মঞ্চে কোনো অতিথি নয় :
একদা লন্ডনে আয়োজিত কানাডার প্রধানমন্ত্রীর এক বক্তৃতা সভায় আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সভায় দারোয়ান বা দৌবারিককে একটি বৃহৎ দণ্ড হাতে এ জানালা হতে সে জানালায় দৌড়াদৌড়ি করতে দেখলাম। দেখলাম তাকে কক্ষটিতে বায়ু সঞ্চালনের চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত। অতঃপর কী হল? দেখলাম, শ্রোতাদের দৃষ্টি বক্তার প্রতি নয় দৌবারিকের প্রতি নিবন্ধ। তারা যেন মনে করেছেন, বক্তা নয়, দৌবারিকই একটা আশ্চর্য কিছু করেছে।
বক্তৃতা সভায় যখন শ্রোতারা মনোনিবেশ সহকারে কিছু শুনতে থাকে তখন সেখানে হঠাৎ ঘূর্ণীয়মান কিছু হলে তারই প্রতি শ্রোতা ও দর্শকদের দৃষ্টি ফিরে যায়। কোনো দর্শক বা শ্রোতাই আর তার দৃষ্টিকে মঞ্চের দিকে নিবন্ধ রাখতে পারে না। বক্তা যদি এই সত্যটা স্মরণ রাখেন তাহলে তার পক্ষে এই ধরনের পরিস্থিতি পরিহার করে চলা সম্ভব হয়। তা হলে বক্তাকে কী করতে হবে?
প্রথমত পরিহিত বস্ত্র, অঙ্গভঙ্গি, হস্তপদাদি সঞ্চালনে প্রতি যেন দর্শক শ্রোতাদের লক্ষ থাকে তার দিকে নজর দিতে হবে। নিউইয়র্কের এক বক্তৃতা সভায় আমি একা দেখেছি, একজন খ্যাতনামা বক্তা তার একখানা হাত বেঁধে এসেছিলেন। বক্তৃতা কালে আমি লক্ষ করেছি, সকল শ্রোতার দৃষ্টি ঐ হাতের প্রতি স্থির নিবন্ধ।
দ্বিতীয়ত বক্তা শ্রোতাদের বসার আসনের প্রতি লক্ষ রাখবেন। শ্রোতাদের এমনভাবে বসার ব্যবস্থা করবেন যাতে দেরিতে যারা আসে তাদের প্রবেশের কারণে শ্রোতাদের দৃষ্টি সেদিকে বিক্ষিপ্ত না হয়।
তৃতীয়ত মঞ্চে অতিথি রাখবেন না। কয়েক বছর আগে রেমন্ড রবিন ব্রুকলীনে বক্তৃতা মালায় অংশ নেন। একদিন অন্যান্য কয়েকজন সহ আমাকে মঞ্চে বসতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি তখন মঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলি যে, এটা বক্তার প্রতি সুবিচার হবে না। প্রথমত রাতে আমি লক্ষ করি তালিকাভুক্ত, অতিথিরা একবার মঞ্চে যান, একবার বের হয়ে আসেন। তাদের এই উঠানামার ফলে শ্রোতাদের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে বক্তা নয়, অতিথিদের গতিবিধির প্রতি। পরদিন আমি এর প্রতি মি. রবিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সে রাতে তিনি একাই মঞ্চে বসেন এবং তাঁর বক্তৃতা হয় স্বচ্ছ ও অবাধ।
ডেভিড বেলাস্কো মঞ্চে কোনোরূপ লালফুল রাখতে দিতেন না। কেননা, লাল জিনিস সহজে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একজন চঞ্চল মানুষকে শ্রোতাদের মুখোমুখি হয়ে মঞ্চে বসতে দিলে কী হয়? শ্রোতাদের দৃষ্টি বক্তা হতে সরে গিয়ে তার উপর পড়ে। সুতরাং মঞ্চে বক্তা ছাড়া অন্যকোনো অতিথিকে বসতে দেওয়া উচিত নয়।
ভারসাম্য :
বক্তৃতা শুরু করার আগে শ্রোতাদের মুখোমুখি হয়ে বসা কি বক্তার জন্যে ভালো নয়? আগে মঞ্চে না গিয়ে বক্তৃতা শুরু করার মুহূর্তেই মঞ্চে যাওয়া কি বক্তার জন্যে ভালো নয়?
