থিওডর রুজভেন্ট রুজভেলিটান পদ্ধতিতেই তার বক্তৃতা প্রস্তুত করতেন। তিনি সকল তথ্য সংগ্রহ করতেন, অতঃপর তা পর্যালোচনা করতেন, পর্যবেক্ষণ করতেন, ব্যাখ্যা করতেন, পরিশেষে তিনি বিষয়টি নিয়ে উপসংহারে উপনীত হতেন, চূড়ান্তভাবে বিষয়টির মীমাংসা করে নিতেন।
অতঃপর চিট সমূহ সামনে নিয়ে বসে তিনি তাঁর বক্তৃতার ডিকটেশান এত দ্রুত দিতেন যে, তিনি মনে করতেন ডিকটেশন দ্রুত হলে তার বক্তব্য হবে স্বতঃস্ফুর্ত ও জীবন্ত।
অতঃপর তিনি টাইপ কপি নিয়ে তা সংশোধন সংযোজন করতেন, কখনো নতুন শব্দ বাক্য যোগ করতেন, বাদ দিতেন। পেন্সিলের দাগে পৃষ্ঠা পূর্ণ হয়ে গেলে তিনি আবার তা ডিকটেট করতেন। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া আমি কখনো কিছু লাভ করি নি, বলেছেন থিওডর রুজভেন্ট, ‘পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বক্তৃতা প্রণয়ন সব কাজেই আমি সব সময় কঠোর পরিশ্রম করি। তা অনেক আগে থেকেই আমি কাজ শুরু করি।”
অনেক সময় তিনি সমালোচকদের ডেকে পাঠাতেন এবং তারে কাছে তাঁর বক্তব্য পাঠ করতেন, কিন্তু তার সম্পর্কে কোনোরূপ বিতর্কে অংশ নিতেন না।
কারণ তিনি তাঁর বক্তব্য সম্পন্ধে মন স্থির করে নিয়েছেন, তিনি কী বলবেন সে সম্পর্কে কোনো পরামর্শ চাইতেন না, কীভাবে বলবেন সে সম্পর্কেই পরামর্শ চাইতেন। টাইপ করা অনুলিপি তিনি বার বার পড়তেন, কাটতেন, শুদ্ধ করতেন, উন্নত করতেন, এই বক্তব্য সংবাদপত্রে ছাপা হত। অবশ্য তিনি তার এই বক্তব্য মুখস্থ করতেন না। তিনি মৌখিকভাবেই বক্তৃতা করতেন। সুতরাং তিনি যে বক্তৃতা দিতেন যা সংবাদ পত্রের প্রকাশিত হত সময়-সময় তার মধ্যে তারতম্য দেখা দিত। কিন্তু ডিক্টেট করা ও সংশোধন করার মধ্যে যে প্রস্তুতি চলতো তা উত্তম প্রস্তুতি। এর ফলে বিষয়বস্তু তার কাছে পরিচিত হয়ে যেত, তার প্রতিটি পয়েন্ট পর পর তিনি স্মরণ রাখতে পারেন। এরই ফলে তিনি তার বক্তব্য সহজে সচ্ছল গতিতে প্রকাশ করতে সক্ষম হতেন।
স্যার অলিভার লজ আমাকে বলেছেন যে, তাঁর বক্তব্য ডিক্টেট করে দ্রুতগতিতে যেভাবে তিনি জনসমক্ষে ভাষণ দেন ঠিক সে পদ্ধতিতে অর্থাৎ সেরূপ স্বরে ডিক্টেট করে তিনি উপলব্ধি করেছেন এটাই হচ্ছে বক্তৃতা প্রস্তুতি অভ্যাসের সর্বোত্তম পন্থা।
বক্তৃতা কোর্সে বহু সংখ্যক ছাত্র ডিক্টাফোনে তাদের বক্তৃতা ডিক্টেট করাকে উজ্জ্বলতম পন্থা বলে উপলব্ধি করে, কেননা এর ফলে তারা তাদের বক্তৃতা আবার নিজেরা শুনতে পায়। সংশোধন করে নিতে পারে। সুতরাং এই পদ্ধতিকে আমিও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি মনে করি।
