মনোরম দৃশ্যের খ্যাতনামা চিত্রগ্রাহক কেল্টিন হার্লি এই সফরকালে কিছু পথ তাদের সাথে ছিলেন এবং মুভি ক্যামেরায় ছবি তুলেছেন। আমি তাঁদের এই সফর সম্পর্কে বক্তৃতা শেখাই এবং বক্তৃতা পরিবেশনের পদ্ধতি শিক্ষা দেই। লন্ডনের ফিলারমনিক হলে চার মাস ধরে দিনে দু’বার করে বক্তৃতা চলে। একজন বিকালে অপরজন রাতে বক্তৃতা করেন।
তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল একইরূপ, কেননা, তাঁরা পাশাপাশি বসেই বিশ্বের অর্ধেক ভ্রমণ করেছেন, তাঁদের বক্তৃতার বিষয়ও ছিল অভিন্ন এবং শব্দগত ভাবেও ছিল মিল এতৎসত্বেও বক্তৃতার ধারণা কিন্তু একইরূপ শোনাত না।
এই বক্তৃতার শব্দের সাথে আরো একটি জিনিস ছিল সেটি হচ্ছে বলার ধরন, প্রকাশ ভঙ্গি। ”আপনি কী বলবেন তার চাইতে কীভাবে বলবেন সেটা অধিক মূল্যবান।”
একবার এক সঙ্গীতানুষ্ঠানে জনৈকা তরুণীর পাশে আমি বসেছিলাম। আমি দেখেছি, কাজুরকা বাজানোর সময় সে তরুণী বই পড়ছে, এর কারণ হচ্ছে সুর তার বোধগম্য হচ্ছিল না। অতঃপর শিল্পী যখন আকর্ষণীয় অঙ্গভঙ্গিতে একটি সুর পরিবেশন করতে শুরু করে তরুণীটিও তখন বই বন্ধ করে মঞ্চের দিতে তাকায় নিবিষ্ট চিত্তে, শোনে সে সুর নিবিষ্ট চিত্তে, যদিও সে সুরের কোনো অর্থ তার মর্মে পশছিল না, সুর প্রকাশের ভঙ্গি, পরিবেশনের ভঙ্গি তরুণীটিকে জাগিয়ে তোলে, আকর্ষিত করে, না বুঝলেও তন্ময় হয়ে শোনে, তরুণী আনন্দ পায়।
খ্যাতনামা রুশ চিত্র শিল্পী ব্ৰলফ একবার তার এক ছাত্রের একটি চিত্র সংশোধন করেন। ছাত্রটি তার সংশোধিত চিত্রটির প্রতি দেখেন এবং বিস্মিত কণ্ঠে বলেন।”আপনার ক্ষুদ্র আঁচড়ের ফলে চিত্রটিই পরিচিত হয়ে গেছে।” ব্রুফ বলেন, “ক্ষুদ্র আঁচড়েই শিল্পের জন্ম।” শিল্পের মতো ভাষণ প্রদানের ক্ষেত্রেও এটি একইভাবে সত্য।
শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও এটি একইভাবে প্রযোজ্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি পুরাতন প্রবাদ আছে, কী বিষয়ে বলা হচ্ছে তা নয়, কীভাবে বলা হচ্ছে তার উপরই সাফল্য নির্ভর করে।
সুবাচন ভঙ্গি যে কোনো সামান্য বিষয়কেও গুরুত্বপূর্ণ, আকর্ষণীয়, হৃদয় গ্রাহী করে তোলে। আমি সবসময় এটা লক্ষ্য করেছি যে, কলেজে বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় যেসব ছাত্র জয়লাভ করতো তাদের সবার জয় বিষয়বস্তুর জন্যে হত না, হত প্রকাশ ভঙ্গির জন্যে। যে বক্তা প্রাঞ্জল, আকর্ষণীয় ও সুললিত ভাষায় বক্তৃতা করতে পারতেন, বিষয়টি যাই হোক না কেন তার ভাষণ হয় হৃদয়গ্রাহী।
”একটা ভাষণে তিনটি জিনিস থাকে,“ বলেছেন লর্ডমলে, সেগুলো হচ্ছে, কে বললেন, কীভাবে বললেন এবং এগুলোর মধ্যে শেষটির গুরুত্বও কম নয়। এটা কী বাড়িয়ে বলা? মোটে না। বাস্তব অনুসন্ধান করলে আপনি এর সত্যতার প্রমাণ পাবেন।
