৬। হাসিমুখে মঞ্চে যান। শ্রোতারা যেন আপনার দিকে তাকিয়ে এটা উপলব্ধি করে যে, আপনি মঞ্চে গিয়ে অত্যন্ত উফুল্ল হয়েছেন। ”পছন্দ পছন্দ আনে”, বলেছেন অধ্যাপক ওভার স্টিট। ”আমরা যদি আমাদের শ্রোতাদের প্রতি আগ্রহী হই, শ্রোতারাও আমাদের প্রতি আগ্রহী হবেন। বক্তৃতা করার আগেই অনেক সময় আমরা অভিনন্দিত বা নিন্দিত হই। সুতরাং আমরা বক্তৃতা করে শ্রোতাদের সন্তুষ্ট করতে চাই এরূপ মনোভাবই প্রকাশ করতে হবে।”
৭। শ্রোতাদের একত্রিত করুন। বিচ্ছিন্ন ভাবে বসা শ্রোতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সহজতর নয়। বিচ্ছিন্নভাবে বসা যে কোনো শ্রোতা আপনার বক্তৃতা শুনে হাসতে পারে, বা নিন্দা করতে পারে বা অন্যমনস্ক হতে পারে, কিন্তু সকলে একত্রিত হয়ে বসলে বক্তৃতা না শুনে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা জুড়ে দিয়ে অন্যদের অসুবিধা করার অবকাশ থাকে না।
৮। যদি শ্রোতার সংখ্যা কম হয় তা হলে তাদের নিয়ে এক ক্ষুদ্র কক্ষে বসুন। মঞ্চে উঠবেন না, শ্রোতাদের সাথে নিয়ে বসুন। আপনার বক্তৃতা শুরু করুন সাধারণ কথোপকথনের নিয়মে, সাধারণ আলোচনার মতো করে।
৯। মুক্ত বায়ু চলাচল করতে দিন।
১০। হলকে আলোকিত করুন। আলোর বন্যা বইয়ে দিন। এমনভাবে দাঁড়ান যাতে আপনার মুখে আলো পড়ে এবং আপনাকে ভালোভাবে শ্রোতারা দেখতে পায়।
১১। আসবাবপত্রের পেছনে দাঁড়াবেন না। চেয়ার টেবিলকে মঞ্চের দিকে পাশে রাখুন। এমন ভাবে দাঁড়ান শ্রোতারা আপনাকে সম্পূর্ণরূপে দেখতে পায়।
১২। মঞ্চে কোনো অতিথি রাখবেন না, রাখলে নড়াচড়া করবে এবং নড়াচড়া করলে তাদের প্রতিই শ্রোতাদের দৃষ্টি পতিত হবে। কোনো শ্রোতাই কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বা পা, নড়তে দেখলে তার প্রতি তাকিয়ে পারবেন না। ফলে আপনার বক্তৃতার প্রতি শ্রোতাদের মনোযোগ থাকবে না।
০৮. কীভাবে বক্তৃতা শুরু করবেন
আমি একদা নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “বক্তা হিসাবে আপনার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা আছে। সুতরাং বলুন, বক্তৃতার সফলতা অর্জনের মূল রহস্য কী?” এক মিনিট নীরব থেকে তিনি উত্তর দিলেন, আকর্ষণীয় ভাষায় বক্তৃতা শুরু, যা শ্রোতাদের দৃষ্টি এবং মনকে টেনে আনে। তিনি বক্তৃতা প্রস্তুতিতে বক্তৃতা শুরু এবং শেষের বাক্য ও শব্দ এমনভাবে চয়ন করতেন যা হত অত্যন্ত আকর্ষণীয়। জন ব্রাইট একই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। একই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন গ্লাডস্টোন, ওয়েবেস্টার, লিংকন। বস্তুত পক্ষে সকল জ্ঞানী বক্তাই এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
কিন্তু নবিশ বক্তারাও কি এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন? অবশ্যই না। পরিকল্পনার সময় প্রয়োজন, চিন্তা প্রয়োজন, ইচ্ছা শক্তি প্রয়োজন। মস্তিষ্ক সঞ্চালন একটি বেদনাদায়ক কাজ। এই বিষয়ে টমাস এডিসন তার কারখানার দেয়ালে স্যার জসুয়া রেমন্ডের নিম্নবর্ণিত উদ্ধৃতিটি খোদিত করে রেখেছেন।
