স্বাভাবিকতা-জীবন স্পন্দন-যে কোনো কর্মেরই প্রতিফলন। বার্ক অঙ্গভঙ্গি করণে ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যর্থকাম। পীটের অঙ্গভঙ্গি হয়ে পড়ত সম্পূর্ণ অর্থহীন, যেন তিনি বাতাসে সঙ এর মতো হাত পা নাড়ছেন। স্যার হেনরী ইরভিং এর একটি পা ছিল খোঁড়া, তাই তার গতিবিধিও হত খোঁড়া। মঞ্চে লর্ড মেকলের অঙ্গভঙ্গি হত অর্থহীন। গ্লেটিনেরও হত তাই। পার্নেলের হত অনুরূপ। এর উত্তর হচ্ছে’ পার্লামেন্টারি বাকপটুতা সম্পর্কে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লর্ড কার্জন বলেন, “সকল সুবক্তাই বক্তৃতাকালে নিজস্ব কায়দায় অঙ্গভঙ্গি বা অঙ্গ সঞ্চালন করেন। এবং এই অঙ্গভঙ্গি বক্তার বক্তব্যকে অর্থবহ করে তোলার সহায়ক হয়। তাঁর চেহারা যাই হোক না কেন, অঙ্গভঙ্গি তাঁর বক্তব্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে।“
বহু বছর আগে আমি ভবঘুরে স্মিথের বক্তৃতা শুনেছিলাম। আমি তাঁর বাকপটুতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। বক্তৃতার সময় তিনি নানারূপ অঙ্গভঙ্গি করে ছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি যতবার শ্বাস নিচ্ছেন ততবারই যেন অঙ্গ সঞ্চালন করছেন। এটা একটা আদর্শ পদ্ধতি।
আপনি যদি এই নীতির অর্থাৎ অঙ্গ সঞ্চালনের নীতি অনুসরণ করতে চান তা হলে এই নীতির কথা চিন্তা করে দেখতে পারেন। এ সম্পর্কে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, এটা নির্ভর করে বক্তার মন-মেজাজ ও মর্জির উপর। নির্ভর করে বক্তার প্রস্তুতি, আগ্রহ, ব্যক্তিত্ব, বক্তব্য বিষয়, শ্রোতা এবং কী উপলক্ষে বক্তৃতা করা হচ্ছে তার উপর।
এখানে সীমিত কিছু সুপারিশ করা হচ্ছে যা সহায়ক হতে পারে, ফলপ্রসূ হতে পারে। একটা অঙ্গভঙ্গির বার-বার পুনরাবৃত্তি করবেন না। করলে তা একঘেয়ে হয়ে পড়বে। মঞ্চে পায়চারি করবেন না। অর্থাৎ বক্তৃতাকালে মঞ্চে হেঁটে বেড়াবেন না। দ্রুততালে অঙ্গ সঞ্চালন করবেন না, কোনো কিছু বোঝাবার জন্য যদি আপনি অঙ্গুলি দিয়ে নির্দেশ করেন, বাক্য সমাপ্ত করা পর্যন্ত সেই অঙ্গুলি নির্দেশ স্থির রাখুন। এতে অন্যথা হলে আপনার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে এবং বক্তারা সাধারণত এই ভুলটা করে থাকে। এটা অত্যান্ত মারাত্মক ভুল। এটা যার উপর আপনি জোর দিতে চান তার উপর হতে অন্যত্র জোরটা সরিয়ে নেয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে হাল্কা এবং হাল্কা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আপনি দর্শকদের সামনে সত্যি-সত্যিই যখন বক্তৃতা করতে দাঁড়াবেন, তখন ইচ্ছা করে কোনো অঙ্গভঙ্গি করবেন না, স্বাভাবিকভাবে যে অঙ্গভঙ্গি হয় তা হতে দিন। কিন্তু আপনি যখন বক্তৃতা অভ্যাস করবেন, শিখবেন, তখন আপনার বক্তব্যকে জোরদার করার জন্য অঙ্গভঙ্গি বা অঙ্গ সঞ্চালন করুন। এভাবে অভ্যাস করলে সহজে আপনি বক্তৃতা শিখতে পারবেন এবং দর্শক সম্মুখে বক্তৃতা কালে আপনার অঙ্গ সঞ্চালন হবে অজ্ঞাতসারে, স্বাভাবিক নিয়মে।
