একজন বক্তাকে জনসমক্ষে তার বক্তৃতা দেয়ার আগপর্যন্ত এরূপভাবে চিন্তা করতে হবে, নোট করতে হবে, নোট ভিত্তিতে বহু রচনা তৈরি করতে হবে, রচনা তৈরির কালে সংশোধন সংযোজন করতে হবে, ফলে বক্তব্য হবে অর্থবহ, বাক্য হবে সরস, ভাষা হবে প্রাঞ্জল, বলার গতি হবে সাবলীল, প্রকাশ ভঙ্গি হবে অবাধ।
একজন ভালো বক্তা বা সুবক্তা তাঁর বক্তব্য পেশের পর বক্তব্যের চারটি অর্থ বা চারটি দিক খুঁজে পান। সেগুলো হচ্ছে-(১) যে বক্তব্য পেশ করেছিলেন (২) যা জনসমক্ষে বলেছেন (৩) সংবাদপত্রে যা প্রকাশিত হয়েছে এবং (৪) বক্তৃতা শেষে তিনি তার বক্তৃতার অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে বা ভাবছেন এবং মনে করেছেন যে তার আরো কিছু বলার ছিল। সুতরাং একই বিষয়ে বক্তৃতা করতে হলে সুবক্তার বক্তব্য দ্বিতীয় বারে আরো ভালো হয়।
বক্তব্য পেশকালে আমি কি চিট ব্যবহার করব?
উপস্থিত বক্তৃতা সক্ষম একজন সুবক্তা হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট লিংকন হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর কখনো পূর্ব প্রস্তুতি, যথাযথ নোট ও লেখা ছাড়া কোনো ভাষণ দান করেন নি। এবং এমনকি মন্ত্রী সভায় ঘরোয়াভাবে কোনো আলোচনায়ও অংশ নেন নি। তবে অবশ্য তিনি তার উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন প্রস্তুতি ছাড়া। কিন্তু এর আগে ইলিয়নয়সে বক্তৃতা প্রদানকালে তিনি কখনো তেমন প্রস্তুতি নিতেন না, সাহায্য নিতেন না টিট এর। এ পদ্ধতি শ্রোতাকে সব সময় শ্রান্ত করে, কখনো বা বিভ্রান্ত করে; একদা তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
নোট করুন। প্রস্তুতিকালে এই নোট বক্তব্যকে সঠিক করবে, পুর্ণাঙ্গ করবে। আপনার পকেটে নোট থাকলে শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য পেশকালে কোনো পয়েন্ট বিস্মৃত হলেও আপনি বিমূঢ় হবেন না, তবে একেবারে বিপদে পতিত না হলে, অবর্ণনীয় দুর্দশায় পতিত না হলে, সম্পূর্ণরূপে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন না হলে এগুলো বের করবেন না। হাতুড়, করাতি, কুড়াল প্রভৃতি অস্ত্র মানুষ ব্যবহার করে নিতান্ত প্রয়োজনে এবং আপনিও এ সব নোট জরুরি অবস্থায় সাহায্যের জন্যে পকেটে রাখবেন। স্মরণ রাখবেন, এগুলি জরুরি অবস্থার জন্যে প্রয়োজনীয় অস্ত্র।
যা হোক, নোট সম্পর্কে যত কিছুই বলা হোক না কেন, নোট ব্যবহার পদ্ধতি নির্ভর করছে আপনার জ্ঞানের ওপর। কিছু বক্তা এমন আছেন যারা পূর্ণ প্রস্তুতি সত্ত্বেও বক্তৃতার প্রারম্ভে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন, বক্তব্য বিষয় ভুলে যান, ফলে তাঁর শেখা বিষয় ছেড়ে বক্তৃতা শুরু করে আবোল তাবোল বলতে শুরু করেন এসব বক্তার জন্যে পকেটে কিছু নোট রাখা অবশ্য প্রয়োজন। শিশু প্রথম হাঁটতে শিখলে কোনো কিছু ধরে হাঁটে, কিছুদিনপর তাকে আর কিছুর সাহায্য নিতে হয় না, স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারে। এমন বক্তা প্রথম অবস্থায় নোটের সাহায্য নিলে পরে সাধারণভাবে বক্তৃতা করতে সক্ষম হন।
