(ঘ) আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভাব প্রকাশের আগে ও পরে কি আপনি থামেন, নীরবতা পালন করেন?
০৭. মঞ্চারোহণ ও ব্যক্তিত্ব
কার্নেগী কারিগরী ইনস্টিটিউট একবার একশতজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ীর মেধা সম্পর্কে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। যুদ্ধকালে সৈনিকদের যেভাবে পরীক্ষা নেয়া হয় ঠিক সেভাবেই এই পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এই পরীক্ষার ভিত্তিতে ইনস্টিটিউট ঘোঘণা করে যে, ব্যবসায়ে মেধার চাইতে ব্যক্তিত্বের সাফল্য লাভ ঘটে অনেক বেশি। ..
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান, শিক্ষাবিদের জন্য মূল্যবান, মূল্যবান পেশাদার লেখকদের জন্য, বক্তাদের জন্য।
ব্যাক্তিত্ব–প্রস্তুতির কথা বাদ দিলে জনসভার বক্তৃতায় সাফল্যের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ”অলঙ্কার পূর্ণ বক্তৃতায়,“ বলেছেন এলবার্ট হুবার্ট, “শব্দ নয়, বক্তৃতাদান পদ্ধতিরই জয় হয়। অর্থাৎ ধারণার চাইতে, চিন্তার চাইতে প্রকাশভঙ্গিরই গুরুত্ব বেশি। কিন্তু ব্যক্তিত্ব হচ্ছে অস্পষ্ট ও ছলনাময় ব্যাপার, সেগুলি সৌরভের যেমন কোনো বিশ্লেষণ করা যায় না, ব্যক্তিত্বও ঠিক তেমনি অস্পষ্ট। এটা হচ্ছে একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক, মনমেজাজ, ধ্যান-ধারণা, সাহস, অভিজ্ঞতা, অভিরুচি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, উদ্যোগ-উদ্দীপনা প্রভৃতির মিলিত নামের আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের মতো এটিও একটি জটিল বিষয়, যার সামান্যই বোঝা যায়।
উত্তরাধিকার ও পরিবেশের ভিত্তিতেই ব্যক্তিত্ব যাচাই করা হয় এবং এটা পরিবর্তন বা উন্নয়ন অসম্ভব। তবে এটাকে চেষ্টার মাধ্যমে সামান্য উন্নত করা যায়, গতিশীল ও আকর্ষণীয় করা যায়। সর্বতোভাবে চেষ্টা করলে অবশ্যই প্রকৃতি দত্ত এই শক্তির বিকাশ সম্ভব। বিষয়টি আমাদের সকলের কাছেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে উন্নয়নের সম্ভাবনা সীমিত হলেও এ ব্যাপারে চেষ্টা চালানো অবশ্যই প্রয়োজন।
আপনি যদি আপনার ব্যক্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটাতে চান শ্রোতাদের সামনে ক্লান্ত দেহে যাবেন না। ক্লান্ত বক্তা কখনো দর্শকশ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয় না। সর্বশেষ মূহূর্ত পর্যন্তই আপনার প্রস্তুতিও পরিকল্পনা সম্পর্কে চিন্তা করবেন, যাতে কোনো ভুলত্রুটি হতে না পারে। এভাবে প্রস্তুতি নিলে সঠিকভাবেই বক্তব্য পেশ করা সহজতর হবে। তবে যে-সময় চলে গেছে; সে-সময়ের জন্য মনে চিন্তা রেখে প্রস্তুতি নিলে আপনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়বেন। যে সময় গেছে তা নয়, যে সময় হাতে আছে তাকে কাজে লাগাবার চিন্তা করুন, সেভাবে প্রস্তুতি গ্রহণই উত্তম পন্থা।
