আর ঠিক তখনি ইউমিনেস উপলব্ধি করলেন যে বিশাল ইন্দাস ভূমিতে আলেকজান্ডারের আক্রমণের সত্যিকার উদ্দেশ্য জানতে পেরেছে অ্যান্টিগোনাস। আলেকজান্ডার সেখানে কী খুঁজে পেয়েছিলেন তাও তার অজানা নয় আর দু’বছর পরে মহান বিজেতার মৃত্যুর কারণটাও স্পষ্টভাবেই জানে।
বন্ধু এবং সেক্রেটারি হিসেবে প্রথমে আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপের অধীনেই কাজ করেছিলেন ইউমিনেস। তারপর গুপ্তঘাতকের হাতে ফিলিপ মৃত্যুবরণ করার পর হয়ে উঠেন আলেকজান্ডারের চিফ সেক্রেটারি। “কিংস জার্নালস” বা রাজকীয় দিনলিপিতে রাজ্যের প্রতিদিনকার রেকর্ড রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন ইউমিনেস। কিন্তু জার্নাল ত্যাগ করার কারণটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আলেকজান্ডারের সত্যিকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক রেকর্ড এবং সেই মহারহস্য যা তাকে দেবতায় পরিণত করেছে।
যোলা বছর আগে, সিয়া মরুদ্যানে জিউস আমোনের মন্দিরে বিজেতার সঙ্গী হয়েছিলেন ইউমিনেস। আলেকজান্ডারকে বলা হয়েছিল যে তিনি জিউস আমোনের পুত্র। তার মানে তিনি নিজেই স্বয়ং একজন দেবতা।
আর তাই নিজের দেবতু প্রচারে একটুও সময় নষ্ট না করে পশ্চিম দিকে সিন্ধু নদীমুখে ছোটেন আলেকজান্ডার; যা তাকে সত্যিকার অর্থেই দেবতা বানিয়ে তুলবে। সেই মহারহস্য সম্পর্কে যত কাহিনি শুনেছেন সেসব থেকেই সঞ্চয় করেছেন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একগুয়ে জেদ; এমনকি সৈন্যদের ঘরে ফেরার আকুতিতেও কান দেননি তিনি।
দেবতাদের রহস্য লুকিয়ে রাখা সেই ভূগর্ভস্থ গুহার বাইরে আলেকজান্ডারের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ইউমিনেস। কিন্তু ভেতরে আলেকজান্ডার একাই গেছেন। বের হয়ে আসার পর দেখা গেল জয়ের গৌরবে জ্বলজ্বল করছে তার চেহারা। যা খুঁজতে এসেছিলেন, পেয়েছেন।
গোপন এই অভিযানের সফলতার প্রমাণ হিসেবে ঘরে ফেরার পথে দখল করেছেন মালিজ। আক্রমণের পুরোভাগে ছিলেন আলেকজান্ডার নিজে, দেয়াল বেয়ে উঠার সময় মই ভেঙে পড়ে যান দস্যুদের মাঝে। ফলে সৈন্যদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু তার দ্বীপ্তিময় মুখমন্ডল আর দেহবর্মের উজ্জ্বলতা দেখে প্রথম দিকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় দস্যুর দল; ভেবেছিল বুঝি স্বয়ং এক দেবতাই নেমে এসেছেন তাদের মাঝে! তবে পরক্ষণেই দ্বিধা সামলে উদ্ধত অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসে। আলেকজান্ডারের দুপাশে ছিল দুই গার্ড। পাজরে গেঁথে যাওয়া তীরের আঘাত সত্ত্বেও মেসিডোনিয়ানরা এসে তাঁকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত বীরের মতই লড়াই করেছেন।
