লিংকন জানতেন। ভালো ভাবেই জানতেন। তিনি তার সারা জীবনে এক বছরের বেশি সময় স্কুলে যাবার সুযোগ পান নি। আর বই? লিংকন একবার বলেছেন, তিনি যে কোনো বই ধার করার জন্যে তার বাড়ি হতে পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। তাঁর ঘরে যারা রাতে কাঠ জ্বালাত এবং এই কঠের আলোতে তিনি পড়তেন। কখনো-কখনো পড়তে-পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন, ঘুম থেকে জেগে, চোখ রগড়ে আবার বইটি টেনে নিয়ে পড়তেন, পড়তেন গভীর মনোযোগ দিয়ে।
কোনো বক্তার বক্তৃতা শোনার জন্যে তিনি বিশ ত্রিশ মাইল দূরে চলে যেতেন। বক্তৃতা শুনে ঘরে ফিরে যত্রতত্র-মাঠে, বনে, জেন্ট্রি বিলের মুদি দোকানে বক্তৃতা অভ্যাস করতেন। তিনি নিউসালেম ও স্প্রিংফিল্ডএর সাহিত্য ও বিতর্ক ক্লাবের সদস্য হয়েছিলেন। এবং এখন আমরা যেমন যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি আলোচনা করি, তিনি ঠিক সেভাবে সকল বিষয় নিয়ে বক্তৃতা করতেন।
তবে তার মধ্যে সব সময় হীনম্মন্যতা বিরাজ করত। এটা তাকে পীড়া দিত। মহিলাদের উপস্থিতিতে তিনি লজ্জা পেতেন বোবা হয়ে যেতেন। মেরি টটের সাথে প্রণয় কালেও তিনি লাজ নম্রভাবে একান্তে বসে নীরবে তার কথা শুনতেন, কোনো কথা বলতেন না। কিন্তু এই লাজুক নম্র ব্যক্তিই অভ্যাস এবং ঘরে লেখা পড়া করে নিজেকে এরূপ বক্তা হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন, যিনি সাফল্যের সাথে প্রতিযোগিতা করেছেন, তকালের মার্জিতরুচি বক্তা সিনেটর ডগলাসের সাথে। তিনিই সেই ব্যক্তি যার গ্যাটিসবার্গের ভাষণ এবং হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় উদ্বোধনী ভাষণ মানবেতিহাসে অলংকারপূর্ণ বাকপটুতার উজ্জ্বল নজির হয়ে রয়েছে।
এটা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, যার মন ছিল এরূপ ভারাক্রান্ত, লজ্জাপূর্ণ তিনি লিখেন, “আপনি যদি নিজেকে একজন আইনজীবী রূপে গড়ে তোলার দৃঢ় ইচ্ছা গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে কাজটির অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে।”
প্রেসিডেন্টের দপ্তরে আব্রাহাম লিংকনের একটি সুন্দর ছবি ছিল। ”যখন আমাকে কোনো শক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়” বলেছেন থিওডর রুজভেল্ট ”যে বিষয়টি কঠিন, যাতে অধিকারও স্বার্থের সংঘাত আছে, আমি লিংকনের দিকে তাকাই, তাঁকে আমার স্থানে কল্পনা করার চেষ্ট করি, ইে অবস্থায় তিনি কী করতেন তা বের করার চেষ্টা করি। এটা আপনার কাছে শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু একথা সত্য যে, এটা আমাকে বিপদ হতে উদ্ধার করে এবং আমি সঠিক সমাধানে উপনীত হতে সক্ষম হই।”
রুজভেল্টের পরিকল্পনা কেন পরীক্ষা করব না? আপনি যদি ভালো বক্তা হতে চান তাহলে কেন আপনি জানতে চেষ্টা করবেন না আপনার অবস্থায় পড়লে লিংকন কী করতেন? আপনি জানেন তিনি কী করতেন! সিনেটের নির্বাচনে সংস্কৃতিবান, মার্জিতরুচি স্টেপেন এ ডগলাসের কাছে পরাজিত হবার পর তিনি তাঁর অনুগামীদের উপদেশ দিয়েছিলেন, “একবার নয়, শতবার পরাজয়েও হতাশার কিছু নেই।”
