পাশে ঝুলে থাকলেই আরাম পাবেন। ঝুলে থাকলে তার প্রতি কারো তেমন দৃষ্টিও আকর্ষিত হবে। অতি সমালোচকও এই অবস্থার সমালোচনা করতে পারবেন না। কোনো বক্তৃতার সময় হাত গুলো নীরব থাকছে এবং প্রয়োজন ছাড়া ওঠনামা হচ্ছে না।
কিন্তু যদি ঘাবড়িয়ে যান তা হলে আপনি কী করবেন। আপনার হাত দুটিকে পেছনে নিয়ে যান, একটিতে অপরটি নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করুন অথবা পকেটে রাখুন, অথবা বক্তৃতার টেবিলে রাখুন। এরূপ করে, একটু চিন্তা করলে আপনার স্নায়বিক দুর্বলতা হ্রাস পাবে, মনে স্বস্তির, নতুন উদ্যমের সঞ্চার হবে। আমি এযুগের বহু সংখ্যক খ্যাতনামা বক্তার বক্তৃতা শুনেছি। সকলকে না হলে তাদের অনেককে আমি বক্তৃতা কালে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি। বাইরন এরূপ করতেন। চাউন্সে. এম. ডেপ এরূপ করতেন। টেডী রুজভেল্টও এরূপ করতেন। তবে কথা হচ্ছে আকাশ কখনো ভেঙে পড়ে না। এবং ঝড় বৃষ্টি বাদল হলেও আবার আকাশে সূর্যোদয় হয়। কোনো ব্যক্তি বক্তৃতা করতে গেলে বক্তৃতার বিষয়টিই হয় মুখ্য, তার হাত পা কি অবস্থায় আছে তা কোনো আলোচ্য বিষয়ই নয়। তাঁর মন মস্তিষ্ক ঠিক থাকলে হাত পা আপনা আপনিই ঠিক থাকতে বাধ্য। মূল কথা হচ্ছে বক্তৃতা, বক্তব্য বিষয়, বক্তার অঙ্গভঙ্গি বা হাত পা নয়।
অঙ্গভঙ্গি সম্পর্কে এই বইতে যা লেখা হয়েছে তার দশ ভাগের নয় ভাগই ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে এর কাজ ও কালি খরচও। অঙ্গভঙ্গি মন হতেই উৎসারিত হওয়া উচিত। আপনার হৃদয়, মন, ইচ্ছা ও আকাক্ষা অনুযায়ীই অঙ্গভঙ্গি হয়। তাই সাধারণ ও স্বাভাবিকতার ক্ষুদ্রতম একবিন্দু বিশাল বা টনের চাইতেও মূল্যবান।
অঙ্গভঙ্গি নৈশভোজের পোশাকের মতো কোনো কিছু নয়। এটা মনের অভিব্যক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। মন খুশি ও হাস্যোজ্জ্বল অথবা যন্ত্রণা বা দুঃখপূর্ণ থাকলে অঙ্গভঙ্গিতেও তার প্রকাশ ঘটে।
এবং কোনো ব্যক্তির অঙ্গভঙ্গি তার ব্যবহৃত দাঁতের ব্রাসের মতো সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত ব্যাপার। এবং ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে পার্থক্য বিরাজমান বিধায় তাদের অঙ্গভঙ্গিতে পার্থক্য হবে, এটা স্বাভাবিক।
যে কোনো দু’ব্যক্তির অঙ্গভঙ্গি একরূপ হয় না, হতে পারে না। লিংকন কথা বলতেন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, সুতরাং তাঁর অঙ্গভঙ্গিও হত দ্রুততর। কিন্তু ডগলাসের বেলায় সেরূপ হত না। এরূপ হলে বরং তা হত হাস্যকর।