বিকেল ৪টায় যদি কোনো কমিটি বৈঠকে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেয়ার কথা থাকে তাহলে হাল্কা মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করুন। অতঃপর বিশ্রাম নিন, শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের ফাঁকে বিষয়টি ভেবে নিন। সুভাষণের জন্যে, এই বিশ্রাম বিশেষ প্রয়োজন।
গেরান্ডিন ফার সাধারণত রাতে বন্ধুদের সামান্য কথোপকথনের পরই বিদায় সম্ভাষণ জানাতেন। তিনি তার বক্তব্য সম্পর্কে চিন্তা করার সময় এবং বিশ্রাম নেয়ার জন্য বন্ধুদের তার স্বামীর কাছে বসিয়ে নিজের কাজে চলে যেতেন। মাদাম নর্ডিকা বলেছেন যে, সুবক্তা হতে হলে অথবা সুভাষণ প্রস্তুত করতে হলে সামাজিক ক্রিয়াকর্ম, বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎকার, খাদ্য গ্রহণ প্রভৃতি সকল বিষয়েই সংযম পালন করা প্রয়োজন।
আপনি যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের কথা চিন্তা করবেন তখন আপনাকে ক্ষুধা সম্পর্কে অবশ্যই সাবধান হতে হবে। প্রয়োজন আছে, তাই সামান্য খাদ্য গ্রহণ করুন। হেনরী ওয়ার্ড বেচার রাতে বক্তৃতার প্রস্তুতি হিসাবে রোববার বিকেল পাঁচটায় হাল্কা খাবার গ্রহণ করতেন, এই খাবারে থাকতো সামান্য নাস্তা ও সামান্য দুধ। এর বেশি তিনি আর কোনো খাবার খেতেন না। মাদার মেলবা বলেছেন, যে রাতে আমি গান গাই সে রাতের আগে বিকেল পাঁচটায় আমি নৈশভোজ গ্রহণ করি। সে খাদ্যে থাকে সামান্য মাছ মুরগির মাংস, সামান্য রুটি এবং পানি অথবা মিষ্টি রুটিও আপেল। ফলে গান গাওয়ার সময় আমি নিজেকে অত্যন্ত হাল্কা অনুভব করি। রাতে অনুষ্ঠান শেষে অবশ্য আমি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ি।”
একজন পেশাদার বক্তা হয়েও দৈনিক দুঘন্টা বক্তৃতাদানের অভ্যাস করার আগে পর্যন্ত আমি বুঝতে পারতাম না কেন মেলবা বেকার উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা লাভ করে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যেদিন আমি গুরুভোজন করে, কোনোরূপ বিশ্রাম না নিয়ে মঞ্চে দাঁড়াতাম সেদিন হয় শারীরিক বা মানসিক বা বক্তৃতার দিক দিয়ে আমি অসুবিধায় পড়তাম। মনে হত, আমার পেটের খাবার আমাকে বক্তৃতা করতে বাধা দিচ্ছে। আমার শরীর ভারী হয়ে আছে। পেডারেভস্কি, বলেছেন, কোনো কনসার্ট পার্টিতে অংশ গ্রহণের আগে তিনি যেদিন গুরুভোজন অর্থাৎ নিজের ইচ্ছানুযায়ী খাবার খেতেন সেদিন তাঁর শরীর ভারী হয়ে যেতো এবং মঞ্চে হাতের আঙুল চলত না ঠিক ভাবে মনে হত আঙুলগুলো ভারী হয়ে গেছে ভীষণভাবে। ফলে সেদিন তাঁর অনুষ্ঠান জমত না।
শ্রোতার আকর্ষণ বক্তা হতে বক্তায় ভিন্নতর হয় কেন?
আপনার স্মরণ শক্তি যেন ভোতা হয়ে না পড়ে। কারণ এটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একজন বক্তা এবং বক্তৃতা শিক্ষকের যে সব প্রাথমিক গুণাবলি প্রয়োজন তা হচ্ছে চেতনা, সজীবতা ও উদ্যম। বন্য হাঁস যেভাবে বসন্তের শস্যক্ষেত্রে জমায়েত হয়, ঠিক সেভাবে প্রাণবন্ত বক্তার চতুর্দিকেও হয় শ্রোতার সমাবেশ।