আমি কী আশা করতে পারি যে, হারবার্ডের খ্যাতনামা মনস্তত্ববিদ অধ্যাপক উইরিয়াম জেমস এর নিম্নবর্ণিত কথাগুলো মুখস্থ করা পর্যন্ত এই বইটি প্রতিদিন আপনার প্রাতরাশের টেবিলে খোলা থাকবে।
কোনো তরুণের মনেই সে যে বিষয়েরই ছাত্র হোক না কেন, তার শিক্ষা সম্পর্কে কোনোরূপ দুশ্চিন্তা থাকা উচিৎ নয়। সে যদি তার লেখাপড়া নিয়ে প্রতিটি কাজের দিনে মনে প্রাণে ব্যস্ত থাকে সাফল্য তার নিশ্চিত। সে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে যে, তার জীবনে ব্যর্থতা আসবে না এবং সে হবে না কলঙ্কিত। মনে এরূপ দৃঢ় আস্থার জন্যে অবশ্যই তাকে কাজের দিনের প্রতিটি ঘণ্টা মনে প্রাণে কাজ করতে হবে।
অধ্যাপক জেমস এর এই বক্তব্য ব্যাখ্যা করে আমি এখন বলতে পারি যে, বক্তৃতা শেখায় আপনি যদি এই অভ্যাস দৃঢ়তা ও বিশ্বস্ততার সাথে অব্যাহত রাখেন, বুদ্ধিমত্তার সাথে বক্তৃতা চর্চা করেন, আপনি নিজ মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে পারেন যে, আপনি একদিন আপনার শহর অথবা সমাজের যোগ্য বক্তা হতে পারবেন।
আপনার কাছে শুনতে যেরূপ লাগুক না কেন, সাধারণ নীতি হিসাবে এটা সত্য অবশ্য এতে ব্যতিক্রমও আছে। নিম্নমানের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন লোক, যার কোনো বিষয়েই তেমন জ্ঞান নেই, যে ডানিয়েল ওয়েব্রেস্টারের মতো বক্তা হবেন, না হতে পারবেন? এ প্রসঙ্গে আমি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি :
নিউজার্সির প্রাক্তন গভর্নর স্টোককে ট্রেনটনে আয়োজিত একটি বক্তৃতা শিক্ষা কোর্সের সমাপ্তি ভোজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, ঐ সন্ধ্যায় শিক্ষানবিশ ছাত্ররা যে বক্তৃতা করেছিলেন সে ধরনের বক্তৃতা তিনি ওয়াশিংটনে প্রতিনিধি সভা এবং সিনেটেই শুনছেন। কয়েক মাস আগে যে-সব ব্যবসায়ী শ্রোতা-ভীতিতে বোবা হয়ে যেতেন তারাই সেদিন বক্তৃতা করেছিলেন ট্রেনটনের ভোজে। তাদের মতো একই ধরনের ব্যবসায়ী আমেরিকার সকল শহরেই ছড়িয়ে রয়েছে। ব্যবসা জানলেও বক্তৃতা করা তাদের পক্ষে ছিল অকল্পনীয়, কিন্তু বক্তৃতা কোর্সে অংশ নিয়ে একদিন তাঁরা তাঁদের শহরে সক্ষম বক্তায় পরিণত হন।
বক্তা হিসাবে আপনার সাফল্য অর্জন দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করছে। তা হচ্ছে আপনার ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং বক্তৃতা শেখায় আপনার আগ্রহ ও সে আগ্রহের গভীরতা। প্রায় সকল বিষয়ে বলেছেন অধ্যাপক জেমস, “আপনার আগ্রহ আপনাকে জয়ী করবে। সুফল লাভ আপনার লক্ষ্য হলে আপনি নিশ্চিত ভাবেই তা লাভ করবেন। আপনি ধনী হতে চাইলে ধনী হবেন। জ্ঞানী হতে চাইলে জ্ঞানী হবেন, ভালো হতে চাইলে ভালো হবেন। তবে আপনাকে অবশ্যই তা হতে চাইতে হবে এবং হবার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে হবে, সাথে অন্য কোনো আকাক্ষা রেখে কাজ করলে চলবে না।” এবং অধ্যাপক জেমস সম গুরুত্বের সাথে সম্ভবত এটাও যোগ করতে পারেন, “আপনি যদি আত্মপ্রত্যয়ী সুবক্তা হতে চান তাহলে তা’হতে পারবেন,তবে আপনাকে অবশ্যই সে ইচ্ছা পোষণ করতে হবে।”
