এইসব ঘটনা মরিস গোল্ডব্ল্যাটের ব্যক্তিত্বই আমাদের জয় করল। ঐকান্তিকতা, আগ্রহ, উৎসাহ-এই তিনটির সমন্বয়ে তিনি মুহূর্তেই আমাদের মন জয় করে নিয়েছিলেন, তাঁর বন্ধুত্বলাভ করে আমরাও ধন্য। এসবই তাঁকে মধুরতম করেছিল একজন ভাল বক্তা হওয়ার গুণে।
১. যোগ্যতা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করুন
কুইন্টিলিয়ান একজন বক্তাকে আখ্যা দেন এইভাবে কথা বলায় দক্ষ একজন ভালো মানুষ। একাগ্রতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্বন্ধে তিনি এটা বলেছিলেন। এ বইয়ে যাই বলা হোক বা নাই বলা হোক এর চেয়ে ভালো বিশ্লেষণ, বক্তা সম্পর্কে আর হয় না। পিয়েরপন্ট মর্গ্যান বলেছেন প্রশংসা আদায় করার শ্রেষ্ঠ উপায় হল চরিত্র। আর শ্রোতাদের বিশ্বাস অর্জন করার ব্যাপারেও এ কার্যকরী হয়।
আলেকজাণ্ডার উলকট বলেছিলেন, কোন মানুষ যখন আন্তরিকভাবে কথা বলেন তখন তার কথায় যে রঙ ফোটে তা কোন যাদুকর ও দেখাতে পারে না।
আসলে আমাদের বক্তব্যের যখন উদ্দেশ্য হয় বিশ্বাস জন্মানো, তখন দরকার হয় আমাদের অন্তর নিঃসৃত বিশ্বাসকে কথার মধ্য দিয়ে আন্তরিকতায় মেলে ধরা। অপরকে বিশ্বাস অর্জন করাতে হলে নিজেদের প্রথমেই নিশ্চিত হতে হয়।
২. শ্রোতাদের ‘হ্যাঁ’ বলতে চেষ্টা করুন
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার ডিল স্কট বলেছেন যে, ‘মনের মধ্যে যে প্রতিটি ধারণা ও আদর্শ বা উপসংহারের অস্তিত্ব থাকে তা সত্য, আর তা বাধাপ্রাপ্ত হয় শুধুমাত্র কোন বিরোধী ধারণা জেগে উঠলে তবেই।’
এরকম করতে সক্ষম হলে শ্রোতাদের ‘হ্যাঁ’ বলানো বেশ সহজও হয়ে ওঠে। নিউ ইয়র্কের এক স্কুলে এ ব্যাপারে মনস্তত্বের দিক থেকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেন আমার বিশেষ বন্ধু হ্যাঁরী ওভারস্ট্রিট। তিনি বলেন :
‘একজন দক্ষ বক্তা যদি কোন ভাবে শ্রোতাদের হ্যাঁ এই ভাবটুকু আদায় করতে পারেন তাহলে তিনি শ্রোতাদের মনস্তাত্ত্বিক অগ্রসর হওয়ার মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেন। এ অনেকটা কোন বিলিয়ার্ড খেলার বলের নড়াচড়ার মতোই। এই বিলিয়ার্ড বলকে ঠেলে দিন দেখবেন এটাকে ঠেলতে বেশ শক্তি লাগছে। উল্টো পথে পাঠানোর জন্য দরকার বেশি শক্তি।
এ ব্যাপারে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটি বেশ পরিষ্কারই বলা যায়। যখন শ্রোতাদের মধ্যে একজন বলে না আর বেশি জোরের সঙ্গেই তা বলে, তখন মাত্র ওই একটা কথাই সে বলে না। তার সমস্ত দেহতন্তু, স্নায়ু, পেশী একসঙ্গে মিলেই যেন প্রতিবাদে মুখর হতে চায়। অন্যদিকে যখন ‘হ্যাঁ’ জবাব আসে তখন প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের অবকাশ না থাকায় দেহের সমস্ত সত্তাই এগিয়ে আসে এবং তা সবকিছু তৎপর হতে চায়। এই জন্যই বলতে চাই আমরা যতখানি বেশি করে ‘হ্যাঁ’ ভাবটি জাগিয়ে তুলতে পারব ততই সহজে শ্রোতাদের মন জয় করে নিতেও পারব।
