ইতিহাস বলে, সুলতান মাহমূদ অত্যন্ত বিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে আগে চারপাশের ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে পরাজিত করে পথের সব বাধা-বিপত্তি দূর করেন। এরপর প্রতিবন্ধক মহাবনের সামরিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মাথুরার দিকে অগ্রসর হন।
তিনি দূর থেকে মাথুরা শহরকে দেখে বিস্মিত হয়ে দারুণ! দারুণ!! বলে চিৎকার করেন। এরপর একদিন তিনি গযনীর গভর্নরকে মাথুরা শহরের সৌন্দর্য এবং হিন্দুদের নির্মাণনৈপুণ্য সম্পর্কে লিখেন, মাথুরা নগরীর স্থাপনা ও নির্মাণশৈলী এখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাসের মতোই মজবুত ও বাহারী। এখানকার অধিকাংশ ধর্মীয় স্থাপনা মর্মর পাথরে তৈরী। গঠনশৈলী দেখেই বোঝা যায়, এসব মন্দির ও ইমারত যেনতেন ভাবে তৈরী হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বছরের পর বছর সময় ও বহু শ্রমের বিনিময়ে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব স্থাপনা তৈরীতে হিন্দুরা কোটি কোটি দিনার খরচ করেছে। মন্দিরগাত্রে নিপুণ কর্মকৌশলে ফুটিয়ে তুলেছে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস। কোন কোন স্থাপনা তৈরীতে হয়তো শত বছরও ব্যয় করা হয়েছে। বস্তুত এই শহরের রূপ-সৌন্দর্য আমার পক্ষে কোন ভাষায়ই বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
মাথুরা পর্যন্ত পৌঁছাতে সুলতানের তেমন কোন জনবল ব্যয় করতে হয়নি, যার ফলে অনেকটা নিশ্চিত ও দৃঢ়চিত্তে তিনি মাথুরার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। মহাবনের পালিয়ে আসা সৈন্যদের অনেকেই মাথুরা শহরে পৌঁছে মুসলিম সৈন্যদের সম্পর্কে ত্রাস ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। অপরদিকে গোয়েন্দা হিশাম ও তার সঙ্গীরাও লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।
মহাবন থেকে পালিয়ে আসা সৈন্যরা মাথুরায় এসে লোকজনের মধ্যে এমনই ভীতি ছড়িয়ে দিলো, ‘গযনী বাহিনীর সামনে বিশাল বটবৃক্ষও টিকে থাকতে পারবে না।’
এসব আতঙ্ক ছড়ানোর ফলে শহরের অধিবাসীরা প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা না করে জীবন বাঁচাতে এবং বিপদ অপসারণের জন্য মন্দিরগুলোতে গিয়ে জমায়েত হয়ে বিপদঘন্টা বাজাতে শুরু করলো।
গযনীর সৈন্যরা মাথুরা শহর অবরোধ করলে সামান্য প্রতিরোধ হলো বটে; কিন্তু তা গযনী বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে বানের খড়কুটোর মতোই ভেসে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই খুলে গেল শহরের প্রধান গেট। সুলতান মাহমুদ বিজয়ীবেশে শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই গেলেন মাগুরার প্রধান মন্দিরে। সেখানে শ্রীকৃষ্ণ ও বাসুদেবের অতি মূল্যবান মূর্তি প্রতিস্থাপিত ছিল। এই মূর্তিগুলো ছিল খুবই মূল্যবান উপাদানে তৈরী। এ দুটি মূর্তির গঠন ছিল অস্বাভাবিক সুন্দর। খুবই দামী ও উজ্জ্বল হীরে দিয়ে বানানো হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ ও বাসুদেবের মূর্তি। কৃষ্ণমূর্তির দুটি চোখ ছিল দীপ্তিময় হীরের দ্বারা গঠিত। পাঁচটি বিশাল মূর্তি ছিল সম্পূর্ণ সোনার তৈরী এবং এগুলোর চোখে ছিল দামী হীরে। এই হীরের তৎকালীন বাজার মূল্য ছিল পঞ্চাশ হাজার দিনার।
সবচেয়ে ছোট মূর্তিটিতে পাঁচশ কেজি সোনা ছিল। একটি মূর্তিকে গলিয়ে পাওয়া গিয়েছিল ৯৮০০০ (আটানব্বই হাজার) গ্রাম সোনা। এ ছাড়া একশ। মূর্তি ছিল সম্পূর্ণ রুপার তৈরী।
বিজয়ী সুলতান মাহমূদ পাথরের মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেললেন এবং সোনার মূর্তিগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে গলিয়ে ফেললেন। হিন্দুদের এই পবিত্র শহর থেকে পৌত্তলিকতার বিষময় উপাদান দূর করতে তিনি কুড়ি দিন মাথুরা শহরে অবস্থান করলেন। এই কুড়ি দিন পর্যন্তই শহরের বিভিন্ন স্থাপনা জ্বলছিল এবং মাথুরা শহর একটি ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
এদিকে মহারাজা কনৌজ সুলতানের আগমন খবর শুনে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে জোর চেষ্টা চালাতে লাগলেন। কারণ, সুলতানের পরবর্তী লক্ষ্য কনৌজ। এবার কনৌজের মহারাজা রাজ্যপালের পালা।
তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত
৪.১ খুন কন্নৌজ আঘাতের পূর্বাঘাত
ভারত অভিযান (মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান) (চতুর্থ খণ্ড) / এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ – শহীদুল ইসলাম
সুলতান মাহমুদ গজনবীর ঐতিহাসিক সিরিজ উপন্যাস।
.
উৎসর্গ
বঙ্গবীর মীর নেছার আলী তিতুমীর, যিনি স্বদেশীয় জাতীয়তা, ইসলামী ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং দখলদার বেনিয়াদ ইংরেজদের বিতারণের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে ইংরেজ দখলদার গোষ্ঠী অনুভব করেছিল এ দেশকে আর বেশীদিন পদানত রাখা সম্ভব হবে না।
–অনুবাদক
.
প্রকাশকের কথা
আলহামদুলিল্লাহ! এদারায়ে কুরআন’ কর্তৃক প্রকাশিত সুলতান মাহমূদ এর ভারত অভিযান সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি এবং পাঠক মহলকে জানাচ্ছি মোবারকবাদ। নিয়মিত বিরতি দিয়ে এর প্রতিটি খণ্ড প্রকাশের ব্যাপারে আমাদের চেষ্টার কোন ক্রটি ছিল না কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মুদ্রণ সামগ্রির উচ্চমূল্য আমাদের টুটি চেপে ধরেছে। ফলে কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে এই সিরিজের প্রকাশনা।
আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে মাহে রমজান ‘০৮ এর বইমেলা উপলক্ষে এই সিরিজের চতুর্থ খণ্ডটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে সুখানুভব করছি।
নানাবিধ সীমাবদ্ধতার পরও আমরা এ খণ্ডটি আগেরগুলোর চেয়ে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করেছি। তবুও মুদ্রণ প্রমাদ ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। বিজ্ঞমহলের কাছে যে কোন ত্রুটি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করার বিনীত অনুরোধ রইল।
