অনেকেই সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী আর সুলতান মাহমূদকে একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের বীর সেনানী মনে করেন। অবশ্য তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য একই ছিল। তাদের মাঝে শুধু ক্ষেত্র ও প্রতিপক্ষের পার্থক্য ছিল। আইয়ুবীর প্রতিপক্ষ ছিল ইহুদী ও খৃস্টশক্তি আর মাহমূদের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল হিন্দু পৌত্তলিক রাজন্যবর্গ। ইহুদী ও খৃস্টানরা সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর সেনাদের ঘায়েল করতে প্রশিক্ষিত সুন্দরী রমণী ব্যবহার করে নারী গোয়েন্দা দিয়ে আর এর বিপরীতে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে এরা ব্যবহার করতো শয়তানী যাদু। তবে ইহুদী-খৃষ্টানদের চেয়ে হিন্দুদের গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল দুর্বল কিন্তু সুলতানের গোয়েন্দারা ছিল তৎপর ও চৌকস।
তবে একথা বলতেই হবে, সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর গোয়েন্দারা যেমন দৃঢ়চিত্ত ও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল ছিল, মাহমুদের গোয়েন্দারা ছিল নৈতিক দিক দিয়ে ততোটাই দুর্বল। এদের অনেকেই হিন্দু নারী ও যাদুর ফাঁদে আটতে যেতো। অথবা হিন্দুস্তানের মুসলিম নামের কুলাঙ্গররা এদের ধরিয়ে দিতো। তারপরও সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর চেয়ে সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিল বেশি ফলদায়ক।
ইতিহাসকে পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য, বিশেষ করে তরুণদের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে পরিবেশনের জন্যে গল্পের মতো করে রচনা করা হয়েছে এই গ্রন্থ। বাস্তবে এর সবটুকুই সত্যিকার ইতিহাসের নির্যাস। আশা করি আমাদের নতুন প্রজন্ম ও তরুণরা এই সিরিজ পড়ে শত্রু-মিত্রের পার্থক্য, এদের আচরণ ও স্বভাব জেনে এবং আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে পূর্বসূরীদের পথে চলার দিশা পাবে।
এনায়েতুল্লাহ
লাহোর।
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
৪.১ খুন কন্নৌজ আঘাতের পূর্বাঘাত
বর্তমান গযনী শহর তিন দশক ধরে একের পর এক পরাশক্তির আগ্রাসনে পর্যুদস্ত। দখলদার রাশিয়ার কবল থেকে দীর্ঘদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্ত হয়ে মরার উপর খাড়ার ঘা এর মতো গৃহযুদ্ধের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো আমেরিকার আগ্রাসনের শিকার হয়েছে সুলতান মাহমূদের প্রিয় ভূমি গযনী। হয়েছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের পরীক্ষাগার। বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর বোমাগুলোর বিস্ফোরণস্থল বানানো হয়েয়ে সুলতান মাহমূদের গযনীকে। ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদী খ্রিস্টানদের হাইড্রোসেন বোমার গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে অমিততেজী স্বাধীন ঈমানদীপ্ত সুলতানের জন্মভূমি। শুধু গযনী নয় গোটা আফগানিস্তানের প্রতি ইঞ্চি জমি আজ বহুজাতিক বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমা ও গোলার আঘাতে বিষাক্ত।
হাজার বছরের স্থাপনা ও ইসলামী ঐতিহ্যের চিহ্নগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে আসা যুদ্ধান্মদনায় ধ্বংসকূপের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই সুলতান মাহমুদের দুর্বার অভিযান আর স্বজাতি ও ইসলামকে সুউচ্চে উচ্চকিত করার সেই সোনালি দিনগুলো আজকে শুধুই স্মৃতি। মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই পার্থিব স্বার্থে স্বজাতির চিহ্নিত দুশমনদের সাথে বিনাশী দোস্তিতে মত্ত। জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে কথিত দেশপ্রেমিকের বেশে বিদেশী বরকন্দাজ। তবে গযনীর মাটি এখনো সম্পূর্ণ ভুলে যায়নি হয়নি তার অতীত।
এখনো গযনীর মাটিতে একদল আল্লাহর সৈনিকের পদচারণা রয়েছে। সুলতানি না থাকলেও মাহমূদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই একদল অমিত সাহসী যোদ্ধা বিদেশী দখলদারদের বিতাড়িত করে গোটা আফগানিস্তানকে পুনর্বার
ইসলামী পতাকার ছায়াতলে আনার জন্যে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। বিগত তিনদশক ধরেই গযনী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার মায়েরা তাদের সন্তানদের পায়ে বেড়ি না বেঁধে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে। আজো শত শত কন্যা জায়া জননী তাদের পিতা স্বামী সন্তান ভাইকে ইসলামের জন্যে উৎসর্গ করছে। বিলীন হয়ে যায়নি সুলতান মাহমুদের স্মৃতি, হারিয়ে যায়নি সুলতান মাহমূদের অভিযান। একদল মর্দেমুজাহিদ নিজেদের জীবন ও দেহের তাজা খুন ঢেলে দিয়ে নতুন করে রচনা করছে ত্যাগ ও জীবন দানের নতুন ইতিহাস। ঈমান ও ইসলামকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার নতুন অধ্যায়।
একজন মূর্তি সংহারীর জন্মভূমি হিসেবেই শুধু ইতিহাসে গযনী স্মরণীয় ছিল না। গযনী খ্যাতি পেয়েছিল সেখানকার অসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি ও অসংখ্য শৈল্পিক ধাচে নির্মিত দালান কোঠা ও বড় বড় অট্টালিকার জন্যে।
সুলতান মাহমূদ কনৌজ বিজয়ের পর হিন্দুস্তান থেকে গযনী ফিরে এসে তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নির্মাণশিল্পীদের দিয়ে গযনীতে মর্মর পাথরের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেই সাথে মসজিদ সংলগ্ন স্থানেই গড়ে তুলেছিলেন সর্বাধুনিক কারিকুলাম ও তথ্যসমৃদ্ধ একটি বিশ্ববিদ্যালয় । সেই সময়ের সব জ্ঞান-বিজ্ঞানই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চিত হতো।
এ মসজিদ নির্মিত হয়েছিল মথুরা জয়ের স্মারক হিসেবে। হিন্দুস্তান অভিযানে যেসব মুজাহিদ শাহাদত বরণ করেছিল তাদের স্মৃতি হিসেবে তিনি সুউচ্চ মিনার নির্মাণ করেন। কারণ, মথুরা ভারতের হিন্দুদের কাছে এমনই পবিত্র যেমনটি মুসলমানের কাছে মক্কা মদীনা।
মথুরা হিন্দুদের দেবতা শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি। মথুরার প্রধান মন্দিরের মূর্তিগুলোকেও পবিত্র বলে মনে করা হতো।
