এর একটা কারণ এই যে, বিকেলে বয়স্ক মহিলা এবং শিশুরা আসে। এরা তেমন মনোযোগী হতে পারে না। রাতের শ্রোতাদের মধ্যে এদের সংখ্যা তেমন থাকে না, সুতরাং তারা হয় মনোযোগী, তবে এটা একটি আংশিক ব্যাখ্যা মাত্র।
তবে আসল তথ্য হচ্ছে এই যে শ্রোতারা বিচ্ছিন্নভাবে বসলে তাদের মনকে সহজে আকর্ষণ করা যায় না। তাদের মধ্যেকার শূন্যস্থান বা খালি চেয়ারগুলো যেন তাদের মনকেও শূন্য করে, খালি করে রাখে।
হেনরী ওয়ার্ড বেচার তার ইয়েল বক্তৃতায় বলেছেন, মানুষ প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, “ক্ষুদ্র জনতা হতে বহুতর সমাবেশে বক্তৃতা করা কি আপনার জন্যে অধিকতর প্রেরণাদায়ক হয় না? না। আমি উত্তর দেই। হাজার লোকের সামনে দাঁড়ালে আমার বক্তৃতা যেরূপ হয় মাত্র বারো জন লোকের সামনেও হয় ঠিক অনুরূপ। তবে এই বারো জনকে বসতে হবে ঘন হয়ে কাছাকাছি, কিন্তু হাজার জনও যদি বিস্তৃত খোলা মাঠে বিক্ষিপ্ত হয়ে দূরে-দূরে বসে তাহলে আমার বক্তব্য জমে না? জনতাকে একত্রিত করুন, নিকটতর করুন, তাহলেই বক্তব্য সুস্পষ্ট হবে।
যে কোনো বড় সমাবেশে উপস্থিত সকল ব্যক্তি নিজস্ব সত্ত্বা হারায়। বক্তৃতা শোনার সময় সে হয়ে পড়ে শ্রোতাদের একজন মাত্র। শ্রোতাদের হাসিতে সে যোগ দেয়, কিন্তু নিজে কোনো বিষয়ে হাসে না!
এই ধরনের সমাবেশে সকলকে এক সাথে উদ্বুদ্ধ করা সহজ, ব্যক্তি বিশেষকে নয়। যুদ্ধযাত্রীরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে, যে কোনোরূপ সংকটজনক ঘটনা ঘটাতে প্রস্তুত থাকে। কেননা, তারা যাত্রা করে একজন হয়ে। বিগত যুদ্ধকালে জার্মান সৈনিকেরা যুদ্ধ করেছিল বাহুতে বাহু মিলিয়ে এবং এটাই তাদের অগ্রগতির কারণ।
জনতা! জনতা! জনতা! এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত আন্দোলনের জয় হয়েছে, হয়েছে সংস্কার, তা হয়েছে জনতার অংশ গ্রহণে। এ সম্পর্কে ডীন মার্টিনের লেখা জনতার আচরণ বইটি খুবই সুখপাঠ্য।
আমরা যদি ক্ষুদ্র সংখ্যক জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করতে চাই তাহলে আমাদের সমবেত হওয়া। উচিৎ একটি অতিক্ষুদ্র স্থানে। বিরাট হলে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসার চাইতে ছোট জায়গায় দলবদ্ধ ভাবে বসা অনেক ভালো।
আপনার শ্রোতারা যদি বিচ্ছিন্ন ভাবে বসেন, তা হলে তাদের আপনার সামনে এসে বসতে অনুরোধ করুন। বক্তৃতা শুরু করার আগে এটার উপর জোর দিন।
শ্রোতার সংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। কম সংখ্যক শ্রোতা নিয়ে বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়াবেন না। স্বল্প শ্রোতার বিক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে ভালো বক্তাও সুভাষণ প্রকাশ করতে পারেন না। তবে শ্রোতার সংখ্যা স্বল্প হলে তাদের কাছে এসে, পাশাপাশি বসতে বলুন। শ্রোতাদের সাথে মিশে তাদেরকে পরস্পরের কাছে এনে বসাবার ব্যবস্থা করুন। অতঃপর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করুন। বক্তৃতা স্বচ্ছন্দ হবে।
মেজর পশু জানালা ভাঙতেন :
