নিউইয়র্কের প্যান সিলভানিয়া সমিতিতে বক্তৃতা কালে চার্লস স্কোয়ার দ্বিতীয় বাক্যেই মূল বিষয়ে প্রবেশ করেন :
মর্কিন নাগরিকদের আজকের মূল প্রশ্ন হচ্ছে : ব্যবসায়ে বর্তমান মন্দার অর্থ এবং এর ভবিষ্যৎ কী? ব্যক্তিগতভাবে আমি অবশ্য আশাবাদী।
ন্যাশনাল ক্যাশ রেজিস্টার কোম্পানির সেলসম্যানেজার এভাবেই তার লোকদের সামনে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন, মাত্র তিনটি বাক্যে বক্তৃতার ভূমিকা দিয়েছিলেন এবং বাক্যগুলো ছিল অত্যন্ত সহজ, ফলে শ্রোতাদের বোধগম্য হয়েছিল। উৎসাহব্যঞ্জক বাক্যগুলো ছিল :
আপনারা যারা কোম্পানির পণ্য বিক্রির অর্ডার সংগ্রহ করেন কারখানায় চিমনিতে ধূম্র অব্যাহত রাখা তাদের উপরই নির্ভর করছে। বিগত দুই গ্রীষ্মে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলার মতো প্রচুর নয়। এখন দুর্দিন কেটে গেছে এবং ব্যবসা পুনরারম্ভের সময় এসেছে বিধায় আমি আপনাদের জানাচ্ছি, যে, চিমনিতে আমরা অধিক পরিমাণ ধূম্র চাই।
কিন্তু অনভিজ্ঞ বক্তারা কী শুরুতে এরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেন? প্রশিক্ষণ হীন ও আদর্শ হীন বক্তাদের অধিকাংশই এমনভাবে বক্তৃতা শুরু করেন যে কোনো ক্রমেই ভালো পদ্ধতি বলে বিবেচিত হয় না। এখানে আমরা সে সম্পর্কে আলোচনা করব।
নবিশদের অনেকেই বক্তা হিসাবে নিজেরা হাস্যাস্পদ হবেন বলে ধারণা করেন, এটা দুঃখজনক। নবিশ একজন জ্ঞানী হলেও এবং তাঁর জ্ঞানের সীমা সশ্রদ্ধ ভয় উৎপাদক হলেও বক্তা হিসাবে নবিশ বিধায় মঞ্চে বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে মনে করেন, ধরে নেন অথবা তার মনে এরূপ ভাবের উদ্রেক হয় যে, মার্কটোয়েন যেন তার কাঁধে ভর করেছেন। সুতরাং তিনি কৌতুকপূর্ণ গল্প দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন, ভোজসভা হলে এরূপ গল্প বলা শ্রোতাদের তেমন অভিভূত করে না। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য হয়ে পড়ে শোনা কথা, তাই এই বক্তব্য শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। ফলপ্রসু হয় না।
একজন বিনোদনকারী যদি শ্রোতাদের সমক্ষে এরূপ বক্তব্য পেশ করেন, যে বক্তব্য শোনার জন্য শ্রোতারা টিকিট নিয়েছেন, সেরূপ ক্ষেত্রে শ্রোতারা হই চই করেন, শ্লোগান দেন। তবে সাধারণ শ্রোতারা বক্তার প্রতি থাকেন সহনশীল, সহানুভূতিশীল। সুতরাং বক্তার মনেও এরূপ চিন্তা রাখা উচিত, যেভাবেই হোক না কেন, শ্রোতাদের সন্তোষ বিধান করতে হবে। এরূপ চিন্তা মনে থাকলে বক্তা ব্যর্থ হন না। এরূপ চিন্তা মনে থাকলে খারাপ বক্তৃতার জন্যে বক্তা নিজেও অস্বস্তি অনুভব করেন। এরূপ ঘটনা কী আপনি কখানো অবলোকন করেন নি?