“লিংকন,“ বলেছেন তাঁর জীবনী রচয়িতা ও আইন অংশীদার হারেনভন, “মস্তিষ্ক, যেভাবে নাড়তেন হাত সেভাবে নাড়তেন না। তিনি তাঁর বিবৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন তখন তিনি মস্তিষ্ক সঞ্চালন করতেন। কোনো-কোনো সময় তিনি মস্তিষ্কে এরূপ ঝকানি দিতেন যেন বিদ্যুৎখণ্ড বিচ্ছুরিত হচ্ছে। বক্তৃতাকালে তিনি কখনো মঞ্চের দিকে তাকাতেন না, অন্যান্য সাধারণ বক্তার মতো বক্তৃতাকালে এদিক-ওদিক তাকাতেন না। বক্তৃতাকালে মঞ্চে কী অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে তা তিনি চিন্তা করতেন না। বক্তৃতাকালে তিনি আস্তে-আস্তে অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে পড়তেন, স্বাভাবিক সাধারণ মানুষের মতোই তিনি কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যে প্রকাশিত হয়ে পড়তো তার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, শ্রোতারা বুঝতে পারতেন তার স্বাতন্ত্র্য। সময়-সময় তিনি ডান হাত তুলে শ্রোতাদের প্রতি এমন ভাবে নির্দেশ করতেন যে, শ্রোতাদের সামনে তখন তার বক্তব্যের অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে পড়ত। সময়-সময় আনন্দ বা সন্তোষ প্রকাশের জন্যে তিনি একসাথে দু’হাত উপরে তুলতেন। ফলে তার বক্তব্য স্পষ্ট হত। তার এই অঙ্গভঙ্গি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হত। অর্থাৎ এভাবে বক্তৃতার সাথে অঙ্গভঙ্গি যোগ হত বিধায় বক্তব্য হয়ে পড়ত পরিষ্কার। তিনি সব সময় আড়াআড়ি ভাবে পায়ের পাতার ওপর দাঁড়াতেন, তার পায়ের বুড়া আঙুল থাকত পাশাপাশি অর্থাৎ তার একপা অন্য পায়ের পিছনে থাকত না। তবে শক্ত হবার জন্যে, দৃঢ় হবার জন্যে তিনি কখনো মঞ্চে কিছু করতেন না। সময়-সময় অবশ্য তিনি তার পজিশন পরিবর্তন করতেন। এই পরিবর্তনের জন্যে কিন্তু তিনি সামনে বা পেছনে সরে দাঁড়াতেন না। মনকে দৃঢ় করার জন্যে তিনি সময়-সময় বাম হাত দিয়ে কোটের বুতাম ধরতেন না পকেটে হাত দিতেন, ডান হাতে নাড়াচাড়া করতেন। এতে তার বক্তব্য পেশের গতি হত সাবলীল।” শিকাগোর লিংকন পার্কে সেন্ট গউডেনের তৈরি তার যে মূর্তি রয়েছে তাতে এই অঙ্গভঙ্গিই রয়েছে।
এটাই ছিল লিংকনের পদ্ধতি। বক্তৃতকালে থিওডোর রুজভেল্ট-হয়ে পড়তেন অধিকতর, সজাগ, সচেতন, আবেগপূর্ণ, উত্তেজিত ও তেজোদীপ্ত। তাঁর চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত একটা অদ্ভুত অনুভূতির ঔজ্জ্বল্য, মনে হত যেন তাঁর দেহটি একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং এই যন্ত্র হতে বেরুচ্ছে বক্তৃতার ধ্বনি। বাইরন সময়-সময় হস্ত প্রসারিত করতেন বক্তৃতা করার সময়। গ্লাডস্টোন বক্তৃতা করার সময় কখনো কখনো টেবিলে হাত রাখতেন টেবিল আঁকড়ে ধরতেন। কখনো বা মঞ্চে পা’দিয়ে আঘাত করতেন। লর্ড রোজবেরী বক্তৃতা করার সময় তাঁর ডান বাহু নাড়া-চাড়া করতেন ফলে তিনি যেন অধিকতর শক্তি পেতেন। বক্তার বক্তৃতায় গতি থাকলে, শক্তি থাকলে, চিন্তায় থাকলে স্বচ্ছতা, অঙ্গভঙ্গিতে আসে স্বাভাবিকতা, সাবলীলতা।
