এই দুজনেই ছিলেন সফল বক্তা, সুবক্তা। কারণ তারা দু’জনই ছিলেন সচেতনও সাহসী। তাঁদের মধ্যে কেহ যদি অন্যকে অনুসরণ করতে চাইতেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হতেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের পথ অনুসরণ করেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সুতরাং তাদের অনুসরণ করুন।
এটা একটি সহজ নির্দেশ। কিন্তু এটা অনুসরণ করা কি সহজ? না তা নয়। মার্শাল ফেচ যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে বলেছেন, এটা বোঝা খুবই সহজ, কিন্তু কাজে লাগানো, বাস্তবায়িত করা অত্যন্ত কঠিন, এই নির্দেশের ক্ষেত্রে তা সত্য।
শ্রোতাদের সামনে স্বাভাবিক হতে হলে অভ্যাস প্রয়োজন। অভিনেতারা তা জানেন। চার বছরের একটি ছেলে বা মেয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে কোনো কিছুই স্বাভাবিক ‘আবৃত্তি করতে পারে কিন্তু সে শিশুর বয়স এখন ২৪ অথবা ৪৫ বছর হয় তখন কি তার পক্ষে ঠিক সেভাবে আবৃত্তি করা সম্ভব? চার বছরের শিশুর বোধশক্তি ছিল না, তাই সে পেরেছিল স্বাভাবিক হতে। কিন্তু বয়োবৃদ্ধির পর সেরূপ বোধশক্তি হীন হওয়া কি সম্ভব? এরূপ অনমনীয় শক্তি অর্জন করে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য পেশ করবেন বলে আশা করা, ঘুঘু সদৃশ ব্যক্তিও করতে পারবে না।
কোনো ব্যক্তিকে বক্তৃতা দান শেখানো ও প্রশিক্ষণ দেয়া তার স্বাভাবিক শক্তির ওপর আর একটি বিশেষ কিছু চাপানো হয়, এটা শুধুমাত্র তার তোতলানি বন্ধ করা, তাকে স্বাভাবিক করা এবং কোনো ব্যক্তি ধাক্কা মেরে ফেলে দিলে পড়ে যাওয়া মানুষটি যেরূপ ভাবে কথা বলে সেরূপ কথা বলতে তাকে উপযুক্ত করে তোলা। শত-শত বার আমি বক্তাদের তাদের বক্তৃতাদান কালে থামিয়ে দিয়েছি এবং তাদের মানুষের মতো বলতে উৎসাহিত করেছি। শত-শত রাতে আমি মানুষকে স্বাভাবিক নিয়মে বক্তৃতা করাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে ফিরেছি। বিশ্বাস করুন, আমি কথাকে যেভাবে বলে ফেলেছি, কাজটা কিন্তু তত সহজ নয়।
এবং আপনি এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা অর্জন করতে পারেন একমাত্র অভ্যাসের দ্বারা। আপনি অভ্যাস করলে দেখতে পারেন যে, আপনি অলঙ্কার পূর্ণ ভাষায় কথা বলতে পারছেন, স্বাভাবিক নিয়মে দ্রুততার সাথে কিছু প্রকাশ করতে পারছেন, “এখানে কি ভুল আছে, অনুসন্ধান করুন, সংশোধন করুন।” অতঃপর শ্রোতাদের মধ্যে থেকে এমন একজনকে বেছে নিন যাকে আপনি সবচাইতে বোকা মনে করেন। ভুলে যান সে সেখানে অন্য কোনো লোক আছে। তার সাথে কথা বলুন। কল্পনা করুন যে, সে আপনাকে কোনো প্রশ্ন করছে এবং আপনি তার উত্তর দিচ্ছেন। সে যদি দাঁড়ায় এবং কথা বলে এবং আপনাকে উত্তর দিতে হয়, তাহলে আপনার আলোচনা হয়ে পড়বে প্রশ্নোত্তর মূলক, স্বাভাবিক প্রত্যক্ষ। সুতরাং ঠিক এভাবে কল্পনা করে বক্তৃতা দান অভ্যাস করুন।