কিন্তু ভাঙ্গা তীর বের করে আনার অস্ত্রোপাচারের সময় ক্যাম্প জুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজা মৃত্যুবরণ করেছেন। নৌকার উপর তার কেবিনের বাইরে দিনের পর দিন উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করেছেন ইউমিনেস। অবশেষে দুর্বলতা সত্ত্বেও ডেকের উপর বেরিয়ে এলেন জীবিত আলেকজান্ডার। ইউমিনেসের কানেও পৌঁছে গেল আলেকজান্ডারকে সারিয়ে তোলা সেই মিরাকলের ফিসফিসানি।
আঘাতটা অত্যন্ত মারাত্মক হওয়াতে প্রচুর রক্তক্ষরণও হয়েছে। চিকিৎসকেরাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। দেহের ভেতরকার ক্ষতের নিরাময় কিংবা রক্তক্ষরণের বিরুদ্ধেও কিছু করার ছিল না।
কিন্তু সবাই যখন অসহায়ের মত বসে বসে মৃত্যুর দিন গুনছিল, সেই সময়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলেন আলেকজান্ডার। অত্যন্ত ধীরে হলেও শুকাতে লাগল ক্ষত। তার আরোগ্য লাভ দেখে চিকিৎসকেরাও এবার তৎপর হয়ে উঠল। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সেরে উঠলেন রাজা। শুকিয়ে গেল ক্ষত এবং শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও দেখা দিলেন প্রজাদের সামনে।
রটনাগুলোকে যে কী বলা যায় তা ভেবে পেলেন না ইউমিনেস। কিন্তু সেদিন, বাকি সেনাবাহিনির মত নিজেও বিশ্বাস করে বসলেন যে আলেকজান্ডার সত্যিই একজন দেবতা। অমর, অবিনশ্বর। মানুষের জ্ঞাত কোনো অস্ত্রই তার কোনোরকম ক্ষতি করতে পারবে না। আর এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেবতাদের গুহার ভূমিকার কথাও জানতেন ইউমিনেস।
গুহাতে যে মহারহস্যই থাকুক না কেন, একাকি সে রাতে গুহার মাঝে আলেকজান্ডার যাই করে থাকুন না কেন এর প্রভাবেই ব্যাবিলনের শেষ দিনগুলোয় জ্বরে আচ্ছন্ন, অসম্ভব তৃষ্ণার্ত আলেকজান্ডার কথা বলার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। পূর্ণ হল আলেকজান্ডারের দেবতা হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা; কিন্তু বিনিময়ে দিতে হল জীবন।
ইউমিনেস এও জানেন যে এই রহস্যের কল্যাণেই ছয় দিন পার হয়ে গেলেও একটুও পচন ধরেনি আলেকজান্ডারের মৃতদেহে; এতটাই শ্বেতশুভ্র আর তরতাজা ছিল মনে হচ্ছিল যেন জীবিত আলেকজান্ডার ঘুমাচ্ছেন।
আর এখন তিনি নিজে বন্দী হয়ে আছেন আলেকজান্ডারের এক জেনারেলের হাতে। জানেন তাকে বাঁচতে দেয়া হবেনা।
সান্ত্বনা শুধু এটুকুই যে, সুরক্ষিত আছে আলেকজান্ডারের গোপণ রহস্য। ইউমিনেস অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে ক্যালিসথিনসের বই ‘ডিডস অব আলেকজান্ডার থেকে সবকিছু রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু এর পর পরই অফিশিয়াল জার্নাল থেকে এই বইয়ের সমস্ত অংশ সরিয়ে ফেলেছেন। যেখানে আলেকজান্ডারের হাতে মৃত্যুবরণের মাত্র কয়েকদিন আগেই উনার হয়ে সগডিয়ানের ভূমিতে এক গোপন মিশনের কথা লিখে গেছেন ইতিহাসবিদ ক্যালিসথিনস। এর পরিবর্তে ইউমিনেস নিজের গোপন জার্নালে আলেকজান্ডারের সাথে তার অভিজ্ঞতা আর ক্যালিসথিনসের মিশনের কথা লিখে লুকিয়ে রেখেছেন নিজের তাবুতে।