লন্ডনের হাইড পার্কে আমি ঠিক এরূপ অবস্থা অবলোকন করেছি। মার্বেল তোরণের পাশে দাঁড়িয়ে যে কোনো জাতের ধর্মের, বর্ণের বা দেশের মানুষই বক্তৃতা করতে পারেন। রোবরাবের বিকেল যে কোনো একটা ক্যাথলিক ধর্মের বৈশিষ্ট্য, কার্ল মার্কসের অর্থনৈতিক দর্শন অথবা ভারতের মুসলমানদের দু’জন স্ত্রী রাখার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা করতে পারেন। বক্তৃতা করতে পারেন যে কোনো বিষয়ে। আমি দেখেছি একজন বক্তাকে ঘিরে ধরেছেন শত-শত শ্রোতা, অপর বক্তা বক্তৃতা করছেন প্রায় শূন্য মাঠে। কেন? বক্তৃতায় বিষয় বস্তুর জন্যই কি এরূপ হয়? না। এর কারণ হচ্ছে বক্তা এবং বক্তৃতা। যে বক্তা বক্তব্য বিষয় যাই হোক না কেন, তা পেশ করতে পারেন আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে, সুললিত ও প্রাঞ্জল ভাষায়, সেই বক্তার প্রতি শ্রোতা আকর্ষিত হন বেশি। তাঁর চেতনা সজীবতা বক্তৃতাকে করে তোলে জীবন্ত, ফলে তা সকল শ্রোতাকে এত কাছে টেনে আনে। এক্ষেত্রে বিষয়ের গুরুত্ব এবং বৈশিষ্ট্য নয়, প্রকাশ ভঙ্গিরই প্রাধান্য।
জেনারেল লী-যখন তাঁর বাহিনীসহ আত্মসমর্পণ করতে আসেন তখন তার পরনে ছিল ধোপদুরস্থ নতুন, পোশাক এবং কোমরে ঝুলান ছিল মূল্যবান তরবারি। এ্যান্টের পরনে ছিল তখন শুধুমাত্র সাধারণ শার্ট ও পায়জামা, গায়ে ছিল না কোনো কোট। ”আমার পোশাক ছিল না অনুষ্ঠানের উপযোগী। তিনি লিখেছেন তাঁর জীবন স্মৃতিতে,“ অনুষ্ঠান উপযোগী পোশাক পরিহিত মানুষটির সামনে আমি মনে-মনে হয়ে পড়েছিলাম অপ্রস্তুত। এই ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনার জন্যে যে পোশাক দরকার সেদিন গ্রান্টের পোশাক সে ধরনের ছিল না, এটাই গ্রান্টের জীবনের একটি দুঃখজনক মুহূর্ত।
ওয়াশিংটনের কৃষি বিভাগ তার পরীক্ষামূলক খামারে হাজার-হাজার মৌমাছি পালন করে। প্রতিটি মৌচাক বিরাট আয়না দিয়ে ঢাকা। যে কোনো সময় বোতাম-টিপে আলো জ্বালিয়ে মৌচাকের মৌমাছি দেখা চলে। লক্ষ্য করা চলে ওদের গতিবিধি।-একজন বক্তাও ঠিক মৌচাকের মতো। সকল শ্রোতার দৃষ্টি তার ওপর পতিত। সকল শ্রোতাই তাকে দেখছে। বক্তার চেহারায় সামান্য অসন্তোষ বা দুঃখের চিহ্ন দেখা গেলে তা শ্রোতারা অতি সহজেই দেখতে পান, বুঝতে পারেন! বক্তৃতা করার আগেই আমরা অভিনন্দিত বা নিন্দিত হই : বেশ কয়েক বছর আগে আমি আমেরিকার একটি ম্যাগাজিনের জন্যে নিউইয়র্কের জনৈক ব্যাংকারের জীবনী সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। এই নিবন্ধের মাল-মশলা সংগ্রহ কালে আমি তাঁর জনৈক বন্ধুর কাছ থেকে তার সাফল্যের কারণ জানতে চেয়েছিলাম। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, হাসি। তার হাসি মানুষের হৃদয় জয় করে নিত বলে তিনি সফল হয়েছিলেন। প্রথমে আমি এটি বিশ্বাস করতে পারি নি। কিন্তু পর্যালোচনা করে দেখলাম অভিজ্ঞতার সাথে এই গুণটি যোগ হওয়ায় তিনি সফল হয়েছিলেন। অন্যান্য অভিজ্ঞ ব্যক্তির এই গুণটি না থাকায় তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন নি। হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানালে যে কোনো লোক খুশি হয়। যে ব্যক্তি হেসে অভ্যর্থনা জানাতে পারে সে অন্যদের সমর্থন পায়। এই সমর্থনই সাফল্যের চাবি কাঠি!
