সাধারণ কথোপকথনে তিনি যেভাবে কথা বলেন, সেভাবে বলবেন, তবে বক্তৃতা কালে জোর একটু বেশি দিতে হবে অর্থাৎ বড় করে বলতে হবে। এমনভাবে বলতে হবে যাতে শ্রোতারা শুনতে পায়। একজনের সাথে কথা যেভাবে বলেন চল্লিশ জনের সামনে বলতে ঠিক সেরূপ ধ্বনিতে বলা চলবে না, বড় করে শব্দ পরিষ্কার করে বলতে হবে যাতে শুনতে ও বুঝতে কারো অসুবিধা না হয়।
নাবাদার খনিতে মার্কটোয়েনকে একজন শ্রমিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এখন যেভাবে বক্তৃতা করছেন এটাই কী আপনার স্বাভাবিক গলার বাকপটুতা?
শ্রোতারা চান বক্তার ‘স্বাভাবিক গলার বাকপটুতা’ নিম্নস্বরও নয়, গলাফাটা চিৎকারও নয়?
ঘরোয়া বৈঠকে বক্তৃতা আর প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতা এক নয়, ঘরোয়া পরিবেশে অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রকাশ্য সভায় সফল হওয়া যায় না। বলেছেন জন হেনরী স্মিথ!
আমি একজন বিশিষ্ট উপন্যাসিকের বক্তৃতার কথা বর্ণনা করেছি। সে হলরুমে তিনি বক্তৃতা করেছেন। ঠিক সেই হলরুমে, কয়েক মাস পরে স্যার অলিভার লজ বক্তৃতা করেন। সেই বক্তৃতাটি শোনার সুযোগও আমার হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য বিষয়টি ছিল এ্যাটম ও বিশ্ব। অর্ধশতাব্দী তিনি এই বিষয়টির উপর অধ্যয়ন, গবেষণা, পরীক্ষা ও চিন্তা করেছেন। সুতরাং বিষয়টি তার মন হৃদয় মস্তিষ্ক ও জীবনের সাথে সংযুক্ত। বিষয়টির আগাগোড়া তাঁর নখদর্পণে। এতৎসত্ত্বেও বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে তিনি হঠাৎ বোবা হয়ে পড়েন। কারণ তিনি বক্তৃতা করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। বিষয়টি তিনি জানতেন, ভালো ভাবেই জানতেন, কেহ প্রশ্ন করলে অত্যন্ত সহজ সরল ও সাবলীল ভাষায় তা বুঝিয়ে দিতে পারতেন,প্রশ্নকর্তাকে পরিতৃপ্তি দিতে পারতেন, সন্তুষ্ট করতে পারতেন। এ্যাটম বা অনুসম্পর্কে প্রশ্নকর্তাও তার সদুত্তর পেতেন। তিনি এমনভাবে বলতে পারতেন শুনে মনে হত তিনি যা দেখছেন ভাবছেন বুঝছেন অনুভব করছেন আমরা ঠিক তাই দেখছি ভাবছি বুঝছি অনুভব করছি। কিন্তু বক্তৃতা প্রদান তা নয়।
বিষয়টি জানা ছিল বলে তিনি অবস্থা কটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। এর ফল কী হয়? তিনি আকর্ষণীয় বক্তৃতা করেন। শ্রোতাদের বিমোহিত করেন। তিনি একজন শক্তিমান বক্তা বলে প্রমাণিত হন। কিন্তু আমি নিশ্চিত ভাবে জানি, তিনি নিজেকে তেমন ভাবেন না। আমি এটাও নিশ্চিত যে কিছু লোক বুঝতে পেরেছে তিনি মোটেই সুবক্তা নন।
এই বই পড়ে যদি আপনি বক্তৃতা করতে শুরু করেন শ্রোতারা আপনার বক্তৃতা শোনে তাহলে আমাকে কোনোরূপ কৃতিত্ব দেয়া প্রয়োজন নেই। কারণ শ্রোতারা শুনলেই বক্তা হওয়া যায় না বা বক্তৃতা হয় না, বক্তৃতা হবে সেটি যে বক্তৃতা আপনি শিখে গেলেও শ্রোতারা কোনো ভাবেই ধরতে পারবে না যে আপনি শিখা বক্তৃতা পেশ করেছেন। আপনার বক্তৃতায় সেরূপ স্বাভাবিকতা থাকতে হবে। যে বক্তা বক্তৃতাকারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে পারেন, শ্রোতা তাকে সুবক্তা বলে মনে করেন, তাঁর বক্তৃতা করার ধরনও বা যাই হোক না। সুতরাং স্বাভাবিকতা রক্ষা করতে পারায় সুভাষণের একটি বিশেষ গুণ।
