‘স্যাণ্ডি’ এসে পৌঁছতেই দালাল বললেন, ‘স্যাণ্ডি’ আপনি অত্যন্ত ধুরন্ধর ক্রেতা। গাড়ির দাম সম্বন্ধে আপনার ধারণা দারুণ। এই গাড়িটা একটু দেখে বলবেন এটা বিক্রি করতে গেলে কত দাম হওয়া উচিত?
‘স্যাণ্ডির’ মুখে একগাল হাসি জাগলো। শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতা সম্বন্ধে আগ্রহ জাগছে আর দাম দেওয়া হচ্ছে। তিনি গাড়িটা চালিয়ে কুইন কুলেভার্ড থেকে ঘুরে এলেন। তারপর বললেন, গাড়িটা তিনশয় বিক্রি করলে যথেষ্ট লাভ হয়েছে ভাবতে পারেন।’
‘এ দামে দিলে আপনি গাড়িটা কিনবেন?’ দালাল জানতে চাইলেন। তিনশ! নিশ্চয়ই। এটাই তো তিনি চান। অতএব বিক্রির কাজ সমাধা হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই।
ঠিক সেই একই মানসিকতা ব্যবহার করেছিলেন এক রঞ্জন-রশ্মি প্রস্তুতকারক তার জিনিস ব্রুকলীনের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে বিক্রি করার জন্য। এই হাসপাতালটি আমেরিকায় সবচেয়ে ভালো রঞ্জন-রশ্মি বিভাগ করতে চেয়েছিল। ডঃ এল–যিনি রঞ্জন-রশি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি সেলসম্যানদের অত্যাচারে পাগল হতে চলেছিলেন। তারা সবাই নিজেদের জিনিসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল।
একজন প্রস্তুতকারক ছিল বেশ কৌশলী। সে মানব চরিত্র সম্বন্ধে বেশ ভালো রকম ওয়াকিবহাল ছিল। সে এই রকম একটা চিঠি লিখেছিল :
‘আমাদের কারখানা সম্প্রতি এক নতুন ধরনের এক্স-রে যন্ত্র বানিয়েছে। এই মেশিনের প্রথম চালান সবে মাত্র আমাদের অফিসে এসে পৌঁচেছে। সেগুলি সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। আমরা সেটা জানি বলেই যন্ত্রগুলোর উন্নতি সাধন করতে চাই। আমরা অত্যন্ত বাধিত হব যদি আপনারা সময় করে এগুলো একটু পরীক্ষা করে আপনদের মতামত জানান যাতে আমরা আরও বেশি করে আপনাদের সেবা করতে পারি। আপনারা অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন জেনেই সময় জানালে আমাদের গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারি।‘
‘ওই চিঠিটা পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে যাই,’ ডঃ এল–ঘটনার কথা আমার ক্লাসে বর্ণনা করার সময় বলেন। আমি আশ্চর্য আর নিজেকে সম্মানিত বোধ করি। কোন রঞ্জন-রশ্মি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আগে কখনও আমার মতামত চায়নি। এত নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। ওই সপ্তাহের প্রতিটি রাতে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও একটা ডিনার বাতিল করে দিলাম ওই যন্ত্রটা দেখার জন্য। যতই সেটা দেখলাম ততই আবিষ্কার করলাম যন্ত্রটা আমার দারুণ ভালো লেগেছে।
কেউ ওটা আমায় বিক্রির চেষ্টা করেনি। দেখলাম হাসপাতালের জন্য যন্ত্রটা কেনা সম্পূর্ণ আমারই মর্জি। যন্ত্রটার চমৎকার গুণাগুণের জন্যই আমি ওটার অর্ডার দিয়ে বসানোর ব্যবস্থা করলাম।
উড্রো উইলসন যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে আসীন তখন কর্ণেল এডোয়ার্ড এম. হাউস জাতীয় আর আন্তর্জাতিক ব্যাপারে প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। উইলসন কর্ণেল হাউসের উপর গোপন পরামর্শের জন্য দারুণ নির্ভর করতেন যা তিনি তাঁর ক্যাবিনেটের অন্যান্য সদস্যদের উপর করতেন না।
কর্ণেল প্রেসিডেন্টের উপর প্রভাব ফেলার জন্য কি পথ ধরেছিলেন? সৌভাগ্যবশতঃ আমি সেটা জানতে পেরেছি। যেহেতু হাউস নিজেই সেকথা আর্থার ডি. হাউডেন স্মিথকে বলেন আর স্মিথ সেটা হাউসের নাম করে দি স্যাটারডে ইভনিং পোস্টে একটা প্রবন্ধ লেখেন।
হাউস যা বলেছিলেন তা এই রকম।
.