জেনারেল গ্রান্টের বিমূঢ়তা :
লি যখন জেনারেল গ্রান্টকে আত্মসমর্পণের দলিল লেখার অনুরোধ জানান তখন ইউনিয়ন বাহিনী প্রধান জেনারেল পার্কারের কাছে গিয়ে লেখার বিষয় জানতে চান। জেনারেল গ্রান্ট তাঁর স্মৃতিতে লিখেছেন, “কাগজে আমি কলম বসাই, কিন্তু আত্মসমর্পণের শর্ত আমার থাকলেও প্রথমে কী শব্দ ব্যবহার করতে হবে তা আমার জানা ছিল না। আমার মনে যা ছিল আমি শুধু তাই জানতাম এবং তা প্রকাশ করাও আমার পক্ষে সহজ ছিল।”
জেনারেল গ্রান্ট, আপনার জন্যে প্রথম কিছু জানার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আপনার বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা ছিল, বিশ্বাস ছিল, আপনি কী বলতে চান তা আপনার মনে পরিষ্কার ছিল। অর্থাৎ আত্মসমর্পণ সম্পর্কে আপনার মনে যে ধারণা ছিল, বিশ্বাস ছিল তা আপনি স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করতে সক্ষম ছিলেন শুধু মাত্র প্রথম শব্দটি ব্যবহার ছাড়া। এটা যে কোনো লোকের জন্যই শুভ লক্ষণ। আপনি যদি এতে সন্দেহ করেন, তা হলে যে কোনো লোককে লাথি মেরে ফেলে দিন, দেখবেন সে উঠতে পারলে আপনাকে কিছু বলতে পারবে না, ভাষা আসবে না। প্রথম শব্দ ব্যবহার করতে না পারাও অনুরূপ ঘটনা।
দুই হাজার বছর আগে হোরাম লিখেছেন,
শব্দ নয়, অনুসন্ধান করা তথ্যও যুক্তি
চিন্তা স্বচ্ছ হলে শব্দ পাবে স্বাভাবিক মুক্তি।
আপনার মনে আপনার ধারণা বদ্ধমূল হলে আপনি আপনার বক্তৃতা প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত মহলা দিন। নীরবে করুন নিভৃতে করুন, মনে করুন পানাহারকালে, রাস্তায় চলাফেরার সময়, কোনো ব্যক্তির জন্যে অপেক্ষা করার সময় নীরবে নিভৃতে মহলা দিন। অতঃপর কোনো একটি নির্জন ঘরে একাকী বসে, কাজ করে, এই মহলা দিন। এতে শক্তি প্রয়োগ করুন, বক্তব্য পেশকালে যেরূপ অনুভব করবেন তার মহলা দিন। ক্যান্টার নগরে ক্যানন নক্স লিটল বলতেন, একজন ধর্মপ্রচারক যে ধর্মবিষয়ক বক্তৃতা দেন জনসমক্ষে প্রচারের আগে তিনি তা নিজে অন্তত, অর্ধ ডজন বার মহলা না দিলে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। আপনার বক্তব্য আপনি বার-বার নিজে মহলা না দিয়ে জনসমক্ষে পেশ করলে হৃদয়গ্রাহী এবং গ্রহণযোগ্য হবে বলে কি আপনি মনে করেন? অভ্যাস কালে, মহলা কালে আপনি মনে করুন আপনার সামনে শ্রোতা আছে। এরূপ কল্পনা করলে মহলা সঠিকভাবে হবে এবং পরবর্তীকালেও কোনো অসুবিধা হবে না।
