হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজারাদের নাম ধরে ধরে তাশকীন বলতে লাগল, যারা মথুরার মন্দিরের বিশেষ বৈঠকে শরীক হয়েছিল। তাশকীন সুলতানকে তাদের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা জানিয়ে মানচিত্রে হাত দিয়ে দেখাতে লাগল, কোথায় কনৌজ মাথুরা, বুলন্দশহর এবং মহাবন।
তাশকীন সুলতানকে জানাল, এলাকাটি ঘন জঙ্গলাকীর্ণ হওয়া ছাড়াও প্রমত্তা গঙ্গা ও যমুনা নামের দুটি নদী খুবই ভয়ানক। অতঃপর মাথুরা ও মহাবন। বুলন্দশহরের আশে পাশের ঘোট ঘোট দুর্গগুলোর অবস্থান দেখিয়ে বললো, এগুলোতে সম্মিলিত বাহিনীর বাইরে প্রত্যেক রাজা-মহারাজারা তাদের অর্ধেক সৈন্যকে প্রহরায় নিয়োগ করবে।
আপনি ভীমপালের পিতা জয়পালকে পেশোয়ারের যে ময়দানে পরাজিত করেছিলেন, সম্মিলিত বাহিনী এখানে এসে আপনার মোকাবেলা করতে চায়। তারা লুঘমান পর্যন্ত প্রতিটি গিরিপথে ওদের সৈন্য বসিয়ে রাখবে, আমাদের সেনাদের ঘায়েল করতে এবং চোরাগুপ্তা হামলা করে আমাদের জনবল ধ্বংস করে দিতে। তারপরও যদি আমাদের সৈন্যরা বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যায়, তবে হোট ছোট দূর্গগুলোর রিজার্ভ সৈন্যরা আমাদের সেনাদের পথরোধ করবে।
‘লাহোরের ভীমপালের ইচ্ছা কী?’ তাশকীনকে জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
“ভীমপাল আপনাকে খুব ভয় করে। তবে নেপথ্যে সে ওদের সাথে পুরোপুরি সহযোগিতায় আছে।” বললো তাশকীন।
“এমনটি তো তার করা উচিত।“ বললেন সুলতান। কারণ, পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করতে কে না চাইবে? হিন্দুস্তানের রাজপুতরা খুবই সাহসী ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। তাশকীন! তুমি কি বলতে পারো কবে নাগাদ সম্মিলিত বাহিনী একত্রিত হবে এবং অভিযান শুরু করবে।
‘ওদের প্রস্তুত হতে কমপক্ষে এক বছর লাগবে সুলতান। অবশ্য মাথুরার প্রধান পুরোহিত দ্রুত অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে তাকীদ দিচ্ছে।
‘ওরা লুঘমান আর পেশোয়ারে পৌঁছার জন্য আমরা অপেক্ষা করবো না।‘ বললেন সুলতান। আমরা মাথুরা ও কনৌজেই ওদের মুখোমুখি হবো…। তাশকীন। তুমি পুরো একমাস বিশ্রাম করো। তোমার শরীরের উপর দিয়ে মারাত্মক ধকল গেছে। এ কাজের জন্য তোমাকে মোটা অংকের পুরস্কার দেয়া হবে। অচিরেই পুরস্কার তোমার বাড়ীতে পৌঁছে দেয়া হবে। বললেন সুলতান। তুমি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শরীরটাকে ঠিক করে নাও। এরই মধ্যে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সুলতান মাহমূদ সব সময় তার সেনাপতি ও সেনা কমান্ডারদের বলতেন, শত্রুদেরকে তাদের প্রস্তুতিরত অবস্থাতেই গিয়ে আক্রমণ করবে। এবারও তিনি সেনাপতি এবং কমান্ডারদের ডেকে বললেন, শক্রদেরকে প্রস্তুতরত অবস্থায় গিয়ে পাকড়াও করতে হবে।
শত্রুদের কখনো আক্রমণের সুযোগ দেয়া যাবে না। আমি আপনাদের আগেই বলেছি, হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজা আমাদের বিরুদ্ধে মহা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা তাদেরকে এমন অবস্থায় গিয়ে পাকড়াও করতে চাই, যখন তারা সম্মিলিত বাহিনী তৈরীর জন্য সফরে থাকবে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে মাধুরা।
আমীর বিন তাশকীন আমাকে জানিয়েছে, মাথুরার বুতকে নাকি খুবই পবিত্র মনে করা হয় এবং মাথুরাই হলো তাদের প্রধান দেবতা শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি । শ্রীকৃষ্ণকে হিন্দুরা পয়গম্বর মনে করে।
তাশকীন আমাকে বলেছে, মাথুরায় শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি বানানো হয়েছে মর্মর পাথর দিয়ে এবং কৃষ্ণমূর্তির দুটো চোখ নাকি খুবই দামী হীরের তৈরী। গোটা হিন্দুস্তানের হিন্দুরাই নাকি কৃষ্ণমূর্তির পূজার জন্য মাথুরা গমন করে।
আমাদেরকে দ্রুত অভিযানে নামতে হবে। এবার আমরা পাঞ্জাব হয়ে যাবো না। পাঞ্জাবের মহারাজা আমাদের অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে পূর্বের অবস্থানে নেই। রাজা ভীমপালও নাকি এই আক্রমণ প্রস্তুতিতে পুরোপুরি সহযোগিতা দিচ্ছে।
এবার আমাদের সফর হবে কাশীর হয়ে। পাঞ্জাবের পাশ দিয়ে অবস্থিত কাশ্মীরের পাহাড়ী অঞ্চল দিয়ে আমরা অগ্রসর হবো।
তোমাদের মনে রাখতে হবে, পথে আমাদের অন্তত সাতটি নদী পার হতে হবে। ছোট বড় অনেক পাহাড় ও জঙ্গল দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। আরো মনে রাখতে হবে, আমরা নিজের দেশ থেকে অনেক দূরে গিয়ে লড়াই করবো। সেখানে আমাদের কোন রসদ সাহায্য মিলবে না এবং কোন আসবাবপত্রের চালানও আমরা পাবো না। রাস্তা থেকেই আমাদের রসদ সংগ্রহ করতে হবে।
সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তানের মানচিত্র সামরিক কর্মকর্তাদের দেখিয়ে বললেন, ‘আমরা এই পথ দিয়ে অগ্রসর হবো। মাধুরা আমাদের লক্ষ্যবস্তু হলেও শুরুতে আমরা মাথুরাকে এড়িয়ে যাবো। মাধুরা আক্রমণের আগে আশপাশের ছোট ছোট রাজ্য ও দুর্গগুলোকে দখল করে নেবো।
আমাদের এ অভিযান কিন্তু সহজ হবে না। বললেন সুলতান। আমাদেরকে জীবন বাজি রাখতে হবে। কনৌজের মহারাজা, ভীমপালের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুনেছি, সে নিজে যেমন লড়তে পারে, তেমনি সৈন্যদেরকেও লড়তে জানে।
আমাদের যেসব গোয়েন্দা মাথুরার উৎসবে উপস্থিত হয়েছিল, তারা গণমানুষের মধ্যে গযনী সৈন্যদের সম্পর্কে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে লাখো মানুষের জমায়েত হয়েছিল। সাধারণ লোকেরা এতোটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, গযনী সৈন্যদের আগমন খবর শুনলে ওরাই মানুষজনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবে।
