুম করে বন্ধ করতে হয় না। কারণ তারা তাদের মুখ রক্ষা করতে পেরেছে। এতে তাদের মন ভালো থাকে, আমিও সেরকম থাকি কারণ আমি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা দেখতে চেয়ে অবস্থাটা সামাল দিয়েছি।
.
এর পরের বার কাউকে ওই আগুন নেভানোর কথা বলার বা অন্য কাজ করানোর আগে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা একটু চোখ বন্ধ করে দেখে নিন। এটা করলেই ভালো নয় কি? নিজেকে প্রশ্ন করুন : ‘লোকটি একাজ করতে চায় কেন?’ এটা সত্যি যে এতে সময় লাগবে। তবে তাতে নতুন বন্ধু পাবেন আর ঝগড়া রেষারেষির বদলে ভালো ফলও লাভ হবে। এতে জুতোর তলাও ক্ষয় হবে কম।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ডীন, ডনহ্যাস বলেছিলেন : কারও অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার আগে অফিসের সামনের রাস্তায় দুঘন্টা পায়চারী করতে চাই, কিন্তু কোনো পরিষ্কার ধারণা না নিয়ে ঢুকতে চাই না। যেমন আমি কি বলবো তারই বা উত্তর কি হবে। যার কাছে যাবো তার দৃষ্টিভঙ্গী জেনে রাখাই শ্রেয়।
কথাটা এতই দামী যে বারবার সেটা মনে রাখা দরকার।
এই বইটি পড়ার পর যদি সর্বদা সবকিছু অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অভ্যাস জন্মায় তাহলে এটা নিঃসন্দেহ যে আপনার জীবনে এটা হয়ে উঠবে একটা দি দর্শন আর সুন্দর কোন অভিজ্ঞতা।
তাই অন্যের বিরক্তি না জাগিয়ে মানুষকে যদি পরিবর্তন করতে চান তাহলে ৮ নম্বর নিয়ম হল : ‘আন্তরিকভাবে অপরের দৃষ্টিকোণ থেকেই সব কিছু দেখার চেষ্টা করুন।’
১৮. যা সবাই আশা করে
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
যা সবাই আশা করে
আপনি কি এমন মন্ত্র জানতে চান না যাতে সব রকম তর্কাতর্কি বন্ধ হয়, শত্রুতা দূর হয়ে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে; আর অপর ব্যক্তি বেশ মনোযোগ দিয়ে আপনার সব কথা শোনে?
হ্যাঁ বলছেন তো? বেশ তাহলে ঠিক আছে। এবার এইভাবে শুরু করুন : ‘আপনার এরকম মনোভাবের জন্য আপনাকে কণামাত্রও দোষারোপ করছি না! আপনার জায়গায় আমি থাকলে একই রকম ভাবতাম।’
এ ধরনের উত্তর পেলে সবচেয়ে খিটখিটে বা খুঁতখুঁতে মানুষও বশ মানবে। আপনি যদি শতকরা একশ ভাগ আন্তরিকতা নিয়ে এটা বলেন যে তার জায়গায় থাকলে আপনার মনোভাবও একই রকম হতো সেটা সম্পূর্ণ সত্যিই হতো। বুঝিয়ে বলি ব্যাপারটা। অল ক্যাপোনের কথাটাই ধরুন। অল ক্যাপোনের মতই যদি আপনার শরীর, মেজাজ আর মন হতো, আর ধরুন তারই মতো পারিপার্শ্বিকতা আর অভিজ্ঞতাও আপনি পেয়েছেন। তাহলে আপনি ঠিক তারই মত হয়ে যেতেন–তারই মত সেখানে থাকতেন কারণ এই সব জিনিসই তাকে অল ক্যাপোন করে তুলতে পারে।