এই শ্রোতাদের দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলানো কাজটি অতি সহজেই বলা যায়। অথচ আশ্চর্যের কথা এই ব্যাপারটি কিভাবে সকলে অবহেলা করতে চান। প্রায়ই দেখা যায় বক্তা শ্রোতাদের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে যেয়ে প্রথমেই তাদের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে কি ভালো ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করতে পারব? বক্তা যদি একটু আনন্দের উদ্দেশ্য নিয়ে এরকম করতে চান, তাহলে তাকে ক্ষমা করা চলতে পারে। কিন্তু যদি দেখা যায় বিশেষ কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই তিনি সেটা করেছেন, তাহলে তাকে মনস্তাত্বিক দিক থেকে মূর্খই বলতে হয়।
কোন ছাত্রকে গোড়াতেই একবার কোন বিষয়ে ‘না’ বলতে দিয়ে দেখুন-শুধু ছাত্র নয়, কোন ক্রেতা, শিশু, স্বামী বা স্ত্রীকেও না বলতে দিন; এবার দেখবেন তাদের কাউকেই ‘হ্যাঁ’ বলাতে গেলে কি ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। আপনার সমস্ত প্রাণপাত চেষ্টাই বিফল হবে।
তাহলে গোড়াতেই এই ‘হ্যাঁ’ সাড়া পাওয়ার পথ কিভাবে পাওয়া যাবে? খুব সহজে। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন একবার এ সম্বন্ধে বলেন, কোন বিতর্কে জয়ী হওয়ার জন্যে প্রথমেই আমার চেষ্টা থাকতো উভয়ের মধ্যে কোথায় মিল আছে খুঁজে বের করতে। লিঙ্কন এই কৌশল খাঁটিয়েছিরেন সবচেয়ে স্পর্শকাতর সেই বিষয় সম্বন্ধেও-অর্থাৎ দাসপ্রথার অবলোপ। দি মিরর নামে নিরপেক্ষ এক সংবাদপত্র তাঁর কোন এক বক্তৃতার উল্লেখ করতে গিয়ে বলে, তার বিরোধীরা প্রথম আধ ঘন্টায় তিনি যা বলেছেন তার সঙ্গে একমত হন। সেই অবস্থা থেকেই তিনি তাদের একটু একটু করে বিপরীত পথে নিয়ে যেতে আরম্ভ করেন যতক্ষণ না মনে হয় তিনি সব বিরোধীদের একেবারেই বিপরীত বিন্দুতে এনে ফেলেছেন।’
এতে কি বুঝতে পারছেন না যে বক্তা তার শ্রোতাদের সঙ্গে গোড়া থেকেই তর্কে নেমে পড়েন, আসলে তিনি এতে তাদের জেদ আর বিরোধীতাই জাগিয়ে তোলার কাজটি করে ফেলেন। তারা সাবধান হয়ে যায়-আর তখন তাদের মন ঘোরানোর কোন কাজই সমাধা হতে পারে না। সে সময় একথা বলে লাভ হবে, আমি অমুক অমুক প্রমান করে দেব?’ তাতে কি আপনার শ্রোতারা মুচকি হেসে মনে মনে বলবেন না; দেখা যাক করুন তো একবার, দেখি?
তাহলে কি আপনি যদি শ্রোতা আর বক্তা দুপক্ষই যা বিশ্বাস করেন সেরকম কিছু বলে শুরু করলে ভাল করবেন না? তারপর এমন কিছু যোগ্য প্রশ্ন রাখবেন যা শ্রোতারা উত্তর দিতে তৈরি? এবার শ্রোতাদের এমনভাবে আগ্রহী করে তোলা চাই যাতে তারা আপনার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চলতে তৈরি হয়। মনে রাখবেন সবচেয়ে ভালো বিতর্ক হল যাকে সরল কোন ব্যাখ্যা বলে মনে হয়।
