প্রতিকার কী? বক্তৃতার শেষ টুকু অর্থাৎ সমাপ্তি বা উপসংহার পরিকল্পিত হওয়া উচিৎ নয় কি? যখন আপনি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বলছেন তখন বিষয়টি যাতে শ্রোতামনে দাগকাটে, শ্রোতাদের প্রভাবিত করে সেদিকে আপনার লক্ষ্য রাখা উচিৎ নয় কি? তা কী সুস্পষ্টভাবে শান্ত ভাবে বলার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা প্রয়োজন নয়?
ওয়েবেস্টার, ব্রাইট গ্লাড-স্টোনের মতো খ্যাতনামা বক্তারা, ভাষার ওপর যাদের দখল ছিল প্রশ্নাতীত তারাও বক্তৃতা লিখে নিতেন এবং উপসংহারে ব্যবহার্য শব্দগুলো মুখস্থ করে নিতেন।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা এপথ অনুসরণ করলে ভুল করবেন। তাকে মুখস্থ রাখতে হবে তিনি কী বলতে চান তা সম্পূর্ণরূপে। সমাপ্তি অর্থাৎ উপসংহার তাকে বার-বার পুনরাবৃত্তি করতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে, তবে প্রতিবারে একই শব্দ ব্যবহার না করলেও চলবে। কিন্তু চিন্তা ভাব ও ভাষা একই রাখতে হবে? মৌখিক বক্তৃতা করা কালে শ্রোতাদের মনোযোগ, মতিগতি, লক্ষ্য করে অনেক সময় পরিবর্তন করতে হয়, পরিবর্ধন করতে হয়। কখনো-কখনো বক্তব্যকে, ভাষাকে কঠিন করে প্রকাশ করতে হয়, কখনো বা হাস্যকৌতুক যোগ করতে হয়। সুতরাং যে কোনো বক্তৃতার দুটি বা তিনটি সমাপ্তি বা উপসংহার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। শ্রোতাদের আস্থা অর্থাৎ মনোযোগ ও মতি গতির সাথে সঙ্গতি পূর্ণ উপসংহার তাহলেই পেশ করা সম্ভব।
কিছু বক্তা কখনো উপসংহারে পৌঁছেন না? বক্তৃতার মাঝ পথেই তারা থেমে যান, শেষ করে ফেলেন। এই ধরনের বক্তার জন্যে অধিকতর প্রস্তুতি বার-বার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে শিখে নেয়া, প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রস্তুতি না নিলে তাদের পক্ষে বক্তৃতা শেষ করা সম্ভব নয়।
অনেক শিক্ষানবিশ বক্তৃতাকালে অপ্রত্যাশিতভাবে বক্তব্য শেষ করে ফেলেন। তাদের সমাপ্তির পদ্ধতি বিধিনিয়মের আওতাভুক্ত নয়, সুন্দর নয়। সত্যিকথা বলতে গেলে তাদের বক্তৃতায় কোনোরূপ সমাপ্তি বা উপসংহার নেই, যা আছে তা হচ্ছে অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি। সুতরাং এইরূপ বক্তব্যের ফল কল্যাণকর হয় না। এটা একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে কোনো একজন বন্ধু কর্তৃক বিদায় জানিয়ে, স্বাগতিককে না বলে বিদায় নেয়ার মতো।
লিংকনের মতো বক্তাও তাঁর উদ্বোধনী বক্তৃতার প্রথম খসড়ায় এই ধরনের ভুল করেছিলেন। এই উদ্বোধনী বক্তৃতা তিনি করেছিলেন এক উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে। সারাদেশে তখন বইছিল ঘৃণার ঝড়। এই ঝড়ে আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই দেশে রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। লিংকন দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের উদ্দেশ্যে উপসংহারে যা বলতে চেয়েছিলেন, মূল খসড়ায় তা ছিল নিম্নরূপ:
হে আমার অসন্তুষ্ট দেশবাসী, আপনাদের মনে দেখা দিয়েছে গৃহযুদ্ধের প্রশ্ন। সরকার আপনাদের প্রতিরোধ করবেন না। আপনারা আগ্রাসনকারী না হলে কোনোরূপ সংঘর্ষের সৃষ্টি করতে পারবেন না। আপনারা সরকারকে ধ্বংস করার কোনোরূপ আনুষ্ঠানিক প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন নি, কিন্তু আমি সরকারকে রক্ষা করার আনুষ্ঠানিক প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছি। আপনারা এই আক্রমণ হতে বিরত থাকতে পারেন। কিন্তু আমি প্রতিরোধ হতে বিরত থাকতে পারি না। আপনাদের জন্য, আমার জন্য নয়, বড় প্রশ্ন হচ্ছে ”শান্তি অথবা যুদ্ধ?”