বই বন্ধ করুন। বই এর ছাপান পৃষ্ঠা দেখে অঙ্গ সঞ্চালন শেখা যায় না। বক্তৃতাকালে আপনার ধারণা আপনার চিন্তা, আপনার প্রকাশ ভঙ্গি যে কোনো শিক্ষকের শিক্ষা পদ্ধতি বা শিখানো নীতি হতে অনেক বেশি মূল্যবান ও ফলপ্রসূ হবে।
অঙ্গভঙ্গি এবং বক্তৃতা সম্পর্কে আমরা যা কিছু বলেছি তা যদি আপনি ভুলে যান তা হলে আপনি শুধু স্মরণ রাখুন, যদি কোনো লোক শ্রোতাকে অভিভূত করার জন্য মনে প্রাণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, শ্রোতাদের স্বমতে আনতে পারবে বলে দৃঢ়বিশ্বাসী হয়, তা হলে যে কোনো বিষয় নিয়ে শুরু করে সে সফল হতে পারবে এবং বক্তৃতার সাথে সাথে তার স্বভাবিক অঙ্গভঙ্গি হবে। তার বক্তৃতার বিষয় জানা না থাকলে এমন হবে যে তার সমালোচনা করা যাবে না, খুঁত ধরা যাবে না। অর্থাৎ ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস তাকে জয়ী করবে। আপনি যদি এটা বিশ্বাস না করবেন তবে যে কোনো লোককে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিন। আপনি লক্ষ করবেন যে, লোকটি মঞ্চে উঠে যে কথা বলছেন তা অত্যান্ত তীব্র গতিতে বলছেন এবং তার ভাষা হচ্ছে অত্যন্ত দৃঢ় ও গতিশীল।
নিম্নে বক্তৃতা সম্পর্কে আমার গড়া এগারোটি শব্দ উল্লেখ করছি। এর মতো শক্তি আমি আর কোথাও পাই নি।
এক ধাক্কায় ছিপি খুলে
ব্যারেল পূর্ণ করে নিন,
অতঃপর তিড়িংবিড়িং নাচুন।
১। কার্নেগী কারিগরি ইনস্টিটিউট পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে যে, ব্যবসায়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে জ্ঞানের চাইতে ব্যক্তিত্ব অনেক বড়। বক্তৃতার বেলায় এটি অনুরূপ ভাবে সত্য। ব্যক্তিত্ব এমন একটি জিনিস যার উৎকর্ষ সাধনের জন্যে কোনোরূপ সুপারিশ করা বা উপদেশ দেয়া সম্ভব নয়। এই পরিচ্ছেদে প্রদত্ত কিছু সুপারিশ বক্তার বক্তৃতা শেখায় সহায়ক হবে।
২। আপনি যখন ক্লান্ত তখন বক্তৃতা শুরু করবেন না। বিশ্রাম নিন, শক্তি সঞ্চয় করুন, অতঃপর বক্তৃতা করুন।
৩। বক্তৃতা করার আগে হাল্কা খাবার গ্রহণ করুন।
৪। জীবনী শক্তি ভোঁতা করে দেয় এমন কিছু করবেন না। শরতের শস্য ক্ষেত্রে বন্যহস যেভাবে নেমে আসে জীবনীশক্তি সম্পন্ন বক্তার পাশেও ঠিক সেভাবে শ্রোতার ভিড় জমে।
৫। পরিচ্ছন্ন আকর্ষণীয় পোশাক পরুন। পোশাক আপনার আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। অপরিচ্ছন্ন পাজামা, ছেঁড়া জুতো, অবিন্যস্ত চুল, কোটের পকেটে কলমের দৃষ্টিকটু অবস্থান অথবা অদ্ভুত ধরনের হাতব্যাগ নিয়ে বক্তা হিসাবে বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়ালে সেই বক্তার প্রতি শ্রোতাদের শ্রদ্ধা জাগে না।