কিন্তু যদি আগে গিয়ে মঞ্চে বসতে হয় তাহলে বসা সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। ওখান হতে দেখা যাবে শ্রোতারা হলে আসছেন, চেয়ার খুঁজছেন। চেয়ার বহু খালি থাকলেও একটা ভালো জায়গা খুঁজছেন, বসছেন, কেহ বা উঠে যাচ্ছেন।
এক জায়গায় বসে মনে হল আরাম পাচ্ছেন না তাই অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। গিয়ে বসেছেন আর একটা চেয়ারে আরাম করে। আরামের জায়গা ছেড়ে যাচ্ছেন আরো আরামের সন্ধানে। এসব লক্ষ করলে বক্তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, সুতরাং বসতে হলে এমন ভাবে বসবেন,যাতে শ্রোতাদের এসব কাণ্ড লক্ষ করতে না হয় সরাসরি।
আগে আমরা বলেছি, আকর্ষণীয় পোশাক অথবা অলংকার পরে মঞ্চে যাবেন না। কেননা, এই পোশাক অথবা অংলকার শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আরো একটি কারণ আছে। এই পোশাক বা অলংকার আপনার দুর্বলতা বলে মনে হবে। শ্রোতাদের মনে জাগবে আপনার দুর্বলতার কথা। তারা মনে করবে দুর্বলতা ঢাকার জন্যেই আকর্ষণীয় পোশাক বা অলংকারের এই বহর। সুতরাং স্বাভাবিক পোশাকে মঞ্চে যান, ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন। ফলে আপনার দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত হবে। বক্তব্য পেশকালে ভারসাম্য রক্ষিত হবে।
বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে বক্তৃতা শুরু করবেন না। দীর্ঘশ্বাস নিন এবং শ্রোতাদের প্রতি। দৃষ্টি বুলিয়ে নিন। হলে কোথাও কোনো গণ্ডগোল বা শব্দ হচ্ছে মনে হলে তা থেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা। করুন।
বুক উঁচু করে দাঁড়ান। শুধুমাত্র বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে নয়, বাড়িতেও এরূপভাবে দাঁড়াতে অভ্যাস করুন। নিয়মিত এরূপ অভ্যাস করলে শ্রোতাদের সামনে বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়াতে গেলে স্বাভাবিক নিয়মেই আপনার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে দৃঢ় মনোভাব ফুটে উঠবে।
লুথার এইচ, গুলিক তাঁর কর্মক্ষম জীবন” বইতে লিখেছেন, দশ জনের মধ্যে একজন লোক নিজের জীবনকে দৃঢ়ভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে না। ঘাড়কে দৃঢ় রাখলে তা কলারের সাথে ঝুলে পড়ে না তিনি দৈনিক অভ্যাসের জন্যে যে সুপারিশ করছেন তা হচ্ছে, আস্তে-আস্তে শ্বাস নিন। অতঃপর ঘাড়কে এমন দৃঢ় করুন যাতে এটা কলার হতে আগা থাকে। ঘাড় শক্ত করুন, এরূপ করলে কোনোভাবে কোনো ক্ষতি হয় না। ঘাড়কে এভাবে শক্ত করলে বুকও শক্ত হয়, দৃঢ় হয়।
এবং আপনার হাত দিয়ে কী করবেন? এগুলোর কথা ভুলে থাকুন। এগুলো যদি আপনার পাশে ঝুলে পড়ে, পড়তে দিন। ওগুলোকে কলার কাঁদির মতো ঝুলে থাকতে দিন। কেহ হাতের প্রতি লক্ষ করছে। একথা কল্পনাও করবেন না।