আপনার মন অতদূরে নিয়ে যান যেখানে প্রশ্ন করতে ও উত্তর দিতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ, আপনার বক্তব্য পেশকালে আপনি বলতে পারেন, “আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন আমার কাছে এর কি প্রমাণ আছে? আমার হাতে এর যথেষ্ট প্রমাণ আছে এবং তা হচ্ছে এই”অতঃপর কল্পিত প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকুন। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে করা যায়। এটা করলে বক্তৃতায় একঘেয়েমি দূর হয়। বক্তৃতা হয় অধিকতর প্রত্যক্ষ, আনন্দদায়ক কথোপকথন মূলক।
সরলতা, প্রচেষ্টা এবং সর্বোপরি আন্তরিক আগ্রহ আপনাকে সাহায্য করবে। যখন কোনো ব্যক্তি হয় তার অনুভূতির প্রভাবে প্রভাবিত, তার মনোভাব ঠিক সেভাবেই প্রকাশিত হয়। অনুভূতির প্রভাব তাকে দিয়ে কথা বলায়। সুতরাং যে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে কথা বলতে পারেন, কাজ করতে পারে এবং এই কাজ ও কথা হয় স্বাভাবিক।
পরিশেষে যে কথাটি বলতে হয়, তা হচ্ছে আপনি যা বলবেন তাতে মন প্রাণ ঢেলে দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে, স্বচ্ছ গতিতে তা প্রকাশের চেষ্টা করুন?
“আপনি কখনো ভুলবেন না” ইয়েল ধর্মশাস্ত্র স্কুলে বক্তৃতা কালে বলেছিলেন ডিন ব্রাউন, “সে বর্ণনা, বা সেবা সম্পর্কে লন্ডন শহরে শোনা বক্তৃতায় পুনরাবৃত্তি করেছিলেন আমার এক বন্ধু। এই প্রচারের উদ্যোক্তা ছিলেন জর্জ ম্যাকডোনাল্ড। তিনি সেদিন সকালে সেবা সম্পর্কে একাদশ অধ্যায় পাঠ করেন। ধর্মশাস্ত্রের ওপর বক্তৃতা করার সময় বিশ্বাস কী তা আমি আপনাদের কাছে বলবার চেষ্টা করব না। তত্ত্বের অধ্যাপকেরা আছেন যারা এ বিষয়টি আপনাদের ভালো বোঝাতে পারবেন। আমি শুধু আপনাদের বিশ্বাস অর্জনে সাহায্য করবো। তিনি কথাগুলো এমন ভাবে বললেন যে, সকল শ্রোতার মনে একটা বিশ্বাসের জন্ম নিল। কেননা তার কাজের সাথে সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর হৃদয়ের। আর বক্তৃতা হয়েছিল প্রাঞ্জল, তা ছিল তার হৃদয় উৎসারিত বক্তব্য।”
তাঁর কাজের সাথে অন্তরের সমন্বয় বা সংযোগ ঘটেছিল, এটাই গোপন তথ্য। এতৎসত্ত্বেও আমি জানি যে, এই উপদেশ তেমন জনপ্রিয় নয়। সাধারণ ছাত্ররা আরো সাধারণ নিয়ম চান, নিশ্চিত কিছু চান। এমন কিছু চান যাতে তিনি হাত দিতে পারেন। গাড়ি চালানোর যেমন নিয়ম আছে, চান ঠিক তেমন নিয়ম।
এটাই তিনি চান, আমিও তাকে দিতে চাই। এটা তার জন্যে সহজ হবে, আমার জন্যেও সহজ হবে। এ ধরনের নিয়ম আছে, সেখানে শুধু সামান্য ত্রুটি আছে, যা অবশ্য ব্যবহার্য নয়। তাহলে বক্তৃতা স্বাভাবিক ভাবে মন দিয়ে রসকষপূর্ণ বক্তব্য পেশ করতে পারবেন। আমার যৌবনে আমি তাদের জন্যে বহু সময় নষ্ট করেছি; কিন্তু তাদের নাম এই পৃষ্ঠায় উল্লেখ করার উপযুক্ত হয় নি। জনবিলিং একদা বলেছিলেন, সংসারে এমন অনেক কিছু আছে যা সবার জন্য প্রয়োজনীয়।