বক্তৃতা প্রদানের সবচাইতে কঠিন বিষয় হচ্ছে শ্রোতাদের হাসানো। কৌতুককর বক্তৃতা দিয়ে কী শ্রোতাদের হাসানো যায়? এটা নির্ভর করে বক্তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের উপর।
লিংকন ও জব হেজের বক্তৃতা মালা অধ্যয়ন করলে আপনি এটা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, কতিপয় ক্ষেত্রে কৌতুকপূর্ণ গল্প দিয়ে শুরু করে সফল হয়ে ছিলেন। এডউইন জেমস ক্যাটল আমাকে বলেছেন যে, শোতাদের হাসানোর উদ্দেশ্যে তিনি কখনো কৌতুকপূর্ণ গল্প বলতেন না। তার গল্প হত বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং কোনো বিশেষ পয়েন্ট সহজ করে বোঝাবার জন্যই তিনি গল্পের অবতারণা করতেন। গল্প বলতেন তিনি কেক তৈরির মশল্লা হিসাবে; অর্থাৎ তার কৌতুক হত কেকের মশল্লা, কেক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় রসিক বক্তা স্ট্রিকল্যান্ড গিলিল্যান, বক্তৃতার শুরুতে প্রথম তিনি মিষ্টি গল্পের অবতারণা করতেন না। এটা তিনি নিয়ম হিসাবে অনুসরণ করতেন। অতঃপর তিনি যখন উপলব্ধি করতেন গল্প বলা প্রয়োজন তখনই গল্প বলতেন।
এর ফলে তার বক্তব্য হত গুরুগম্ভীর, অর্থবহ ও উদ্দীপনাময়। যে কোনো বক্তৃতায় স্থানীয় কিছু সমস্যার উদ্ধৃতি দেয়া গেলে, অন্য কোনো বক্তার কোনো বক্তব্যের বিশ্লেষণ করা গেলে তা হয় অধিকতর আকর্ষণীয়। বেমানান কিছুকে অতিরঞ্জিত করবেন না। স্মরণ রাখবেন যে, রসিকতার চাইতে কৌতুক অনেক বেশি মূল্যবান।
নিজের সম্পর্কে রসিকাতা দিয়ে শুরু করা সবচাইতে সহজ পথ। মনে করুন যে, আপনি একটি অস্বস্তিকর পরিবেশে পড়েছেন তা হলে আপনি কীভাবে কৌতুক করবেন? কেহ পা ভেঙে ফেললে এস্কিমোরা হাসে। ভবনের দ্বিতলের জানালা দিয়ে পড়ে কোনো কুকুর মরলেও চীনারা হাসে, মুখ টিপে হাসে। আমরা কিন্তু অত সহজে হাসি না, কিন্তু বাতাস কারো মাথায় টুপি উড়িয়ে নিলে অথবা কলার চামড়ায় পা পিছলে কেহ পড়ে গেলেও কি আমরা হাসি না।
যে কোনো বক্তাই অদ্ভুত কথা বলে শ্রোতাদের হাসাতে পারেন। যদি বলা হয়, একজন সংবাদ দাতা, “শিশুদের ঘৃণা করুন, ঘৃণা করেন ডেমোক্রেটদের।” এই বক্তব্য সংগতিহীন বিধায় শ্রোতারা হাসেন।
রুডিয়ার্ড কিপলিং ইংল্যান্ডে তার প্রথম রাজনৈতিক বক্তৃতা কীভাবে শুরু করেছিলেন তা স্মরণ করুন। তিনি তার শুরুতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা ঠিক এভাবে বলেছিলেন :
মাননীয় মহাশয়, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ। তরুণ বয়সে ভারতে অবস্থান কালে আমি বিভিন্ন সংবাদপত্রে অপরাধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠাতাম। এটা আত্যন্ত আকর্ষণীয় কাজ। কেননা এটা আমাকে প্রতারক ও আত্মসাৎকারী, হত্যাকারী ও লুটেরাদের সাথে পরিচিত করে তুলেছিল, কখনো কখনো সংবাদপত্রে তাদের বিচারের খবর প্রকাশের পর আমি জেলে শাস্তি ভোগরত এসব ব্যক্তিদের সাথে দেখা করতে যেতাম। একজনের কথা আমি বিশেষ ভাবে স্মরণ করি, যাকে হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল! সে ছিল অত্যন্ত চালাক বিনয়ী ও সুবক্তা। তার জীবন কাহিনী সে আমাকে বলেছে। সে বলেছে, সংসারে চলার পথে মানুষ যখন বক্রপথ দেখে, যখন দেখে বাধা, তখন সে তার নিজ চলার পথকে সুগম করার জন্যে পথের বাধকে বাধ্য হয়ে অপসারিত করে এবং এভাবে বাধা অপসারণ করেই সে তার লক্ষ্য পথে এগিয়ে যায়। আমাদের মন্ত্রীসভার অবস্থাও বর্তমানে ঠিক অনুরূপ। তার এই বক্তব্যে সভায় ছিল হাসির রোল পড়ে।
