সুলতান মাহমূদের অবস্থা যখন চতুর্মুখী আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক দৈন্যতায় বিপর্যস্ত, সুলতানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে আচ্ছন্ন, ঠিক এই মুহূর্তে আঁধার ভেদ করে দেখা দিল আলোর আভা …।
চতুর্দিক থেকে গোয়েন্দা পরিবেশিত দুঃসংবাদের ঘনঘটা। রাজা জয়পাল আক্রমণ শানাচ্ছে। আমীর শ্রেণীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। গভীর দুশ্চিন্তায় তলিয়ে গেলেন সুলতান। নিজের আসনে বসে উদাস মনে উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ইত্যবসরে প্রহরী এসে খবর দিল, দু’জন আগন্তুক সুলতানের সাথে জরুরী সাক্ষাৎ করতে চায়। এরা চিস্তানের বাসিন্দা। সুলতান তাদেরকে হাজির করতে বললেন। তারা এল। সুলতান তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে কাছে ডাকলেন এবং আসার উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তারা বলল, আমরা চিস্তানের বাসিন্দা। আমাদের গ্রামে সুপেয় পানির অভাব। অনেক দূর থেকে আমাদেরকে খাবার পানি বহন করতে হয়। গ্রামের সবাই মিলে আমরা একটি কূপ খননের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। আমাদের ধারণা মতে পানি খুব বেশি গভীরে থাকার কথা নয় এবং জমিনও খুব বেশি শক্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মাত্র তিন হাত খননের পরই আর খনন করা সম্ভব হচ্ছিল না। পাথরের চেয়েও শক্ত মাটি দেখা গেল। খোরাসান ও চিস্তানের মহামান্য সুলতান! জমিন শক্ত ও পাথুরে হওয়াতে কোন সমস্যা ছিল না। আমরা তবুও খননকার্য অব্যাহত রাখতাম। কিন্তু তিন ফুট গভীরেই এমন মাটি দেখা দিল যে, আমাদের কোদাল, শাবল কোন কাজ করছিল না। আমরা জোরে আঘাত করলে মাটি থেকে আগুনের ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয়, কোদাল ভেঙ্গে যায়। কিন্তু পাথর ভাঙ্গে না। এটা নিছক পাথর নয়। পাথরের রঙ এমন নয়। আমাদের বিশ্বাস, এটা কোন মূল্যবান ধাতু হবে। অনেকেই বলাবলি করছে, আগেকার কোন রাজা-বাদশাহর গচ্ছিত ধন-সম্পদ এগুলো। যারা এই সমস্ত ধন-সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে তাদের প্রেতাত্মা ও জিনদের বসবাস এখানে। গ্রামের মানুষ এসব বলাবলি করে খুব ভীতু হয়ে পড়েছে। ভয়ে কেউ ওদিক মাড়াতে চায় না। একজন বুযুর্গ ব্যক্তি আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন সুলতানের কাছে এই খবর পৌঁছাতে। কারণ, যদি গচ্ছিত ধন-সম্পদ হয়ে থাকে তাহলে এগুলো উন্মুক্ত পড়ে রয়েছে। হেফাযত করা দরকার। আর কোন দামী ধাতু হলেও বিষয়টা সুলতানের নজরে থাকা উচিত।
সুলতান মাহমূদ তাদের কথা শুনে ভূমি সম্পর্কে কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং কয়েকজন কমান্ডারের সাথে কিছুসংখ্যক সৈন্য দিয়ে কথিত এলাকা পরিদর্শনের জন্য পাঠিয়ে দিলেন এবং বললেন, জিন-ভূত এসব কিছুই না। আপনারা ওখানে গিয়ে আরো খনন কার্য চালিয়ে ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আমাকে অবহিত করুন।
কয়েকদিন পর সুলতান মাহমূদকে খবর দেয়া হল, এটি কোন গুপ্তধন নয়, এটি স্বর্ণের খনি। ভূমি থেকে মাত্র চার-পাঁচ হাত গভীরে স্বর্ণস্তর। খনন করার পর বিরাট এলাকা জুড়ে স্বর্ণখনি দেখা গেল।
ঐতিহাসিক গারদেজী ও কাসেম ফেরেশতার মতে, সুলতান মাহমুদের শাসনামলেই ওই খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হয়। কিন্তু সুলতান মাহমুদের ইন্তেকালের পরে তার ছেলে মাসুদ যখন ক্ষমতায় আসীন হন তিনি পিতার নীতি আদর্শের পরিপন্থী কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি নিজেকে ভারতের হিন্দু রাজাদের মতো সুলতানের পরিবর্তে রাজা ঘোষণা করেন, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেন। উত্তোলিত স্বর্ণখনির আয় অনৈসলামিক কর্ম, বিনোদন, সাজসজ্জা, মিনাবাজার প্রতিষ্ঠা ও খেল-তামাশায় ব্যয় করতে থাকেন। তখন এক রাতের প্রচণ্ড ভূমিকম্পে স্বর্ণখনি মাটির গভীরে হারিয়ে গেল। পরবর্তীতে বহু খনন করেও মাসুদ আর স্বর্ণখনির অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন না।
স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হবার পর মাহমূদ যখন দেখলেন, প্রকৃত পক্ষে এটি খাঁটি স্বর্ণ খনি তখন তিনি তার পীর ও মুর্শিদ আবুল হাসান খেরকানির দরবারে হাজির হলেন এবং বললেন, “আমার আব্ব জীবদ্দশায় এই স্বর্ণখনিটিকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি একদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটি স্বর্ণের গাছ আমার ঘরের ছাদ ফুড়ে উপরের দিকে উঠেছে এবং এর ডালপালা অর্ধেক দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
…এরপর আমার জন্ম হলো। অবশ্য এ’স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করা হলো যে, আমার শাসনামলে গজনী সালতানাতের পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং দূরদূরান্ত পর্যন্ত ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়বে। এখন স্বর্ণখনি যা আবিষ্কৃত হলো সেটির অবস্থানও অনেকটা গাছের মতো। স্বর্ণের স্তর মাটির অল্প গভীরে গাছের ডালপালার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। আমার প্রিয় পীর ও মুর্শিদ! আপনি আমাকে মেহেরবানী করে বলুন, এসবের তাৎপর্য কী?”
“জমিনে এবং আসমানে আমাদের দৃষ্টিসীমার অগোচরে যা রয়েছে এর প্রকৃত কারণ একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন” বললেন, আবুল হাসান খেরকানী। “তুমি মনে মনে যা ধারণা করেছ আল্লাহ্ সেটিও জানেন। তুমি এখনও যা চিন্তা করোনি সে সম্পর্কেও আল্লাহ সম্যক অবগত। তোমার একথা অনুধাবন করা উচিত, আল্লাহ তাআলা সেইসব রাজা-বাদশাহকে এ ধরনের অলৌকিক ইশারা করে থাকেন যারা রাসূলের প্রকৃত উম্মত হয়ে থাকেন। তুমি যদি আল্লাহর রাসূলের প্রেমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যেই জিহাদ করে থাক তাহলে যে সমস্ত লোক মুসলমান হওয়ার পরও ইসলামের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন এবং ক্ষমতা ও রাজত্বের লোভে মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে, অহেতুক খুনোখুনি করছে আর তুমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে এখন অভাবে নিপতিত হয়েছ এবং তুমি শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা করছ। আল্লাহ তোমার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। গাছের আকৃতিতে তোমার অভাব পূরণে’মাটির ভেতর থেকে স্বর্ণখনি উন্মোচন করে দিয়েছেন।
