বাস্তবে ঋষির মন মগজে ইমরান স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। ইমরানের সান্নিধ্যের জন্যে ঋষির মন সময় সময় আনচান করে। ঋষির তুলনায় জামিলাও রূপ-সৌন্দর্যে কম নয়, কিন্তু মন বলে কথা। ঋষির বিপরীতে জামিলার প্রতি তার মনে বিন্দুমাত্র আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। পক্ষান্তরে ঋষি তার হৃদয়ে বারবার দ্বাদশীর চাঁদের মতোই উঁকি দিচ্ছে। অপরদিকে ঋষি ইমরানের সান্নিধ্যে আসার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠছে। ইমরানের সৌম্য কান্তি ঋষির মনে বারবার ভেসে উঠছিল। সে কিছুতেই তাকে বিস্মৃত হতে পারছে না।
জামিলা চলে যাওয়ার পর ইমরানের দায়িত্বের গুরুভারের কথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ইমরান ভাবল, গোয়েন্দাবৃত্তির গুরুদায়িত্ব তাকে দৃশ্যত পাথর বানিয়ে রেখেছে। গোয়েন্দা দায়িত্ব পালনে নিজের আত্মপরিচয় গোপন রাখতে সফল হয়েছিল সে। দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থেই সে রাজমহলে নৌকরি নিয়েছে।
রাজকর্মচারী হিসেবে জয়পালের কার্যক্রম সম্পর্কে ভেতরের খবর অতি সহজে সংগ্রহ করতে পারছিল। ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংবাদ সে গজনীর সুলতান সুবক্তগীনের কাছে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আকস্মিকভাবে ঋষি ও জামিলা তার মধ্যে মানবিক তাড়না উত্সকে দেয়। মানব-মানবীর জৈবিক তাড়না তাকে এখন ছিঁড়ে খাচ্ছে। একাকী সে দায়িত্বের গুরুভার অনুভব করছিল এবং এই সমীকরণে পৌঁছতে সক্ষম হয়, ঋষি ও জামিলার কামনার ঝড় তাকে দায়িত্বের কঠিন অনুশীলন ও একাগ্রতা থেকে বিচ্যুত করতে পারে। আজকের পরিস্থিতিতে বুঝতে পারল, এখন থেকে তার ঘরে রীতিমত ঋষি ও জামিলার আগমন ঘটবে এবং এরা তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করবে। সে একাকী ঠিক করল, তার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন থেকে বিচ্যুত হওয়া একটা জাতির সাথে বেঈমানীর নামান্তর। তাই সে ওদের কিছু না জানিয়েই দূর এলাকায় ঘর দেখার সিদ্ধান্ত নিল। সেই সাথে এও ঠিক করল, অচিরেই সে লাহোর থেকে গজনী চলে যাবে।
সিদ্ধান্ত যাই নিক, দায়িত্বজ্ঞান যতই থাক, রক্ত-মাংসেই গড়া একজন মানুষ ইমরান। নারীর রূপ-সৌন্দর্য যে কোন কঠিন পুরুষকেও কাবু করতে সক্ষম। ইমরানের বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটল না। দুই নারীর যন্ত্রণায় পিষ্ট হতে লাগল ইমরান। ভিতরে ভিতরে তার মধ্যে নারী ও গোয়েন্দা কর্তব্য দারুণ সংঘাতের জন্ম দেয়।
পরদিন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলেই ইমরানের ঘরে হানা দিল ঋষি। এটা ছিল ঋষির দ্বিতীয়বার ইমরানের সংস্পর্শে আসা। ঋষির ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ছোটবেলা থেকেই ইমরান তার পরিচিত, দুজন একসাথে হেসে খেলেই বড় হয়েছে যেন।
‘গতকাল তুমি বলেছিলে আমার শবদেহকে তুমি জ্বলতে দেবে না। একথা কেন বলেছিলে’? জিজ্ঞেস করল ঋষি।
প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে ইমরান বলল, ‘গতকাল তুমি এখানে এসেছিলে তোমার ভাইয়ের খোঁজে। আজ কেন আসলে?