এমন কৌশল নেই যাতে মানুষ শ্ৰম হতে মুক্ত থাকতে পারে এবং চিন্তা করাটা হচ্ছে আরো কঠিন শ্রম।
চিন্তার শ্রম হচ্ছে মৃত্তিকা গহ্বর,
চড়াই উতরাই পেরোনো যায় তরতর।
লর্ড নর্থ ক্লিক, যিনি সংবাদ পত্রের সাপ্তাহিক বেতনভূক্ত কর্মচারী হতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচাইতে ধনী ও প্রভাবশালী পত্রিকা মালিক হয়েছিলেন, তিনি বলেছেন যে, মাত্র পাঁচটি শব্দ তার জীবনে প্রভাব বিস্তার করে পরিবর্তন এনেছে সে শব্দগুলো হচ্ছে :
ভবিষ্যতের কথা আগে হতে জেনে ফেলা। আপনার বক্তৃতা প্রস্তুতিকালে এটিও একটি উল্লেখযোগ্য আদর্শ হতে পারে। আপনি কীভাবে বক্তৃতা শুরু করবেন তা আগে থেকেই কল্পনার মাধ্যমে জেনে নিন। বুঝে নিন সুস্পষ্টভাবে আপনার বক্তৃতার কী ফল হবে অর্থাৎ আপনি কিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন শ্রোতাদের ওপর।
অ্যারিস্টটলের যুগ হতেই এই বিষয়ে লিখিত বইতে তিনটি ভাগ আছে, তা হচ্ছে, সূচনা-, মুল বক্তব্য এবং উপসংহার। এখনো এই পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। ভূমিকা দিয়ে বক্তা মূল বক্তব্য প্রকাশ করে শ্রোতাদের জানাচ্ছেন তিনি কী বলতে চান, এটা দ্বারা শ্রোতারা বিষয়টি কী উপলব্ধি করেছেন এবং বক্তা এটি দিয়ে তাদের মনে আনন্দও দিচ্ছেন। শত বছর আগে বক্তার দ্বারা যা হত আজ সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন; বেতার, টেলিভিশন, টেলিফোন ও মুভিথিয়েটার তাই করছে।
তবে অবস্থার সাংঘাতিক পরিবর্তন হয়েছে, বিশ্বে বিশেষ অগ্রগতি এসেছে, গত একশত বছরে আবিষ্কারের ফলে। মানুষ জীবন্ত বেলসেজার এবং নেবুসেডনেজার আমল হতে বহুগুণ সুসভ্য হয়ে পড়েছে। এই একশত বছরের মধ্যেই আমরা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, উড়োজাহাজ, বেতার, টেলিভিশন পেয়েছি। সুতরাং আজকের বক্তাকেও সময়ের দ্রুত তালের সাথে পদ্ধতি রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। সুতরাং আপনি যদি বক্তৃতার সূচনা বা ভূমিকা রাখতে চান তা হলে তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাবে দেয়ার চেষ্টা করুন। এটা হচ্ছে আজকের যুগের সকল শ্রোতার কাম্য। আপনি কি কিছু বলতে চান? ঠিক আছে, সংক্ষিপ্ত ভাবে তা বলুন। দীর্ঘ বক্তৃতার দরকার নেই। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো বলে শেষ করুন।
ডুবো জাহাজের অংশ গ্রহণ সম্পর্কে কংগ্রেসে বক্তৃতা কালে উড্রো উইলসন মাত্র একুশটি শব্দ প্রয়োগ করে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি শুরু করেছিলেন, দেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমানে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যার কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরা আমার জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