আপনি যে কোন ঝুমঝুমি বা র্যাটল সাপ নন তার একমাত্র কারণ হলো আপনার বাবা মা ঝুমঝুমি সাপ নন।
আপনি যা তার জন্য খুব বেশি কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না। আর মনে রাখবেন, যে লোক বিবেচনাহীন হয়ে আপনার কাছে আসতে পারে তার জন্যেও তার দোষ বেশি নয়। এমন কোন বেচারির জন্য দুঃখ বোধ করাই উচিত। তাকে সহৃদয়তা দেখানো দরকার। জন বি গাও রাস্তা দিয়ে কোন মাতালকে টলমলে অবস্থায় দেখলে বলতেন : ‘ওই দেখুন এক মাতাল, ইশ্বরের অসীম করুণাতেই আমি ওই রকম হইনি।‘
আগামীকালই যেসব লোকের মুখোমুখি হবেন তারা চারভাগের তিনভাগেই করুণা আর সমবেদনার প্রত্যাশী। তাদের যদি সেটা দেন তাহলে তারা আপনাকে ভালোবাসবে। আমি একবার লিটল উইমেনের লেখিকা লুইস মে অ্যালকট সম্পর্কে বেতারে একটা ভাষণ দিয়েছিলাম। স্বভাবতই আমি জানতাম তিনি ম্যাসাচুসেটসের কনকর্ডে বাস করা কালীন তার বিখ্যাত বইটি লেখেন। কিন্তু কি বলছি না ভেবেই বলে ফেলেছিলাম, আমি তার আদি বাড়ি নিউ হ্যাঁম্পশায়ারের কনকর্ডে গিয়েছিলাম। নিউ হ্যাঁম্পশায়ার কথাটা যদি একবার মাত্র বলতাম তাহলে মনে করার কারণ থাকত না। কিন্তু আমার দূর্ভাগ্য, আমি দুবারই সেটা বলেছিলাম। এরপরেই রাশি রাশি চিঠি আর টেলিগ্রাফ আসতে লাগলো। তার মধ্যে দারুণ জ্বালা ধরানো বাক্যবাণও ছিল। এসব পেয়ে আমার মাথা প্রায় ভন ভন করতে লাগল, যেন হাজারো মৌমাছির দংশন জ্বালা। কেউ কেউ আবার ব্যঙ্গ করেছে, কেউ বা অপমান।
একজন মহিলা যিনি কনকর্ডে ম্যাসাচুসেটসে জন্মেছিলেন, তখন তিনি ফিলাডেলফিয়ায় থাকতেন, আমার উপর তার মনের সব রাগ উজাড় করে দিয়েছিলেন। আমি যদি মিস অ্যালকটকে নিউ গিনির নরখাদিকা বলতাম তাহলেও বোধহয় তাঁর তত রাগ হতো না। তাঁর চিঠিটা পড়তে পড়তে তাই ভেবেছিলাম ভাগ্যিস এমন মহিলা আমার স্ত্রী নন। আমার ইচ্ছে হয়েছিল মহিলাকে লিখে জানাবো যে ভূগোলের জ্ঞান আমার না থাকতে পারে, তবে তার সাধারণ ভদ্রতাবোধটুকুও নেই। এই ভাবেই শুরু করব ভেবেছিলাম। তারপর জামার হাতা গুটিয়ে তার সম্পর্কে কি ভেবেছি সেটা লিখব স্থির করলাম। তবে সেটা করিনি, আমি নিজেকে সংযত করলাম। আমি বুঝলাম, যে কোন মাথা গরম বোকাই এমন করতে পারে–আর বেশির ভাগ বোকাই তা করবে।
আমি তাই বোকাঁদের উপরে থাকব মনস্থ করলাম। তাই মহিলার শত্রুতা বোধকে দূর করে তার সাথে বন্ধুত্ব অর্জন করব ঠিক করলাম। এটা একটা চ্যালেঞ্জের মতই, একরম খেলতে আমার খুবই ভাল লাগে। নিজেকে তাই বললাম : ‘তার জায়গায় থাকলে আমিও বোধহয় একই আচরণ করতাম। তাই তার মনোভাবের সঙ্গে একাত্ম হতে চাইলাম। এরপর যখন ফিলাডেলফিয়ার গেলাম আমি তাকে টেলিফোনে ডাকলাম। কথাবার্তাটা আমাদের মধ্যে অনেকটা এই রকম হয় :