“তোমাকে দেখতে এসেছি।”
“কেন?”
‘তুমি আমাকে জ্বলতে দেবে না কেন তা জানতে। গতকাল তোমাকে বলতে পারিনি। একসেনা কর্মকর্তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে রয়েছে।‘
“আর সে গজনী অভিযানে যাবে। তোমার জীবনও বোনের মতই চিতার আগুনে জ্বলে ভম হয়ে যাবে।”
“এসব লোকগুলো নারীকে মানুষই মনে করে না। দেবতাদের জন্যে শুধু মেয়েদের কেন বলী দেয়া হবে, বলী কি কোন পুরুষ মানুষকে দিতে পারে না?” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল ঋষি।
“তোমাদের ধর্মে তোমার প্রশ্নের কোন জবাব নেই ঋষি। আমার ধর্মে মানুষ বলিদানের কোন রীতি নেই।”
“আমি পুড়ে মরতে চাই না। আর পালিয়ে বাঁচার কোন পথও নেই, কোন আশ্রয় নেই।” এক বুক হতাশা ও ভীতকণ্ঠে বলল ঋষি।
কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে ইমরান-ঋষি ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। উভয়েই ভুলে গেল ধর্মের ব্যবধান, সামাজিকতার দেয়াল। নিজের দায়িত্বজ্ঞানের কথাও ভুলে গেল ইমরান। রাত কত হয়েছে তারও কোন খেয়াল নেই। সেও যাওয়ার জন্যে উঠি উঠি করেও উঠতে পারছিল না। ইমরানের মধ্যে সে খুঁজে পেল তার জীবনের নিরাপত্তা, নিরাপদ আশ্রয়। ইমরানের সান্নিধ্যই যেন তার পরম ঠিকানা। সে উঠতেও চাচ্ছিল না, কিন্তু যেহেতু এখানে থাকা সম্ভব নয় তাই অগত্যা গাত্রোখান করল ঋষি। দু তিন দিন পর ঋষি আবার ইমরানের ঘরে এল। কথা শুরু করতে যাবে এমন সময় বাইরে জগমোহনের হাক শোনা গেল।
“তোমার দাদা এসেছে ঋষি। তুমি পাশের কামরায় লুকিয়ে পড়।”
জগমোহন ঘরে প্রবেশের আগেই ঋষি অপর কামরায় লুকিয়ে গেলো।
“তুমি আমাকে মাংস খাইয়ে এমন করে ফেলেছে যে, ঘরের সজি-তরকারী দেখলে আমার খাবার আগ্রহ দমে যায়। কোন খাবার আছে কি?”
ইমরান গোশত রান্না করে আগে থেকেই রেখেছিল। হাড়িসহ রান্না করা গোত সে মোহনের সামনে এনে দিল। জগ এটা দেখার প্রয়োজনবোধ করেনি, ইমরান খেয়েছে কি খায়নি। সে হাড়ির সবটুকু গোশত খেয়ে সাবাড় করল।
“ওরা বলী দানের জন্যে কোন মেয়ে কি ছিনিয়ে এনেছে?”
“না এখনও পায়নি। জানি না, পণ্ডিতেরা কোন ধরনের কুমারী তালাশ করছে।”
“তোমাদের বোন কি মন্দিরে যায়?”
“না! তবে আমার আশঙ্কা হয়, আর কতদিন ওকে লুকিয়ে রাখতে পারব।”
ইমরান চেষ্টা করছিল জগমোহনকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিতে। সে মোহনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল না। তার অবসাদ ও ঘুমের ভান কার্যকর ভূমিকা রাখল। মোহন চলে গেল দেরী না করে। জগমোহনের চলে যাওয়া আঁচ করে পাশের কামরা থেকে বেরিয়ে এলো ঋষি। তার চোখে-মুখে রাজ্যের ভীতি।