মুক্ত বায়ু প্রয়োজন। বক্তৃতা স্থানে অর্থাৎ জনসমাবেশে অম্লজান অত্যন্ত প্রয়োজন। এটা প্রয়োজন মানুসের অবাধ স্বাস-নিশ্বাসের জন্যে। জীবনের স্পন্দন অব্যাহত রাখার জন্যে। বায়ু দূষিত হলে একটি হলে দর্শক বেশিক্ষণ থাকে না, থাকতে পারে না। আলোচনা বা সঙ্গীতানুষ্ঠান যত আকর্ষণীয় হোক না কেন, শ্রোতারা চলে যান। সুতরাং যে কোনো সভার একাধিক সংখ্যক বক্তৃতার সাথে আমি উপস্থিত থাকলে বক্তৃতা শুরু করার আগে আমি জানালা খুলে ফেলার ব্যবস্থা করি এবং এই জানালা খোলা কালে আমি শ্রোতাদের প্রতি নির্মল বায়ু সেবন করে মুহূর্তকাল বিশ্রাম নেয়ার আবেদন জানিয়ে থাকি। মেজর জেমস বি. পশু প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে হেনরী ওয়ার্ড বেচারের ম্যানেজার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রও কানাডায় ঘুরেছেন। বেচারা তখন এসব স্থানে বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছিলেন। শ্রোতাদের উপস্থিতির আগেই মেজর পশু বক্তৃতার জন্যে নির্দিষ্ট হলে বা গির্জা অথবা থিয়েটার পরিদর্শন করে আসতেন। তিনি পরীক্ষা করতেন সেখানকার বসার ব্যবস্থা, আলোর ব্যবস্থা। পরীক্ষা করতেন তাপ ও আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। একজন পুরাতন সামরিক
অফিসার হিসাবে তিনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ভালবাসতেন। কোনো স্থানের তাপ তার পছন্দ না হলে, বায়ু। চলাচলের সুব্যবস্থা না দেখলে, জানালা খুলে দেয়ার চেষ্টা করতেন, জানালা খুলতে না পারলে তা ভেঙে দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, “অম্লজান (অক্সিজেন) হচ্ছে স্রষ্টার দান।” সুতরাং এটাকে নাগালের বাইরে রাখা অন্যায়।
আপনার চেহারা আলোকিত হোক :
আপনি যদি কোনো ভৌতিক কাণ্ড দেখাতে বা সৃষ্টি করতে চান তাহলে সমস্ত কক্ষটিকে আলোকে উদ্ভাসিত করে ফেলুন। যথাসম্ভব সকল বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আলোর বন্যা বইয়ে দিন। অর্ধালোকিত কক্ষে শ্রোতারা বক্তার প্রতি তেমন আকর্ষণ অনুভব করে না। কিন্তু আলোকোজ্জ্বল কক্ষে বক্তাদের মন এগিয়ে যায় বক্তার প্রতি। সুতরাং কক্ষটিকে থার্মোফ্লাক্সের ভিতরের অর্ধ অন্ধকারের মতো না রেখে আলোকিত করুন।
মঞ্চ সম্পর্কে ডেভিড বেলাশে লিখিত নিবন্ধ পড়ুন, আপনি বুঝতে পারবেন যে, সাধারণ বক্তারা এই আলোক মালার প্রভাব সম্পর্কে বা কক্ষ আলোকে উদ্ভাসিত করণের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নন।
আপনার মুখে আলো পড়তে দিন, কেননা, শ্রোতারা আপনাকে দেখতে চায়। এই আলো পতনে আপনার চেহারায় পরিবর্তন আসবে, সাথে-সাথে শ্রোতাদের দৃষ্টি নিবন্ধ হবে আপনার মুখে, ফলে আপনি প্রস্তুত হতে পারবেন বক্তব্য পেশে। সময়-সময় এই আলো আপনার বক্তব্যকে আরো পরিষ্কার ভাবে পেশ করতে সাহায্য করবে। আপনি যদি সরাসরি বাতির নিচে দাঁড়ান, আপনার মুখে ছায়া পড়তে পারে, কিন্তু কোনো বাতিকে সামনে করে দাঁড়ালে এই ছায়া পড়বে না। সুতরাং বক্তৃতা শুরু করার আগেই স্থান ঠিক করে দাঁড়ান, আলো-আঁধারি পরিবেশ অবশ্য আপনার বক্তব্য প্রকাশের সহায়ক হবে।