আপনি যা বলতে চান তা লিখতে বসলে বিষয়টি সম্পর্কে আপনি চিন্তা করতে বাধ্য হবেন। ফলে আপনার ধারণা আরো পরিষ্কার হবে, স্মরণ থাকবে। আপনার মনের অস্থিরতা কমবে, আপনার চিন্তা ও বলার শক্তি বাড়বে।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তার আত্মজীবনীতে কীভাবে তিনি তার রচনাশৈলী, শব্দচয়ন এবং চিন্তাধারাকে সুসজ্জিত সুবিন্যস্ত করতেন তার ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর জীবনের এই কাহিনী পাণ্ডিত্য সাহিত্যপূর্ণ যা অন্যান্য প্রাচীন পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাহিত্য কর্মের মতোই সুখপাঠ্য উপভোগ্য। তার এই লেখা অত্যন্ত উন্নতমানের ভাষা ও শব্দ সমৃদ্ধ। যে কোনো হবু লেখক ও বক্তা এটা পড়ে আনন্দ পাবেন, উপকৃত হবেন। আমার মনে হয়, আপনি এটি পড়তে আগ্রহী হবেন, এটি হচ্ছে :
এই সময়ে প্রাচীন পুঁথি স্পেকটেটরের একটি অদ্ভুত খণ্ড আমার হাতে পড়ে। এটি ছিল তৃতীয় খণ্ড। আমি এর আগে বইটির কোনো সংখ্যা দেখি নি। আমি এটি ক্রয় করি এবং বার-বার পড়ে আনন্দ পাই। এর ভাষা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়, আমি ভাষার সাথে নিজেকে পরিচিত করতে আগ্রহী হই। এই উদ্দেশ্যে আমি কাগজপত্র নিই, এই বইতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাক্য সম্পর্কে চিট করতে শুরু করি, কয়েকদিন পর আমি বইটি থেকে নিজের ভাষায় বইটিতে ব্যবহৃত ভাব প্রকাশ করি। এই রচনায় আমার কলমে আনা সব শব্দ আমি ব্যবহার করি। অতঃপর আমি আমার লেখা মূল রচনার সাথে মিলিয়ে নিই, কতিপয় স্থানে আমার ভুল ধরা পড়লে আমি তা সংশোধন করি। এই কাজ করতে গিয়ে কতিপয় নতুন শব্দের সাথে আমার পরিচয় হয় যা আমি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে সক্ষম হই। এই আগে আমি কোনো কিছু রচনার কাজে হাত দিলে অবশ্যই আমি এ ধরনের নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হতে পারতাম, কিন্তু এক বই অনুসরণ ছাড়া অন্য কিছু রচনা করলে এভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এই ঘটনার পর আমি বইটি হতে কতিপয় গল্প সংগ্রহ করি। একই পদ্ধতিতে সেগুলি সম্পর্কে নোট করি। অতঃপর তা নিজের ভাষায় রচনা করি, মূল গল্পের সাথে মিলিয়ে সংশোধন করি। এর ফলে আমি আমার চিন্তাকে স্বচ্ছন্দ গতিতে সাজাবার কৌশল শিখতে পারি। এই পদ্ধতি কিছুদিন অব্যাহতভাবে অনুসরণ করার ফলে আমার ভাষাজ্ঞান উন্নত হয়। আমার ভাষা হয় স্বচ্ছন্দ সাবলীল। ফলে আমি ইংরেজি ভাষার একজন উঁচুদরের না হলেও গ্রহণযোগ্য লেখক হয়ে উঠি এবং আকাঙ্ক্ষা ছিল একজন লেখক হওয়া। ধৈর্যের সাথে নিজের নোট পরীক্ষা করুন : আগের পরিচ্ছেদ আপনাকে নোট করতে উপশে দেয়া হয়েছে। আপনার বিভিন্নমুখী ধ্যান ধারণা নোট করার পর সেসব নোট একত্রিত করে ধৈর্যের সাথে তা পরীক্ষা করুন। বিভিন্ন নোটের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি পরপর সাজান। একটি বিষয়ে আপনার মনের যে সব চিন্তা আপনি নোট করেছেন, পারস্পরিক সম্পর্কে যুক্ত পয়েন্টগুলি আপনি পর-পর সাজান, অতঃপর সেগুলি আবার ছোট-ছোট করে নিন, কিছু বাদ দিন, চিন্তা করুন, ফলে আরো কিছু আপনি যোগ করতে পারবেন, যত চিন্তা করবেন তত আপনার মনে নতুন ধারণা আসবে তা নোট করুন, পূর্ণ নোটের সাথে মিলিয়ে তা লিপিবদ্ধ করুন, ফলে আপনার রচনা প্রস্তুত হয়ে যাবে, আপনার বক্তৃতা তৈরি হয়ে যাবে।