হেনরি ফোর্ডের উপদেশ :
“সকল ফোর্ডই প্রায় একরূপ” একটি প্রচলিত প্রবচন কিন্তু যে কোনো দু’ব্যক্তি ঠিক একরূপ হয় না। বিশ্বের প্রতিটি জীবই স্বতন্ত্র, এখানে নতুন যে আসে তার সাথে পুরাতনের হুবহু মিল থাকে না, পুরাতন একই রূপ নিয়ে আবার আসে না। একজন তরুণকে তার নিজের সম্পর্কে ঠিক এই ধারণা গ্রহণ করতে হবে, তাকে ঐরূপ ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে হবে যা তাকে অন্যান্য হতে স্বতন্ত্র করে এবং সে গুণই তার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। সমাজ ও শিক্ষালয় তার এরূপ গুণগত উৎকর্ষ সাধনে সাহায্য করতে পারে, আমাদিগকে একই রূপ করে তোলার প্রচেষ্টা ঠিক নয়? সুতরাং নিজেকে স্বতন্ত্র করে তোলার ক্ষেত্রে নিজেরও বিশেষ চেষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে।
বক্তৃতা শেখার ব্যাপারে বিষয়টি আরো সত্য। এ বিশ্ব সংসারে আপনার মতো কোনো মানুষ নেই। লাখ-লাখ লোকের দুটি চোখ, নাক ও মুখ আছে, কিন্তু তাদের কারো চেহারাই আপনার সাথে মিলবে না, এবং তাদের মধ্যে কেহ-কেহ অবশ্য আপনি যে ভাবে বলেন ঠিক সেভাবে কথা বলতে সক্ষম হতে পারেন। অন্য কথায়, আপনার একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে। বক্তা হিসাবে এটা আপনার বিশেষ মূল্যবান গুণ। দৃঢ়তার সাথে এগুলোর উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করুন। ফলে আপনার বক্তব্য জোরদার হবে, এভাবেই আপনি গুরুত্ব অর্জন করতে সক্ষম হবেন।
স্যার অলিভার লজ যে বক্তৃতা করতেন তা অন্যান্যদের থেকে স্বতন্ত্র হত, কারণ তিনি নিজেও ছিলেন। স্বতন্ত্র ব্যক্তি। মানুষের দাড়িগোঁফ ও চুলহীন মস্তিষ্ক যেমন একরূপ না ঠিক সেভাবে দুজনের বক্তৃতা একরূপ হয় না। যদি কেহ লয়েড জর্জকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুকরণ করতে চায় তাহলে সে ব্যর্থ হবে, হতে বাধ্য।
আমেরিকায় সবচাইতে প্রসিদ্ধি অর্জনকারী বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় সিনেটর স্টিফেন এ. ডগলাস আব্রাহাম লিংকনের মধ্যে, ১৮৫৮ সালে ইলিনয়েচ শহরে। লিংকন ছিলেন লম্বা ও ছিপছিপে, ডগলাস ছিলেন বেঁটে ও মোটা। শরীরের মতো এই দু ব্যক্তির চরিত্র, মনোভাব ব্যক্তিত্ব এবং স্বভাবও ছিল ভিন্ন ধরনের।
ডগলাস ছিলেন বিশ্বের সেরা সংস্কৃতিবান ব্যক্তি, লিংকন এসেছিলেন নিম্নস্তর হতে সম্মুখ ভাগে। ডগলাসের অঙ্গভঙ্গি ছিল মাধুর্যপূর্ণ। লিংকনের অঙ্গভঙ্গি ছিল এলোমেলো। ডগলাসের বক্তব্য হত ব্যঙ্গ কৌতুকপূর্ণ, লিংকন ছিলেন শ্রেষ্ঠতম গল্পকার। ডগলাসের ভাষা ছিল সহজতর। লিংকন উপমা ও উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। ডগলাস ছিলেন গর্বিত ও কর্তৃত্ব প্রয়াশী। লিংকন ছিলেন নম্রও ক্ষমাশীল, ডগলাস চিন্তা করতে পারতেন দ্রুত। লিংকনের মানসিক ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত শ্লথ। ডগলাস ঘূর্ণিঝড়ের প্রেরণা ও গতি নিয়ে বক্তৃতা করতেন। লিংকন নির্ঞ্ঝাট ও বিবেচক।