‘আমি প্রেসিডেন্টকে ভালো করে জানার পর বুঝলাম তাকে নিজের মতে আনার সবার সেরা উপায় হলো তার মনে কোন একটা ধারণা বদ্ধমূল করে দেয়া আর সেটা কথায় কথায় হালকা ভাবেই দিতে হবে। এমনভাবে তা করতে হবে যাতে তার মনে সেটা ভাববার সুযোগ থাকে। প্রথমবার একটা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়েই সেটা ঘটে গেল। আমি হোয়াইট হাউসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে একটা পরামর্শ দিতে সেটা তিনি বাতিল করে দিলেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন পরে ডিনার টেবিলে আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তিনি সেটা বেমালুম নিজের বলে চালিয়ে দিলেন।
হাউস কি বাধা দিয়ে বলেছিলেন, কখনও না, এটা আপনার কথা নয়, এটা আমার? ওহ্ না। হাউস সে রকম করার মানুষ নন। তিনি ঢের বেশি কৌশলী। তিনি প্রশংসার জন্য লালায়িত ছিলেন না, তিনি চাইতেন ফল। তাই তিনি উইলসনকে ভাবতে দিলেন মতলবটা তাঁরই। অবশ্য হাউস আরও বেশি কিছু করলেন। তিনি সকলের সামনে উইলসনকে ধারণাটার জন্য দারুণ প্রশংসা করলেন।
মনে রাখি আসুন যে আগামীকালই যার সঙ্গে কাজ করতে যাবো সেও ঠিক উড্রো উইলসনের মতই মানুষ। অতএব আসুন কর্ণেল হাউসের মতই কৌশলকে কাজে লাগাই।
নিউ ব্রানসউইকের একজন লোক ক’বছর আগে এই কৌশলটা আমার উপর কাজে লাগায় আর আমার সমর্থনও লাভ করে। আমি তখন নিউ ব্রানসউইকে মাছ ধরতে আর নৌকাবিহার করার মতলব করছিলাম। তাই ট্যুরিষ্ট ব্যুরোর খবর চেয়ে পাঠালাম। আমার নাম ঠিকানা ওদের তালিকায় ওঠার ফলে প্রায় কদিনের মধ্যে শ’য়ে শ’য়ে কাগজ চিঠি এবং নানা রকম শিবিরে থাকার ব্যবস্থার খবর আসতে লাগল। আমি বিহ্বল হয়ে পড়লাম, কোন্টা পছন্দ করব বুঝতে পারলাম না। এবার এক শিবিরের মালিক ভারি বুদ্ধির একটা কাজ করল। সে আমায় একটা চিঠি দিয়ে নিউ ইয়র্কের কিছু লোকের নাম, ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর পাঠিয়ে বলল তাদের সে সেবা করেছে। সেটা কেমন আমিই জেনে নিতে পারি।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম ওই তালিকার একজন আমার পরিচিত। আমি তাঁকে টেলিফোন করলাম আর তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরে শিবিরে ফোন করে আমার খাওয়ার দিন জানিয়ে দিলাম।