”যে ব্যক্তি হাসতে পারে না”, একটা চীনা প্রবাদ আছে, “তার ব্যবসা করা সাজে না।“ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তার পক্ষে হাসি মুখ করা কি শ্রোতাদের স্বাগত জানানো নয়? আমি এক্ষেত্রে ব্রকলিন বাণিজ্য সংস্থার পরিচালিত একটি কোর্সে অংশ গ্রহণকারী জনৈক ছাত্রের কথা উল্লেখ করব। সে ছাত্রটি সব সময় শ্রোতাদের সামনে হাসি মুখে দাঁড়াত। সে যে কাজ করত তা হাসি মুখেই করত। হাসি সব সময় তার ঠোঁটে লেগেই থাকত। ফলে সহসাই এই সদা হাস্য মুখ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বক্তা হিসাবে যে সফল বা সুবক্তা না হলেও সে যা বলত হাসি মুখে বলত বলে সবাই তার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করত। অর্থাৎ বক্তৃতা করার আগেই সে শ্রোতাদের জয় করে নিত।
কিন্তু আমি এমনও দেখেছি, যে বক্তা অত্যন্ত গম্ভীর মনোভাব নিয়ে মঞ্চে দাঁড়ান, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করে অত্যন্ত গম্ভীর ভাবে, তিনি শ্রোতাদের মন জয় করতে ব্যর্থ হন। অর্থাৎ মঞ্চে তাকে দেখেই শ্রোতাদের মনে সৃষ্টি হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এই ধরনের মুখ কালো করা বক্তা বক্তৃতা শেষ করে ফেলুক এটাই শ্রোতারা কামনা করেন। ফলে তাদের বক্তৃতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রোতাদের মনে দাগ কাটে না।
আমরা যদি আমাদের শ্রোতাদের প্রতি আগ্রহী হই, বলেছেন অধ্যাপক ওভারস্ট্রীট, মানবচরিত্র, বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শ্রোতারাও আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আমরা যদি শ্রোতাদের প্রতি কুটি করি, শ্রোতারাও প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে আমাদের প্রতি ভ্রুকুটি করব। আমরা তাদের যদি অবজ্ঞা করি, তারাও আমাদের প্রতি অবজ্ঞা করবে। আমরা যদি ধৃষ্টতা পূর্ণ ও দাম্ভিব হই শ্রোতাদের কাছ থেকে পাবো আমরা অনুরূপ ব্যবহার। সুতরাং বক্তৃতা করার আগেই আমরা অভিনন্দিত বা ধিকৃত হব। আমরা যেরূপ আচরণ করব জবাবও পাবো ঠিক অনুরূপ সুতরাং সদ্ব্যবহার পেতে হলে আমাদের ব্যবহারও হতে হবে সৎ।”
শ্রোতাদের একত্রিত করুন :
একজন সাধারণ বক্তা হিসাবে আমি বহু বিকেলে একটি হলে আগত বিক্ষিপ্ত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেছি এবং রাতে একই হলে একত্রিত বা দলবদ্ধ শ্রোতাদের উদ্দেশ্যেও বক্তৃতা করেছি। বিকেলের শ্রোতারা কোনো একটি কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসেছে, রাতের শ্রোতারা কিন্তু হাসে নি তবে মুচকি হাসির চিহ্ন তাদের চোখে মুখে ফুটেছে, বিকেলের শ্রোতারা সে ক্ষেত্রে মনোযোগী ছিল না, রাতের শ্রোতাদের ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগী দেখেছি, কেন এমন হয়?