তিনি এটি তাঁর সচিব মি. সুয়ার্ডকে দেখতে দেন। সুয়ার্ড অত্যন্ত সঠিক ভাবে দেখান যে, এর সমাপ্তি হয়েছে অত্যন্ত সুলবুদ্ধি সঙ্গতি, অপ্রত্যাশিত এবং প্ররোচনামুলক। সুতরাং এর স্থলে তিনি দুটি সমাপ্তি বা উপসংহার তৈরি করেন। তার একটি লিংকন সামান্য সংশোধনীসহ গ্রহণ করেন। শেষ তিনটি বাক্যের পরিবর্তেই এটি ব্যবহার করা হয়। ফলে তাঁর মূল বক্তব্যে যে প্ররোচনা ছিল স্কুলবুদ্ধির লক্ষণ ছিল তা বিদূরিত হয়। তদস্থলে বন্ধুত্বপুর্ণ মনোভাব প্রকাশ পায়। সংশোধনীটি ছিল এই :
আমরা শত্রু নই, বরঞ্চ বন্ধু। আমরা একে অপরের শত্রু হব না। বাধা আসলেও তা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। ভুলবুঝাবুঝি হলেও এমন একদিন আসবে যখন সকলেই একই সুরে একই সাথে ইউনিয়নের জয়গান গাইবে, স্মরণ করবে তাদের যারা আত্মাহুতি দিয়েছে দেশের জন্য, জাতির জন্য, যেসব দেশপ্রেমিক শায়িত রয়েছে কবরগাহে। স্মরণ করবে তাদের যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে আর চিরশায়িত রয়েছে শুশানে।
একজন শিক্ষানবিশ কীভাবে তাঁর বক্তব্যের উপসংহার তৈরি করতে পারেন। এটা কি যান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী করা সম্ভব?
না। সংস্কৃতির মতো এটিও অত্যন্ত সূক্ষ্ণ ব্যাপার। সুতরাং এটা উপলব্ধি করতে হবে অনুভূতি দিয়ে। বক্তা যদি বুঝতে না পারেন যে তার বক্তব্য দক্ষতার সাথে শেষ করা উচিত, তখন কীভাবে তিনি তা করবেন?
তবে এই অবস্থাটা অভ্যাসের মাধ্যমে প্রচেষ্টার মাধ্যমে আয়ত্ত্ব করা যায়। তা করতে হলে খ্যাতনামা বক্তাগণ যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তা অনুসরণ করতে হবে। টরেন্টের এম্পায়ার ক্লাবে তদানিন্তন প্রিন্স
অব ওয়েলস যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন এক্ষেত্রে তাই উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করছিঃ
ভদ্র মহোদয়গণ আমার মনে হয় আমি মূল বিষয় হতে সরে গিয়ে নিজের সম্পর্কেই বেশি বলে ফেলছি। তবে আমি আপনাদের বলতে চাই যে, কানাডায় বৃহত্তম জনসমাবেশে বক্তৃতা করার আমি যে সুযোগ পেয়েছি সে সুযোগে আমি মনে কী অনুভব করছি এবং আমার দায়িত্ব সম্পর্কে কী ভাবছি। আমি আপনাদের নিশ্চিত আশ্বাস দিতে পারি যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি এবং আপনাদের বিশ্বাসে কোনোরূপ আঘাত হানছি না।