লর্ড এডমান্ডবার্ক লিখিত ভাষণগুলো এতো সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ তথ্যসমৃদ্ধ ও রসপূর্ণ হত যে তা আজো কথাসাহিত্যের ক্লাসিক হিসাবে পাঠ করা হয়। কিন্তু এটা সত্য যে বক্তা হিসবে বার্ক ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাঁর বক্তৃতা করার ক্ষমতা ছিল নড়বড়ে। বক্তব্যকে তিনি করতে পারতেন না আকর্ষণীয় ও জোরদার; এবং হাউস অব কমন্সে তাঁকে বলা হত ‘ডিনারবেল’। যখন তিনি কিছু বলতে দাঁড়াবেন তখন অন্যান্য সদস্যরা হাঁচি দিতেন, কাশি দিতেন, তালগোল পাকিয়ে দলবদ্ধভাবে বেরিয়ে যেতেন।
আপনি আপনার সকল শক্তি দিয়ে যে কোনো ব্যক্তির উপর ইস্পাত জ্যাকেট বদ্ধ বুলেট নিক্ষেপ করতে পারেন, ঠিক মতো না লাগলে সে আঘাতে তার কাপড়ে আঁচড় পড়বে না। কিন্তু যদি কিছু পাউডার কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করেন বা ছিটান তা হবে সামান্য কিছু হলেও তার গায়ে পড়বে। সুতরাং বক্তৃতায় ইস্পাত বর্মাচ্ছাদিত বুলেটের চাইতে পাউডার সদৃশ কাহিনী অনেক ভালো, ফলপ্রসু। সুতরাং বক্তৃতার কালে বক্তব্য হতে বাচনভঙ্গির উপর জোর দেয়া, গুরুত্ব দেয়া অনেক বেশি ভালো; ফলপ্রসূ।
সুভাষণের গোপন কথা :
বক্তৃতাদানের পদ্ধতি সম্পর্কে বহু অন্তহীন ও একঘেয়ে কথা লেখা হয়েছে। এর ওপর নিয়ম কানুনের বহু পর্দা যোগিয়ে এটিকে আরো গুপ্ত রহস্যপূর্ণ করে তোলা হয়েছে, পুরাতন ধরনের বাকপটুতা বিষয়টিকে আরো ঘৃণিত ও বিদ্রুপাত্মক করে তুলেছে। ব্যবসায়ীরা পুস্তকের দোকানে বক্তৃতা সম্পর্কে বই অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে সব বই পান সেগুলোর অধিকাংশই তাদের জন্যে অপ্রয়োজনীয়। সামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও স্কুলে ছাত্রদের আজো ওয়েবেষ্টার এবং এনগারসোল পড়নো হয় যা কোনো অবস্থাতেই যুগোপযোগী নয়, যার স্টাইল হয়ে পড়েছে সেকেলে। মিসেস এগনার সেকে অথবা মিসেস ওয়েবেস্টার যে ধরনের টুপি পরতো আজ কেউ সে ধরনের টুপি পরলে হবেন উপহাস্যের পাত্র। তাঁদের স্টাইল অনুসরণও হবে ব্যঙ্গাত্মক।
গৃহযুদ্ধের পর বক্তৃতার ধরন এবং বক্তৃতাদান পদ্ধতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সময়ের সাথে সঙ্গতি রাখতে হলে, তাল মিলাতে হলে টেলিগ্রামের গতিতে পদ্ধতি বদলাতে হবে। অর্থহীন বাক্য, আজকের যুগে কোনো শ্রোতাই শুনবেন না, সহ্য করবেন না।
আধুনিক শ্রোতারা, তারা সংখ্যার পনেরো জন অথবা হাজার জন হতে পারেন, কামনা করেন যে, বক্তা যা বলবেন, সরাসরি বলবেন, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে শ্রোতারা, তারা সংখ্যার পনেরো জন অথবা হাজার জন হতে পারেন, কামনা করেন যে, বক্তা যা বলবেন, সরাসরি বলবেন, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলবেন না, যা বলবেন সহজভাবে বলবেন, সাবলীল ভাবে বলবেন, যাতে শ্রোতারা সরাসরি তা বুঝতে পারে। এমন ভাবে বলবেন, ঠিক যে ভাবে তিনি কথাবার্তা বলেন।
